চেড়িয়ারা কলেজে নবীন বরণ অনুষ্ঠিত; নতুন স্বপ্নের পথে ১৪২ নবীন, চেড়িয়ারা কলেজে শিক্ষার সঙ্গে মানুষ হওয়ার আহ্বান
মেধা ও পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও মানবিকতার চর্চায় নিজেদের গড়ে তোলার পরামর্শ—মাদক, নেশা ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার আহ্বান
মোঃ রুহুল আমিন, বিশেষ প্রতিনিধি, শাহরাস্তি (চাঁদপুর) থেকে : ‘এসো হে নবীন, এসো হে দ্বারে, নবযুগ ডাকছে তোমারে’—এই স্লোগানে মুখর হয়ে উঠেছিল চেড়িয়ারা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অডিটোরিয়াম। দীর্ঘ বিদ্যালয়জীবন পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিকের নতুন অধ্যায়ে পা রাখা ১৪২ শিক্ষার্থীকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেওয়া হয়। তবে অনুষ্ঠানটি শুধু আনুষ্ঠানিক নবীন বরণে সীমাবদ্ধ ছিল না; বক্তাদের কথায় উঠে আসে পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধে নিজেদের গড়ে তোলার প্রত্যাশা।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় চাঁদপুরের শাহরাস্তির চেড়িয়ারা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অডিটোরিয়ামে ২০২৬–২০২৭ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণির উদ্বোধনী ক্লাস ও নবীন বরণ অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চেড়িয়ারা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি এবং কলেজ শাখার প্রধান পৃষ্ঠপোষক মো. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবুল কালাম। অনুষ্ঠান যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন কলেজের আইসিটি বিভাগের শিক্ষক মো. শাহ্ জামাল ও শিক্ষিকা সোনিয়া আক্তার।
প্রধান অতিথি মো. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া নবীন শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাতে হবে। নিয়মিত পড়াশোনা, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার চর্চার মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রয়োজনে তাঁর পক্ষ থেকে সহযোগিতার সুযোগ থাকবে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, শুধু ভালো ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। নিজেদের জীবন, পরিবার ও সমাজের জন্য ইতিবাচক অবদান রাখার মতো যোগ্যতা অর্জন করাই হওয়া উচিত তাদের লক্ষ্য।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। একে একে নবীন শিক্ষার্থী ও অতিথিদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয় এবং শিক্ষার্থীদের কলেজের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
স্বাগত বক্তব্যে কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবুল কালাম জানান, চলতি শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ১৪২ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় বিভিন্ন মহলের সহযোগিতার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। কলেজ পরিচালনায় সভাপতি মো. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়ার সহযোগিতার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
অধ্যক্ষ আরও জানান, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীন ছয় জেলার মধ্যে কলেজটির শিক্ষার্থীরা ফলাফলের দিক থেকে ১২তম অবস্থান অর্জন করেছে। এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে ধামরা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইদ্রিস হোসেন বলেন, মেধা থাকলেই সাফল্য আসে না; মেধাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়। শিক্ষার্থীদের এখন পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে নিজেদের যোগ্য করে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষাজীবনের শুরুতেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে না জড়িয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ গঠনে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
বর্ণিত অনুষ্ঠানে সাবেক সূচিপাড়া উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাবিবুর রহমান পাটোয়ারী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস করার আহ্বান জানান। শিক্ষার্থীরা যেন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বাইরে সময় না কাটায়, সেদিকে কলেজ কর্তৃপক্ষকে নজর রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
সাবেক বৃহত্তর সূচিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো. আবদুল মান্নান ষষ্ঠী শিক্ষার্থীদের মাদক ও অন্যান্য নেশা থেকে দূরে রাখতে শিক্ষক ও অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। কলেজ ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক সদস্য মো. তাফাজ্জল হোসেন মিয়াজি বলেন, আগের বছরের ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে নিয়মিত পড়াশোনা ও শৃঙ্খলার বিকল্প নেই।
নবীনদের উদ্দেশে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে হাফসা লামিয়া ও মাহফুজুর রহমান বক্তব্য রাখেন। তাঁরা নতুন শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানিয়ে কলেজজীবনের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।
সমাজসেবক ও তরুণ উদ্যোক্তা মো. রাসেল হোসেন বলেন, আজকের পরিশ্রমই আগামী দিনের সাফল্যের ভিত্তি। তাই সময়ের সঠিক ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে মনোযোগী হতে হবে।
অনুষ্ঠানে শোরসাক যুক্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমা আক্তার বলেন, চেড়িয়ারা কলেজে ভর্তি হয়ে শিক্ষার্থীরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সময়ের সদ্ব্যবহার করে পড়াশোনায় মনোযোগী হলে সাফল্য অর্জন সম্ভব। শিক্ষার্থীদের সাফল্যের ওপর প্রতিষ্ঠানের সুনামও নির্ভর করে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কলেজের সিনিয়র ধর্মীয় শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি আবু ইউসুফ খান শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দেন। বাংলা বিভাগের প্রভাষক নার্গিস সুলতানা বলেন, দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের পর শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিকের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্ঞান অর্জন ও ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।
কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মামুনুর রশীদ জানান, লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানে সমৃদ্ধ লাইব্রেরিসহ শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
গণিত বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ আলী কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে প্রধান অতিথির সহযোগিতার কথা তুলে ধরেন। কলেজের শুভাকাঙ্ক্ষী ও সমাজসেবক নূরুল আলম সোহাগ বলেন, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হলেও একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত সাফল্যের সঙ্গে ভালো মানুষ হয়ে ওঠার বিষয়টিও জড়িত। তিনি শিক্ষার্থীদের মাদক, অসৎ কর্মকাণ্ড ও নেতিবাচক পরিবেশ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে চেড়িয়ারা স্কুল শাখার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাজির আহমেদ বিএসসি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সভাপতি মো. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়ার সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা দেশাত্মবোধক দলীয় সংগীত পরিবেশন করে। এতে অডিটোরিয়ামে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। পরে নবীন শিক্ষার্থীদের মিষ্টিমুখ করানো হয়। সবশেষে দ্বাদশ শ্রেণিতে ভালো ফলাফল অর্জনকারী প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারী শিক্ষার্থী এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের বিভিন্ন ইভেন্টে কৃতিত্ব অর্জনকারীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
একটি নবীন বরণ অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। কিন্তু ১৪২ শিক্ষার্থীর জন্য সেদিনই শুরু হয়েছে নতুন এক পথচলা। যে পথ শুধু পরীক্ষা, ফলাফল কিংবা সনদের নয়; জ্ঞান, স্বপ্ন, মূল্যবোধ ও নিজেকে গড়ে তোলারও। শিক্ষক, অভিভাবক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রত্যাশা—এই নবীনদের হাত ধরেই একদিন পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও সমাজে যোগ হবে নতুন সাফল্যের গল্প