ভোলদিঘী কামিল মাদ্রাসার সীমানা প্রাচীর ধসে পুকুরে ক্লাস বর্জন করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পুলিশ-প্রশাসন
ভোলদিঘী কামিল মাদ্রাসার ধসে পড়া সীমানা প্রাচীর পরিদর্শন করছেন শাহরাস্তি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান।
বিশেষ প্রতিনিধি, শাহরাস্তি (চাঁদপুর) থেকে : শতবর্ষের পথে এগিয়ে চলা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমানা প্রাচীরের একটি বড় অংশ হঠাৎ ধসে পড়ে ঠাঁই নিয়েছে পাশের পুকুরে। শুধু ইট-সুরকির একটি দেয়াল ভেঙে পড়ার ঘটনা নয়, এর সঙ্গে যেন প্রশ্ন উঠেছে একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়েও। চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার ভোলদিঘী কামিল মাদ্রাসায় এমন ঘটনায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে।
ঘটনার প্রতিবাদে ঐদিন মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ক্লাস বর্জন করে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি ধসের প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মাদ্রাসার পূর্ব পাশের সীমানা প্রাচীরের একটি বড় অংশ আর নেই। ধসে পড়া ইট-পাথরের অংশ পাশের পুকুরে পড়ে আছে। প্রাচীরসংলগ্ন মাটির একটি অংশও সরে গেছে। এতে মাদ্রাসার পূর্বাংশের ভবন ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, সীমানা প্রাচীরের পাশেই গভীর পুকুর থাকায় ওই এলাকার মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, পাশের জমির মালিক আব্দুল মান্নানের পুকুরের পাড়ে প্রয়োজনীয় গার্ডওয়াল বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকায় মাদ্রাসার সীমানা প্রাচীর দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকির মধ্যে ছিল। বিষয়টি নিয়ে আগেও জমির মালিকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল মান্নানের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন। এ সময় তাঁরা সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণ, ধসের কারণ অনুসন্ধান এবং প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমানা প্রাচীর ধসে পড়াকে কেবল অবকাঠামোগত ক্ষতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের মাটি আরও সরে গিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান শাহরাস্তি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান। তিনি ধসে পড়া সীমানা প্রাচীর পরিদর্শন করেন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে তিনি সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুনের পক্ষে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, সীমানা প্রাচীরের একটি অংশ ধসে পড়েছে এবং এটি পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা হবে বলেও তিনি জানান।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা দেলোয়ার হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রাচীরসংলগ্ন পুকুরের বিষয়টি নিয়ে পাশের জমির মালিকের সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রশাসন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতেও এ নিয়ে বৈঠক হয়েছিল। সেখানে সীমানা প্রাচীরের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
অধ্যক্ষ আরও বলেন, সীমানা প্রাচীরটি পুনর্নির্মাণে আনুমানিক পাঁচ লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। দ্রুত প্রাচীর নির্মাণ করা না হলে মাদ্রাসার পূর্বাংশের মাটি আরও সরে গিয়ে ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আক্তারুজ্জামান বলেন, বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠকের মাধ্যমে দ্রুত একটি সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ভোলদিঘী কামিল মাদ্রাসাটি দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রেখে আসছে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর এই প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে এমন ঘটনায় তাই স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সীমানা প্রাচীর ধসে পড়ার ঘটনাটি কোনো পক্ষের অভিযোগ বা বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হবে। ধসের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্নির্মাণ করা হবে—এমন উদ্যোগই এখন প্রত্যাশিত।
একটি দেয়াল হয়তো শুধু ইট-সুরকির নির্মাণ। কিন্তু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমানায় দাঁড়িয়ে সেই দেয়াল হয়ে ওঠে নিরাপত্তার প্রতীক। ভোলদিঘী কামিল মাদ্রাসার ধসে পড়া সেই দেয়াল তাই দ্রুত পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি এর নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানেরও দাবি রাখে।






