নিউইয়র্ক, লস এঞ্জেলেস, অরল্যান্ডো টরন্টোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ফোবানা

নিউইয়র্ক, লস এঞ্জেলেস, অরল্যান্ডো টরন্টোতে  অনুষ্ঠিত হয়েছে ফোবানা

নিউইয়র্ক, লস এঞ্জেলেস, অরল্যান্ডো টরন্টোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ফোবানা

হাকিকুল ইসলাম খোকন, বাপসনিউজঃ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ,পরিচয় আমরা বাঙালি, নেই বিদ্বেষ,একই আকাশ, একই বাতাস, একই মাটির টান—
ফোবানা মানে প্রবাসের বুকে বাংলাদেশের সম্মান।’
এই থিম সংয়ের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎসর্গ করে নিউইয়র্কের ইভানজেল খ্রিস্টিয়ান সেন্টারে ৪, ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,শুক্রবার,শনিবার ও রবিবার অনুষ্ঠিত হলো তিন দিনব্যাপী ৪০তম ফোবানা সম্মেলন ।খবর আইবিএননিউজ ।
সম্মেলনের উদ্বোধন ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেন প্রধান উপদেষ্টা, ফোবানা ফাউন্ডার ,একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. নুরান নবী। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক করেন ফোবানা চেয়ারম্যান জাকারিয়া চৌধুরী।শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন বার্তায় সবাইকে অংশগ্রহণ করার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান আয়োজক সংগঠনের আহবায়ক নূরুল আমিন বাবু ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল,সাবেক সংসদ সদস্য ও ঢাকা জাতীয় প্রেস ক্লাব সাবেক সভাপতি ফরিদা ইয়াসমীন,বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ নজরুল ইসলাম বাবু,বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন,নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটর জন সি. লু, যুক্তরাষ্ট্রে আওয়ামী লীগের সভাপতি ড.সিদ্দিকুর রহমান,আফ্রিকান উইমেন ফেডারেশনের প্রতিনিধি, ডেমোক্রেট নেতা ড. দিলীপ নাথ, বিজ্ঞানী ড. জিনাত নবী,সিনিয়র সাংবাাদিক মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, ওয়াশিংটন থেকে আগত সাংবাদিক দস্তগীর জাহাঙ্গীর, দিল্লিতে নিযুক্ত সাবেক প্রেস মিনিস্টার শাবান মাহমুদ, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক প্রেস মিনিস্টার সাজ্জাদ হোসেন সবুজ ।উপস্থিত ছিলেন ফোবানা এক্সিকিউটিভ কমিটির সেক্রেটারি দেওয়ান মনিরুজ্জামান,ডেপুটি এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি সুব্রত তালুকদার , হোস্ট কমিটির সদস্যসচিব ছড়াকার মনজুর কাদের, চীফ পেট্রন শফিক আলম, কম্যুনিটি এক্টিভিস্ষট সাংবাদিক পিনাকী তালুকদার, একটিভিস্ট রামদাস ঘরামী, বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি আব্দুল কাদের মিয়া, রাফায়েত চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম, এবং জাতিসংঘে কর্মরত মানবাধিকার কর্মী ব্যারিস্টার ড. এনামুল হকসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট ও কানাডা থেকে আগত নেতৃবৃন্দ।

উদ্বোধনী পর্বে বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী শাহ মাহবুব ও বিন্দু কনা। নাচ, গান, কবিতা ও গীতিনাট্য পরিবেশন করে উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস (বিপা)—এর শিক্ষার্থীরা।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে উপস্থিত দর্শক ও আয়োজকদের উদ্দেশে ভাচুর্য়ালি বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি প্রবাসীদের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দেশের প্রয়োজনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানান।
ফোবানার দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রবীণ মা—বাবাদের নিয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ছিলো তরুণদের সঙ্গে মতবিনিময়। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য শিল্পী, সংগঠক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মাননা প্রদান ইত্যাদি।
সম্মেলনে ওয়াশিংটন ডিসিকে ৪১তম ফোবানা সম্মেলনের ভেন্যু হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ সময় ৪১তম ফোবানা আয়োজক কমিটির নতুন সভাপতি দস্তগীর জাহাঙ্গীর ও সাধারণ সম্পাদক ড. মোহাম্মদ হোসেনের হাতে ফোবানার পতাকা হস্তান্তর করেন চেয়ারম্যান জাকারিয়া চৌধুরী ও সম্পাদক দেওয়ান মনিরুজ্জামান।
তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনের বিভিন্ন পর্বে সংগীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশ থেকে আগত জনপ্রিয় শিল্পী আঁখি আলমগীরসহ দিনাত জাহান মুন্নী, দিনার মণি, তরুণ প্রজন্মের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আলভান চৌধুরী, সাগ্নিক মজুমদার, জেরিন মাইশা, বাউল মেলাল করিমসহ আরও অনেকে।

