ঢাকা শহরে অটোরিক্সা চালিয়ে চলে তওসির আলীর জীবন
ঢাকা শহরে অটোরিক্সা চালিয়ে চলে তওসির আলীর জীবন
মো: রুহুল আমিনঃ রংপুরের মানুষ তওসির আলী (৬৩), স্ত্রীর নাম রোকেয়া বেগম। তিনি রংপুর সদরের বাসিন্দা। তার ২ ছেলে ১ মেয়ে রয়েছে। মেয়ের নাম নাজনীন সুলতানা তাকে বিয়ে দিয়েছেন। মেয়ে স্বামীর সংসারে ভালোই আছেন জানান তওসির আলী। দুই ছেলে দেশে অটোরিক্সা চালায় গ্রামে। দুই ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন। তওসির আলীর স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে তিন বছর আগে। স্ত্রী বিয়োগের পর তওসির আলীর দেখাশুনায় খুব একটা মনোযোগী ছিলো না ছেলের দুই বউ। তারা আলাদা আলাদা সংসার পেতেছেন যে যারমত করে চলেন। তওসির আলীর স্ত্রীর মারা যাওয়ার পর রাজ্যের চিন্তায় চিন্তায় নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছেলে-ছেলের বৌদের আচরণ তাকে বিষিয়ে তোলে। নিজের সেবা শুশ্রূষা না পেয়ে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেন জগৎ সংসার এত কঠিন হয়ে গেল কেন? অতঃপর নিজের ও সাংসারিক চাপে তার ইচ্ছে ছিল দ্বিতীয় বিয়ে করার। কিন্তু অনেক ভেবে চিন্তে তিনি আর দ্বিতীয়বার বিয়ের পিড়িত বসলেন না। ইতোমধ্যো স্ত্রী স্ট্রোক করে অসুস্থ হওয়ার পর তার চিকিৎসা বাবদ প্রায় ৬ লক্ষ টাকা ধারদেনা করে ফেলেছেন। দেনার টাকা পরিশোধের জন্য পাওনাদারগন তাড়া দিচ্ছেন তওসির আলীকে। অতঃপর অনেক ভাবনা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেন তিনি ঢাকায় চলে যাবেন। ঢাকায় তার এক দূর সম্পর্কের ভাই থাকেন নাম তার রশিদ। রশিদ ঢাকা শহরে ভাড়ায় অটোরিকশা চালিয়ে ভালোই আছেন। দুই-তিন বছরে একবার গ্রামের বাড়ি আসেন। তার বউ সহ দুই সন্তানের ছোট সংসার। এক সময় রশিদ গ্রাম ছেড়েছেন দেনার জ্বালায়। এখন তার আর দেনা নেই। রশিদকে দেখে তওসির আলীর হিংসা হতো। রশিদ কি করে এত ভালো আছে তওসির আলীর এটা ছিল জিজ্ঞসা? তাই রশিদের পরামর্শ নেন তওসির আলী তার ভালো থাকার গল্প শুনে সেও ঢাকায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন।। যেই কথা সেই কাজ তওসির আলী রশিদের পরামর্শ অনুযায়ী ঢাকায় চলে যাবেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন।
ঢাকায় চলে যাবার সিদ্ধান্তের কথা তওসির আলী তার পরিচিত জন সহ ছেলে ও ছেলের বউদের কাছেও গোপন রাখেন। একদিন এলাকার ও পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়ে তওসির আলী রাতের অন্ধকারে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। ছেলেরা সহ এলাকার নিকটজন বহু খোঁজাখুজি করে না পেয়ে তার বেঁচে থাকা নিয়ে সবাই সন্দেহের সাথে দেখতে শুরু করেন। ইতিমধ্যে রশিদের সহায়তায় রাজধানী ঢাকা শহরে এসে রাস্তা-ঘাট চিনতে ও ভাড়ায় অটোরিকশা চালাতে আস্তে আস্ত শুরু করেন। প্রথমদিকে অটোরিক্সার গ্যারেজের মালিক অপরিচিত গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল তওসির আলীকে তার অটোরিকশা ভাড়া দিতে অনিহা প্রকাশ করেন। তওসির আলী হাল ছেড়ে দিয়ে কোথায় যাবেন সেই চিন্তায় তার খাওয়া-পরা প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে।
