সাংবাদিক সুরক্ষা: আর কত নির্যাতনের পর রাষ্ট্র জাগবে?
সাংবাদিক সুরক্ষা: আর কত নির্যাতনের পর রাষ্ট্র জাগবে?
রাষ্ট্রের কাছে একটি সরল প্রশ্ন—প্রতিদিন কতজন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হলে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা রাষ্ট্রের কাছে স্পষ্ট হবে?
গতকাল রোববার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তিনজন সাংবাদিকের ওপর হামলা ও নির্যাতনের যে চিত্র সামনে এসেছে, তা নিছক একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঘটনাটি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা এবং সমাজে মতপ্রকাশের সহনশীল পরিবেশ নিয়ে নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।
সাংবাদিকের হাতে থাকে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন কিংবা নোটবুক; কোনো অস্ত্র নয়। তিনি ঘটনাস্থলে যান তথ্য সংগ্রহ করতে, মানুষের কথা তুলে ধরতে এবং সমাজকে সত্য জানাতে। কোনো সংবাদ, ছবি বা বক্তব্য নিয়ে কারও আপত্তি থাকতেই পারে। সেই আপত্তি জানানোর সাংবিধানিক ও আইনসম্মত পথও রয়েছে। কিন্তু আপত্তির জবাব যদি হয় হামলা, হেনস্তা কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শন, তাহলে তা শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ থাকে না; আঘাত আসে স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর।
সাংবাদিকতা গণতান্ত্রিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রহরী। ক্ষমতাবান থেকে সাধারণ মানুষ—সবার কর্মকাণ্ড, দাবি, অভিযোগ ও বাস্তবতা জনসমক্ষে তুলে ধরাই সংবাদমাধ্যমের কাজ। এই কাজ করতে গিয়ে সাংবাদিক যদি প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে একসময় ঘটনাস্থলে যাওয়ার সাহস কমবে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হবে এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হয়তো জনসমক্ষে আসবে না।
তখন ক্ষতিটা কার? শুধু সাংবাদিকের নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হবে সমাজ, রাষ্ট্র এবং সর্বোপরি মানুষের জানার অধিকার।
আমরা প্রায়ই কোনো সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার পর প্রতিবাদ জানাই, নিন্দা করি, তদন্তের দাবি তুলি। কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়াও হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়? সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো নিয়ে কি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হয়েছে?
সাংবাদিক সুরক্ষা আইন কোনো বিশেষ শ্রেণির জন্য বিশেষ সুবিধা নয়। বরং এটি এমন একটি সুরক্ষা কাঠামো হতে পারে, যার মাধ্যমে দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকের ওপর হামলা, বাধা, হুমকি কিংবা পেশাগত কাজে বেআইনি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা যায়। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার নামে অনৈতিকতা বা আইনভঙ্গের অভিযোগ থাকলে তারও যথাযথ আইনি জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ সুরক্ষা যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে দায়িত্বশীলতা।
গতকালের ঘটনার পর তাই রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্নটি আরও জোরালোভাবে উচ্চারিত হওয়া স্বাভাবিক—আর কতজন সাংবাদিক আক্রান্ত হলে আমরা বুঝব যে সমস্যাটি গুরুতর?
সংখ্যা দিয়ে সাংবাদিকের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা মাপা যায় না। একজন সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাই যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ। কারণ একজন সংবাদকর্মী যখন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আক্রান্ত হন, তখন তার সঙ্গে আঘাতপ্রাপ্ত হয় তথ্যের স্বাধীন প্রবাহও।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়; এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে সাংবাদিকরা ভয়মুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। রাজনৈতিক মত, সামাজিক পরিচয় কিংবা কোনো পক্ষের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্ন নয়—সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া উচিত তার পেশাগত দায়িত্বের ভিত্তিতে।
বার্তাটি তাই স্পষ্ট: সাংবাদিককে নিরাপদ রাখা মানে শুধু একজন সংবাদকর্মীকে নিরাপদ রাখা নয়; মানুষের জানার অধিকার, সমাজের জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রকেও নিরাপদ রাখা।
এখন প্রয়োজন শুধু প্রতিবাদ নয়—প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ। নিন্দার ভাষা পেরিয়ে সাংবাদিক সুরক্ষার একটি বাস্তবসম্মত, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর আইনি কাঠামো নিয়ে রাষ্ট্রকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ নিরাপদ সাংবাদিকতা ছাড়া নিরাপদ তথ্যপ্রবাহ সম্ভব নয়, আর অবাধ তথ্যপ্রবাহ ছাড়া সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজও পূর্ণতা পায় না।