কনভেনশন সেন্টারের লবিতে দেশীয় পণ্যের মেলা বসেছিলো। সাংস্কৃতিক সংগঠক গোপাল সান্যালের উদ্যোগে ছিলো বইএর স্টল, সেখানে বিক্রি হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বই।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয় প্রয়াত চিত্রনায়ক সালমান শাহর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে। চিত্রনায়িকা মৌসুমী গানে গানে স্মরণ করেন সালমান শাহকে। ‘ও আমার বন্ধু গো, চিরসাথী পথচলা’ গানটি কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে যখন মৌসুমী পরিবেশন করেন, তখন হলভর্তি দর্শকের মাঝে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা ।
আয়োজকদের মতে, তিন দিনের এই সম্মেলন শুধু বিনোদন ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং প্রবাসে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও বাংলাদেশকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছিলো।

টরন্টো ফোবানা

টরন্টোঃ লেবার ডে উইকেন্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশীর অংশগ্রহণে ৪—৬ সেপ্টেম্বর কানাডার টরন্টোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৪০তম ফোবানা (ফেডারেশন অব বাংলাদেশী এসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা) সম্মেলন। তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উঠে আসে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সুখ, সমৃদ্ধি ও উত্থানের গল্প ও প্রবাসী জীবনের নানান চ্যালেঞ্জের কথা। সম্মেলনে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার প্রবাসী এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ব্যাবসায়িক ব্যাক্তিত্বরা।
তিন দিনের এ আয়োজনের মধ্য প্রবাসে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ তৈরির পাশাপাশি প্রতিবেশি দুই দেশের প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটির মধ্যেও সৌহার্দ্য গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন আয়োজকরা।খবর বাপসনিউজ ।
গত ৪ সেপ্টেম্বর ডন ভ্যালি হোটেলের হল কক্ষে উপচেপড়া দর্শকদের উপস্থিতিতে জমকালো উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ফোবানা চার দশকপূর্তির এ সম্মেলন। প্রথম দিনেই বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও বিনোদন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন চিত্রনায়িকা ববিতা, জাদু শিল্পী জুয়েল আইচ, সংগীত শিল্পী খালিদ হাসান মিলু (মরণোত্তর) ও এন্ড্রু কিশোর (মরণোত্তর)। উদ্বোধনী দিনে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে সেমিনার ও আলোচনা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ছিল বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক আয়োজন। সম্মেলনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক শাহনেওয়াজ, কনভেনশনের প্রধান নির্বাহী আবু জোবায়ের দারাসহ স্থানীয় কমিউনিটির শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সম্মাননা পেয়েছেন সাবেক ফুটবলার এনায়েতুর রহমান ও অভিনেত্রী শান্তা ইসলামসহ আরও অনেকে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন সেলিম চৌধুরী, আঁখি আলমগীরের পাশাপাশি ঝিলিক, পিন্টু ঘোষ সহ বাংলাদেশ ও টরন্টোর স্থানীয় শিল্পীরা। সঙ্গে ছিল মনকাড়া নৃত্য পরিবেশনা। গান, নৃত্য, তারকা শিল্পীদের পরিবেশনা এবং দেশীয় খাবার ও পণ্যের পসরাÑসব মিলিয়ে ডন ভ্যালি হোটেল হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
সম্মেলনে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন অনুষ্ঠিত হয় বড় পরিসরের প্রাণবন্ত বাংলাদেশী মেলা। সেন্ট্রাল ফোবানা ও কানাডার স্থানীয় হোস্ট টেস্ট অব বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে টরন্টোর বার্চমাউন্ট রোড ও ড্যানফোর্থ রোডের সংযোগস্থলে আয়োজিত এ মেলা দুই দিনই ছিল লোকে লোকারণ্য। দেশীয় পোশাক, গয়না, বিভিন্ন পণ্য ও দেশীয় খাবারের দোকানের পাশাপাশি ছিল উন্মুক্ত কনসার্ট ও নৃত্যের আয়োজন। খোলা আকাশের নিচে বিভিন্ন পণ্যের শতাধিক স্টল ও কালচারাল অনুষ্ঠানের পাশাপাশি একই স্থানে হাজারো বাংলাদেশীর অংশগ্রহণ প্রবাস জীবনে বাংলাদেশের বৈশাখী মেলার আবহ তৈরি করে। প্রবাসের মাটিতে এ মেলা হয়ে ওঠে বাংলাদেশী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা। বাংলাদেশীদের এ আনন্দে স্থানীয় অন্যান্য কমিউনিটির মানুষজনও অংশ নেয়।
সম্মেলনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে সংগীত পরিবেশন করেন ডলি সায়ন্তনী, সেলিম চৌধুরী, রানো নেওয়াজ, ফকির সাহাবুদ্দিন ও শাহনাজ বেলী, অনিক রাজসহ বাংলাদেশ ও প্রবাসের জনপ্রিয় শিল্পীরা। তাঁদের পরিবেশনায় উৎসবের পুরো সময় হয়ে ওঠে আনন্দমুখর। শেষ দিনে টরন্টো ও যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশী কমিউনিটিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মাননা দেওয়া হয়।
সম্মেলনে বিশিষ্ট অতিথিদের মধ্যে ছিলেন টরন্টো সিটি মেয়র অলিভিয়া চাউ, প্রভিন্সিয়াল পার্লামেন্ট মেম্বার ফাতিমা শাবান, ইস্ট ইয়র্কের সদ্য নির্বাচিত এমপি তানভীর শাহানাজ, টরন্টো মেয়র নির্বাচনের প্রার্থী ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড, স্কারবরোর সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে অংশ নেওয়া কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী ডা. তরুণ, স্থানীয় সিটি কাউন্সিলর প্রার্থী কান্দাভেলসহ স্থানীয় রাজনীতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
ফোবানার মধ্য দিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশীরা যেন আবারও ফিরে পেলেন নিজেদের শেকড়ের স্পর্শ। সম্মেলনে সক্রিয় অবদান রাখেন টেস্ট অব বাংলাদেশের ফাউন্ডার রাসেল রহমান, আয়োজক বাংলাদেশ সোসাইটি এসসির সভাপতি খোকন রহমান, সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম, এডমিন ডিরেক্টর সঞ্চয় চাকি, আয়োজক কমিটির শিবু চৌধুরী, আশিষ চৌধুরী, দেওয়ান আজিম, সৈয়দ শামসুল আলম প্রমুখ। পরবতীর্ পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে আগামী বছর ফোবানা কোন স্টেটে অনুষ্ঠিত হবে। খবর আইবিএননিউজ ।