ঐ সময়টা তার একদিন এক বছরের মত মনে হতো। কিন্তু তওসির আলী হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। এ সময় কখনো এক বেলা কখনো উপোস করে কাটে তওসির আলীর দিন। অতঃপর দীর্ঘ ছয়মাসেরও বেশি সময় তওসির আলী আত্মীয় রশিদের পরামর্শে চলতে থাকে তার ঢাকার জীবন। এরই মাঝে তওসির অটোরিকশার গ্যারেজের মালিকের বিশ্বস্ততা অর্জন করতে সমর্থ হন। এখন গ্যারিজের মালিক তওসির আলীকে বিশ্বাস করেন। এখন আর তওসির আলীকে অটোরিকশা ভাড়া দিতে অনিহা দেখান না। তওসির আলী এখন নিজে নিজে সকাল-বিকেল দুইবেলাই ভাড়ায় অটোরিকশা চালাতে বের হন। প্রথমদিকে গ্যারেজের মালিকের শর্ত ছিল প্রতিদিন ভাড়ার টাকা বাদেও কমপক্ষে পাঁচ থেকে আটশ টাকা গ্যারেজের মালিকের নিকট জমা রাখতেহবে তাকে। তওসির আলী গ্যারেজ মালিকের দেয়া শর্ত অনুযায়ী শুধু খরচের টাকা বাদে দৈনিক আয়ের বাকি সম্পূর্ণ টাকা গ্যারেজ মালিকের হাতে তুলে দিতেন। এসময় তওসির নিয়মিত দৈনিক অমানুষিক পরিশ্রম করে গড়ে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা মালিকের হাতে তুলে দিতে শুরু করেন। তওসির আলী এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। সে একাই ঢাকা শহরের বিভিন্ন রাস্তায় অটোরিকশা চালাতে পারেন।
প্রায় বছর গড়িয়ে দ্বিতীয় বছরে এই খবর গ্রামের পরিচিত কেউ একজনের সাথে অটোরিক্সার যাত্রী হয়ে চলার পথে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারেন তওসিরের অটোরিকশার যাত্রী তার গ্রামের আব্দুর রহমান। অটোরিকশা চলাচলের মধ্যেই উভয়ের মধ্যে কথায় কথায় তওসির আলী জানতে পারে তার খোঁজখবর নিতে এলাকার মানুষ তাকে অনেক খোঁজাখোজি করেছে। বেশি খোঁজখবর নিয়েছে তার নিকট যারা টাকা পাওনা ছিল তারা। এর মাঝে তওসির আলীকে না পেয়ে এলাকার পাড়া-মহল্লায় রটে গেছে তওসির আলী পাওনাদারদের টাকা না দেয়ার ফন্দিতে নিরুদ্দেশ হয়েছেন!
ঢাকায় আসার শুরুরদিকে সহজ-সরল গ্রামের খেটে-খাওয়া মানুষ তওসির আলী ঢাকার রাস্তা-ঘাট তেমন একটা চিনতেন না। ইতিমধ্যে বছর গড়িয়ে দ্বিতীয় বছরে পড়ছে তওসিরের ঢাকার জীবন। তওসির আলী এখন ঢাকার অনেক রাস্তা-ঘাট চিনি ফেলেছেন।
শুরুরদিকে সহজ-সরল তওসির আলীকে হাবাগোবা ভেবে কেউ কেউ ভাড়া কম দিতেন। এখন তওসির আলীর ঢাকার প্রায় সব রাস্তা-ঘাট চিনা জানা এবং ভাড়া সম্পর্কেও জানেন তিনি। তাই এখন আর কেউ তাকে ভাড়ায় নিয়ে ঠকাতে পারেন না। বছর তিনেকের মধ্যে তওসির আলী তার পাওনাদারদের সব টাকা পরিশোধ করে দিয়েছেন। এখন তার হাতে জমানো টাকার পরিমাণ প্রায় ৯ লাখ টাকা।
এখন তওসির আলীর মাসিক গড় আয় কমবেশি প্রায় ষাট হাজার টাকারমত। এটাকা থেকে তিনি কিছু টাকা মাসে মাসে দুই ছেলেকে পাঠান। বাবা হিসেবে তার দায়িত্ব আছে বলে তিনি মনে করেন। তাই ছেলেদেরকে এই বয়সেও নিজের আয় থেকে কিছু টাকা পাঠান। তওসির আলীর জীবনে অনেক সখ ছিলো তার অনেক জমিজমা হবে, কিন্তু তার কিছুই হয়নি বলে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, সবকিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ চাইলে রাজাকে ফকির আর ফকিরকে রাজা বানিয়ে দিতে পারেন। তার জীবনের দর্শন হচ্ছে কোন মানুষ পরিশ্রম করলে তার সুফল সে ভোগ করবেই। এবিষয়ে তার কোন সন্দেহ নেই, সেও মনে প্রাণে একথা বিশ্বাস করেন।