লস অ্যাঞ্জেলেস ফোবানা
বাপসনিউজ ঃবাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শিকড়ের সঙ্গে প্রবাসের নতুন প্রজন্মের বন্ধন আরও দৃঢ় করার প্রত্যয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত হলো ফেডারেশন অব বাংলাদেশী অ্যাসোসিয়েশন্স ইন নর্থ আমেরিকার (ফোবানা) ৪০তম সম্মেলন। ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনের ভেন্যু ছিল লস অ্যাঞ্জেলেসের ইউনিভার্সাল সিটি হিলটন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়ার (বাক) আয়োজনে অনুষ্ঠিত এবারের সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট, কানাডাসহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশী অংশ নেন। উত্তর আমেরিকার ২২টি শহরের প্রায় ৬৭টি সংগঠনের অংশগ্রহণে এবারের সম্মেলন আয়োজনের ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্যে ফোবানার চার দশকের পথচলায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যায় সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এবারের সম্মেলনে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। উদ্বোধনী বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, প্রবাসের নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের চর্চা ধরে রাখতে ফোবানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। চার দশক ধরে উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন জোরদারে সংগঠনটির ধারাবাহিক ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। তিনি বলেন, প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন না, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বও করছেন। দেশে বিনিয়োগে প্রবাসীদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে লস অ্যাঞ্জেলেস সহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরের বাংলাদেশী কমিউনিটির সমাজসেবী, মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ, ব্যবসায়ী, শিল্পী, গণমাধ্যমকর্মী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী, পৃষ্ঠপোষক এবং ফোবানার সাবেক ও বর্তমান নেতারা উপস্থিত ছিলেন।South Asians & Diaspora ।
সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল তিন দিনের বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক আয়োজন। স্থানীয় শিল্পী ও বিভিন্ন সামাজিক—সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও প্রবাসের জনপ্রিয় শিল্পীদের পরিবেশনায় প্রতিদিনই মুখর ছিল সম্মেলনস্থল। প্রথম দিনের সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নেয় লস অ্যাঞ্জেলেসের স্থানীয় শিল্পী ও ব্যান্ড। দ্বিতীয় দিনে স্থানীয় এবং বিভিন্ন স্টেট থেকে আসা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনার পর মঞ্চে আসেন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিবেশনা করা তরুণ প্রজন্মের শিল্পী সঞ্জয় এবং চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠের ঝিলিক। তৃতীয় ও সমাপনী দিনেও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরের সংগঠনগুলোর সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পর সংগীত পরিবেশন করেন এ প্রজন্মের জনপ্রিয় শিল্পী ইমরান, কণা ও মুজা। তাদের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তিন দিনের সাংস্কৃতিক উৎসব পূর্ণতা পায়।
এবারের ফোবানা সম্মেলন শুধু সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিন দিনের কর্মসূচিতে ব্যবসা, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ক্ষমতায়ন এবং নতুন প্রজন্মকে ঘিরে অনুষ্ঠিত হয় একাধিক আলোচনা ও সেমিনার। ছিল কাব্য ও সাহিত্য আসর, ফোবানা গ্রন্থমেলা, ইয়ুথ ফোরাম ও নেটওয়ার্কিং, অনাবাসী বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের আলোচনা, তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্কলারশিপ প্রদান এবং কারুপণ্যের প্রদর্শনী।
শনি ও রবিবার বিশিষ্ট সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত হয় দুটি বিশেষ সেমিনার। শনিবারের সেমিনারের বিষয় ছিল ‘আর নয় অভিযোগ, এবার বলুন সমাধানের কথা’। এতে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং ক্যালিফোর্নিয়ার বিশিষ্ট রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ও একাধিক হাসপাতালের কর্ণধার ডা. কালী প্রদীপ চৌধুরীসহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরের বিশিষ্টজনেরা। রবিবার অনুষ্ঠিত হয় ‘এদেশে নতুন প্রজন্মের ভাবনায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনার। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশকে কীভাবে দেখে এবং মাতৃভূমির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কীভাবে আরও গভীর করা যায়, সেই ভাবনাই উঠে আসে আলোচনায়।
নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে বিশেষ সেমিনারের পাশাপাশি ছিল তরুণদের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি, চিকিৎসাবিষয়ক সেমিনার এবং বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ নিয়েও ছিল বিশেষ আলোচনা। সম্মেলনের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হয় ‘এআইয়ের বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর’ শীর্ষক একটি সেমিনার। ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে ছিল পৃথক নেটওয়ার্কিং ও বিজনেস সেশন। দ্বিতীয় দিনের সকালে অনুষ্ঠিত হয় ফোবানা অ্যালামনাইদের আলোচনা সভা। পরে বিভিন্ন স্টেট থেকে আগত ব্যবসায়ী, পৃষ্ঠপোষক, ফোবানা কর্মকর্তা ও অতিথিদের অংশগ্রহণে আয়োজন করা হয় রেড কার্পেট মধ্যাহ্নভোজ।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে প্রদান করা হয় ফোবানা স্কলারশিপ। এ বছর আটজন শিক্ষার্থীকে স্কলারশিপ দেওয়া হয়। ফোবানার কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সাল থেকে এ কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের কয়েক শ শিক্ষার্থীকে কয়েক লাখ ডলারের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে প্রতিবছর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন করে শিক্ষার্থীকে এ কর্মসূচির আওতায় স্কলারশিপ দেওয়া হয় বলে জানানো হয়।
সম্মেলনের তৃতীয় ও শেষ দিন ৬ সেপ্টেম্বর রবিবার অনুষ্ঠিত হয় ফোবানার বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএম। সভায় বিদায়ী এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারপারসন রবিউল করিম বেলাল সংগঠনকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কাঠামোর বদলে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নেতৃত্বের পরিবর্তন হবে, কিন্তু নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে যেন সংগঠনের অভিজ্ঞতা, আর্থিক শৃঙ্খলা, নীতিমালা, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হারিয়ে না যায়।Geographic Reference
এজিএম শেষে অনুষ্ঠিত হয় ফোবানার ২০২৬—২৭ মেয়াদের নির্বাচন। এতে বিভিন্ন শহরের ৬৭টি সংগঠনের কাউন্সিলররা অংশ নেন। নির্বাচন শেষে ঘোষণা করা হয় ৩১ সদস্যবিশিষ্ট নতুন নির্বাহী কমিটি। নতুন কমিটিতে ফ্লোরিডার এম রহমান জহির চেয়ারপারসন, নিউইয়র্কের আবীর আলমগীর ভাইস চেয়ারপারসন, ভার্জিনিয়ার ড. প্রিয়লাল কর্মকার এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি, ভার্জিনিয়ার অ্যান্থনি পিয়ুস গোমেজ জয়েন্ট এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি এবং হিউস্টনের নাহিদা নাসের ইয়াসমিন ট্রেজারার নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া নয়জন আউটস্ট্যান্ডিং মেম্বার এবং ১৭টি এক্সিকিউটিভ মেম্বার সংগঠন নির্বাচিত হয়েছে। আগামী এক বছর নতুন কমিটি সংগঠনটির নেতৃত্ব দেবে। নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে ফোবানাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক, স্বচ্ছ ও নতুন প্রজন্মমুখী সংগঠনে পরিণত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা।
আগামী বছর ফোবানা আয়োজনের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে হিউস্টনকে।

অরল্যান্ডো ফোবানা বাপসনিউজ,
ইকবাল কবীর,অরল্যান্ডো থেকেঃ জমকালো আয়োজন, প্রবাসীদের মিলনমেলা আর সুরের মুর্ছনায় শেষ হলো উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশীদের সবচেয়ে বড় উৎসব, ৪০তম ফোবানা কনভেনশন ২০২৬। ডিজনিওয়ার্ল্ড খ্যাত ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোর হলিডে ইন রিসোর্ট কিসিমিতে তিন দিনব্যাপী (৪—৬ সেপ্টেম্বর) এই সম্মেলনের শেষ দিনটি ছিল আবেগ, উচ্ছ্বাস আর নতুন প্রত্যাশায় ভরপুর। এবারের আয়োজক ছিল বাংলাদেশ সমিতি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা। কনভেনর ছিলেন কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব আনোয়ার হোসেন সেন্টু। তাঁর নেতৃত্বে ফ্লোরিডা ফোবানা হয়ে উঠেছিল সফল।
এজিএম ও নির্বাচন: নতুন নেতৃত্বের লক্ষ্যে ফোবানার নির্বাচন পরিচালনা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বেদারুল ইসলাম বাবলা। সমাপনী দিবসের মূল আকর্ষণ ছিল বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম)এবং নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন। উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন স্টেট থেকে আগত ফোবানার সদস্য সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। নতুন কমিটির চেয়ারম্যান: আতিকুর রহমান, এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি: নেহাল রহিম।
নবনির্বাচিত নেতৃবৃন্দ ৪০তম ফোবানার সফল আয়োজনের জন্য ফ্লোরিডাবাসীকে ধন্যবাদ জানান এবং আগামী দিনে ফোবানাকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
৪১তম ফোবানা নিউইয়র্কেHistory
এজিএম—এ সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়, আগামী বছর ৪১তম ফোবানা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে নিউইয়র্কে। ৪১তম ফোবানার স্বাগতিক সংগঠন হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী সংগঠন বাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকা।
নিউইয়র্কে ফোবানা ফিরছে — এই ঘোষণায় সম্মেলন কক্ষে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।
তারার মেলা: সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
এবারের ফোবানা ছিল যেন তারার মেলা। বাংলাদেশ থেকে আগত জনপ্রিয় শিল্পীরা তিন দিন ধরে অরল্যান্ডো মাতিয়ে রেখেছিলেন।
সাংস্কৃতিক মঞ্চে ছিলেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কনা, হালের ক্রেজ ইমরান, আঁখি আলমগীর, দিনাত জাহান মুন্নী, এ প্রজন্মের প্রিয় আরজিন কামাল এবং বিশ্বকাপের মঞ্চ কাঁপানো ডিজে সঞ্জয় সহ আরও অনেকেই। এছাড়াও অংশগ্রহণ করেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান এবং তাঁর সহশিল্পীবৃন্দ । কানাডা থেকে আগত মিস ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড কানাডা ২০২৬ এবং মিস কানাডা সাউথ এশিয়া ২০২৪ খ্যাত মডেল এবং নৃত্য শিল্পী ইতিশা চৌধুরী । ফোবানার মুল মঞ্চে সংগীত, নৃত্য ও কবিতায় অংশগ্রহণ করেছেন উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন স্টেট থেকে আসা শিল্পী বৃন্দ। ছিল বিভিন্ন বিষয়ের ওপর সেমিনার। বিভিন্ন বিষয়ে অবদান রাখার জন্য প্রদান করা হয়েছে বিশেষ সম্মাননা। ফোবানার মূল আকর্ষণ ছিল সর্বমোট ৪৭টি সংগঠন এই ফোবানায় তালিকাভুক্ত হয়েছে ।
তাঁদের গানে গানে প্রবাসী বাংলাদেশীরা খুঁজে পান এক টুকরো বাংলাদেশকে।

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

নিউইয়র্ক, লস এঞ্জেলেস, অরল্যান্ডো টরন্টোতে  অনুষ্ঠিত হয়েছে ফোবানা

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল থেকে স্বীকৃতির মঞ্চে; ২০১৩ সাল থেকে শিক্ষকতা, আনন্দঘন পাঠদান ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থা

নিজস্ব প্রতিনিধি : একটি গান, একটি রিল ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও ট্রল। ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল ভার্চুয়াল জগতে। নানা মন্তব্য আর সমালোচনার মধ্যে একসময় ভিডিওটি সরিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই বিতর্কের কয়েক মাস পরই সামনে এলো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের আরেকটি পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাকে পেছনে ফেলে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিউটি রানী পাল।

তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে চারজনকে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁদের একজন বিউটি রানী পাল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর স্বাক্ষর করা একটি স্মারকের মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষকদের নাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও সেখানে বিউটি রানী পালের নাম ছিল না।

যে রিল ঘিরে আলোচনাঃ

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ‘ডিফরেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় একটি গানের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি রানী পাল। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’—গানের এই অংশ ব্যবহারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটির সঙ্গে নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে তা প্রচার করা হলে তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও ট্রল। সাইবার বুলিংয়ের মুখে একপর্যায়ে ভিডিওটি সরিয়ে নেন তিনি।

তবে ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল একজন শিক্ষককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকার শত শত নারী শিক্ষক একই গানের সঙ্গে নিজেদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। শিক্ষক সমাজের এমন অভিনব প্রতিবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সংহতি প্রকাশ করেন।

ফলে একটি ব্যক্তিগত রিল ভিডিওকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনা পরিণত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী শিক্ষকদের প্রতি আচরণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অনলাইন হয়রানি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায়।

বিতর্কের বাইরে অন্য এক পরিচয়ঃ

তবে বিউটি রানী পালের শিক্ষকতা জীবনের গল্প শুরু হয়নি ওই রিল ভিডিও দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত তিনি। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সৃজনশীল নানা কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন তিনি। আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শরীরচর্চা এবং নাচের ছন্দে পড়াশোনাকে সহজ করে তোলার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এসব উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এর আগেও তিনি একবার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো জেলা পর্যায়ের এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বনাম শ্রেণিকক্ষঃ

বিউটি রানী পালের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। অনলাইনে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও যেমন দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তেমনি সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মন্তব্য বা প্রচারণাও মুহূর্তে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে একজন শিক্ষকের প্রকৃত কাজের পরিধি অনেক দীর্ঘ। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, তাদের আগ্রহ তৈরি করা, শেখার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার মূল্যায়ন একটি রিল ভিডিওর কয়েক মিনিটের দৃশ্য দিয়ে করা সম্ভব নয়।

বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা তাঁকে আলোচনায় এনেছিল। কিন্তু জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের কাজ ও অবদানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্বীকৃতি কি বদলে দেয় আলোচনার ভাষা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ দ্রুত মতামত দেয়। সেখানে প্রেক্ষাপট, দীর্ঘমেয়াদি কাজ কিংবা একজন ব্যক্তির সামগ্রিক পরিচয় অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। বিউটি রানী পালের ঘটনাতেও প্রথমে সামনে এসেছিল একটি রিল ভিডিও। পরে সামনে এসেছে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পাঠদানের বিষয়টি।

জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার তথ্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই ব্যক্তিকে ঘিরে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর পেশাগত কাজের স্বীকৃতিও রয়েছে—দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে।

শিক্ষকের পরিচয় শ্রেণিকক্ষেইঃ

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর শ্রেণিকক্ষের কাজ—শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বাইরে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের এই দিকটিই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার।

একটি রিল তাঁকে পরিচিত করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; আর শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ তাঁকে এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিউটি রানী পালের গল্পটি যেন মনে করিয়ে দেয়—ভার্চুয়াল জগতের কয়েক মুহূর্তের আলোচনার চেয়ে একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের কাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

নিউইয়র্ক, লস এঞ্জেলেস, অরল্যান্ডো টরন্টোতে  অনুষ্ঠিত হয়েছে ফোবানা

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ অনুদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা এবং অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এ অনুদান দেওয়া হবে।

এবার অনলাইনের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির মাধ্যমে সুপারিশকৃত আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে পৌঁছাতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিচালন বাজেটের আওতায় বিশেষ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থ বিতরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাইগভ প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত, দুর্গম, উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকার অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যে খাতে দেওয়া হবে অনুদান:

বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মেরামত ও সংস্কার, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা, প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা এবং পাঠাগার উন্নয়নে বিশেষ অনুদান দেওয়া হবে।

এ ছাড়া বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনাজনিত কারণে আর্থিক সহায়তার জন্যও আবেদন করা যাবে।

অগ্রাধিকার পাবেন যেসব শিক্ষার্থীঃ

সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনায় আক্রান্ত, দুস্থ, মেধাবী, এতিম, অদম্য মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অসহায় ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন।

দেশের উপকূলীয়, চরাঞ্চল, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদেরও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যেভাবে করতে হবে আবেদনঃ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। আর স্নাতক বা সমমান এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে জমা দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রার আবেদনগুলো গ্রহণ করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে একত্র করবেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।

অনলাইন ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাতে দ্বৈতভাবে সুপারিশ না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ জন্য জেলা কমিটি আগে অনলাইনে সুপারিশ করা তালিকার সঙ্গে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাওয়া আবেদনসমূহ সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে।

নির্ধারিত আবেদন ফরম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট www.shed.gov.bd-এ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

সময়সীমা ১৫ অক্টোবরঃ

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাওয়া আবেদন জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবে। সুপারিশকৃত তালিকা আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর পৌঁছাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া কোনো আবেদন বিবেচনা করা হবে না।

শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা যেন কেবল শহর কিংবা সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে সরকারি সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

নিউইয়র্ক, লস এঞ্জেলেস, অরল্যান্ডো টরন্টোতে  অনুষ্ঠিত হয়েছে ফোবানা

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

—— মানিক লাল ঘোষ ——
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে কজন বিপ্লবীর নাম সাহস, আত্মত্যাগ ও দুর্জয় প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নারী ছিলেন না; ছিলেন এমন এক সময়ের অদম্য কণ্ঠ, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নারীর জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ ছিল নানা বাধায় পরিপূর্ণ। মাত্র ২১ বছরের জীবনে প্রীতিলতা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয়।
২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর শহীদ হওয়ার দিন। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে—যিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভায় চাকরি করতেন এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন গৃহিণী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও মননশীল।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই অসাধারণ সাফল্য প্রমাণ করে, প্রীতিলতা কেবল সাহসী বিপ্লবীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গভীর মননশীল ও মেধাবী নারীও।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। নন্দনকানন অপরনাচরণ স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন এবং পরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বও পালন করেন। একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশাজীবন তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দেশের পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং বৈষম্যের বাস্তবতা তাঁকে অন্য এক পথে টেনে নেয়।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রীতিলতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় পড়াশোনার সময় তিনি দীপালি সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন—যে সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের শারীরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান সংগঠক মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ তখন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু প্রীতিলতা ধীরে ধীরে সংগঠনের আস্থা অর্জন করেন। গোপন যোগাযোগ, বিপ্লবীদের সহায়তা, সংবাদ ও প্রচারপত্র পৌঁছে দেওয়া, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তিনি অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন সহযোগী নন, গুরুত্বপূর্ণ একজন সংগঠক ও নেতৃত্বদানের যোগ্য বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩২ সালে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলন তখন চট্টগ্রামে তীব্রতর। এরই মধ্যে পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থায় ক্লাবটি ছিল ইউরোপীয়দের সামাজিক আধিপত্য ও বর্ণবৈষম্যের একটি প্রতীক। ক্লাবটির প্রবেশপথে থাকা ‘Dogs and Indians not allowed’ ধরনের বর্ণবাদী বার্তা ভারতীয়দের প্রতি ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার নির্মম প্রকাশ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এই ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতার ওপর অর্পিত হয়। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে, যা ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহর পর্যন্ত গড়ায়, তিনি বিপ্লবীদের একটি দল নিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করেন। পুরুষের ছদ্মবেশে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবীরা ক্লাবে হামলা চালায় এবং ভবনের অংশবিশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন এবং একপর্যায়ে তিনি বিচ্ছিন্ন ও ঘেরাও হয়ে পড়েন।
প্রীতিলতা জানতেন, ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে। বিপ্লবীদের মধ্যে বন্দিত্ব এড়ানোর জন্য সায়ানাইড বহনের পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তী ময়নাতদন্তে জানা যায়, গুলির আঘাতটি প্রাণঘাতী ছিল না; সায়ানাইড বিষক্রিয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।
প্রীতিলতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি জীবন থেমে গেলেও তাঁর আদর্শ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস থেমে যায়নি। তিনি হয়ে উঠলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক। সমকালীন ও পরবর্তী ইতিহাসচর্চায় তাঁকে বাংলার প্রথম নারী শহীদদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
প্রীতিলতার জীবনকে শুধু তাঁর মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে বিচার করলে তাঁর সংগ্রামের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। একজন মেধাবী ছাত্রী থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে বিপ্লবী সংগঠক এবং শেষ পর্যন্ত একটি সশস্ত্র অভিযানের নেত্রী—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাই তাঁর জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য।
আজকের দিনে প্রীতিলতাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই মূল্যবোধগুলো একজন মানুষকে ইতিহাসের অংশ করে তুলতে পারে। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর তাঁর স্মৃতি অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন অগ্নিঝরা এক জীবন, যার দীপ্তি মাত্র ২১ বছরের আয়ুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে।
শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)