ববিতা–ইফতেখার আলম: সাত বছরের দাম্পত্যে প্রেম, টানাপোড়েন ও বিচ্ছেদের গল্প
ববিতা–ইফতেখার আলম: সাত বছরের দাম্পত্যে প্রেম, টানাপোড়েন ও বিচ্ছেদের গল্প
বিনোদন সংবাদ : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ববিতা একটি উজ্জ্বল নাম। অভিনয়, প্রযোজনা ও ব্যক্তিত্ব—সব মিলিয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অর্জন করেছেন বিপুল জনপ্রিয়তা। তবে তাঁর ব্যক্তিজীবনের একটি অধ্যায়ও কম আলোচিত নয়। ইফতেখার আলমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে, দাম্পত্যের টানাপোড়েন, বিচ্ছেদ এবং পরবর্তী নানা আলোচনা আজও চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের কাছে কৌতূহলের বিষয়।
বিভিন্ন সময় প্রকাশিত স্মৃতিচারণ, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে তাঁদের দাম্পত্যজীবন নিয়ে নানা তথ্য উঠে এসেছে। তবে এসব তথ্যের সবকটির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। ফলে কোনটি প্রত্যক্ষ ঘটনা আর কোনটি পরবর্তী সময়ে প্রচলিত বক্তব্য—এ নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, বিয়ের আগে ইফতেখার আলম নিজেকে আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তি হিসেবে ববিতার কাছে উপস্থাপন করেছিলেন। ববিতা তখন চলচ্চিত্র থেকে উল্লেখযোগ্য আয় করছিলেন এবং নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘ববিতা মুভিজ’ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফলে জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আর্থিক স্থিতিশীলতাও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে বিভিন্ন লেখায় দাবি করা হয়েছে।
বিয়ের পর অবশ্য তাঁদের সম্পর্কে নানা টানাপোড়েন দেখা দেয়। ইফতেখারের আর্থিক অবস্থা, ব্যবসা এবং জীবনযাপন নিয়ে ববিতার সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল—এমন দাবি বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়। এমনকি বন্ধুর ব্যবসা ও গাড়িকে নিজের সম্পদ হিসেবে উপস্থাপন এবং ঋণের বিষয় নিয়েও তাঁকে ঘিরে নানা অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ অবশ্য সর্বত্র পাওয়া যায় না।
দাম্পত্য কলহ একপর্যায়ে তীব্র আকার ধারণ করে। ববিতার প্রতি ইফতেখারের আচরণ নিয়েও নানা অভিযোগ সামনে আসে। ববিতার বিরুদ্ধে চলচ্চিত্রাঙ্গনের সহকর্মীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ এনে ইফতেখার অসহিষ্ণু হয়ে উঠতেন—এমন কথাও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সূত্রে এসেছে। তবে এ ধরনের ব্যক্তিগত অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া কঠিন।
অবশেষে ১৯৮৭ সালের ২৪ মে ববিতা ইফতেখার আলমকে তালাক দেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বিচ্ছেদের পর ইফতেখার ক্ষমা চান এবং নিজের আচরণ পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেন। এর মাত্র দুই দিন পর, ২৬ মে, তাঁরা আবার বিয়ে করেন।
তাঁদের পুনর্বিবাহের বৈধতা নিয়েও সে সময় আলোচনা হয়েছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তবে ধর্মীয় ও আইনগত বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে তৎকালীন নথি ও আইনগত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
পুনরায় বিয়ের পরও অবশ্য তাঁদের সংসারে স্থায়ী শান্তি ফেরেনি। ববিতার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘ববিতা মুভিজ’-এর কার্যক্রমে ইফতেখারের সম্পৃক্ততা নিয়েও মতবিরোধ তৈরি হয়। ববিতা চাইতেন না তাঁর স্বামী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিন। অন্যদিকে ইফতেখার তাঁর ভূমিকার পক্ষে যুক্তি দিতেন বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে।
এরই মধ্যে ববিতা মুভিজের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা ও অর্থ লেনদেনকে কেন্দ্র করে একটি প্রতারণা মামলার কথাও বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ ছিল, ইফতেখার ভুয়া লাইসেন্স ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে ব্যাংক হিসাব খুলেছিলেন। পরবর্তীতে ওই হিসাবের একটি চেক প্রত্যাখ্যাত হলে ববিতার বিরুদ্ধেও মামলা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। তবে মামলার নথি ও আদালতের রায় যাচাই ছাড়া এসব অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আরও একটি ঘটনা তাঁদের সম্পর্কের অবনতিকে তীব্র করে তোলে বলে বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, ববিতার অজান্তে তাঁর ব্যবহৃত একটি গাড়ি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় ববিতা শুটিংয়ের কাজে ব্যাংককে ছিলেন। দেশে ফিরে বিষয়টি জানতে পেরে তিনি ক্ষুব্ধ হন। এরপর তিনি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং আইনজীবীর সহায়তা নেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে।
শেষ পর্যন্ত ইফতেখার আলম ববিতার গুলশানের বাসা ছেড়ে চলে যান। এরপর তাঁদের দাম্পত্যজীবনের অবসান ঘটে। সন্তান অনীককে ববিতা একাই বড় করেন—এমন তথ্যও বিভিন্ন জীবনীমূলক লেখায় পাওয়া যায়।
তবে বিচ্ছেদের পর তাঁদের সম্পর্ককে ঘিরে আরও কিছু দাবি সামনে আসে। ইফতেখার আলম বিভিন্ন সময়ে ববিতার অতীত ব্যক্তিজীবন নিয়ে নানা অভিযোগ করেছিলেন বলে কিছু লেখায় উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে চলচ্চিত্র অভিনেতা ফারুক ও জাফর ইকবালের সঙ্গে ববিতার সম্পর্ক নিয়েও নানা গল্প প্রচলিত আছে। কিন্তু এসব বক্তব্যের বড় একটি অংশ ব্যক্তিগত দাবি ও স্মৃতিচারণনির্ভর; সেগুলোর নির্ভরযোগ্য স্বাধীন প্রমাণ না থাকায় এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
ববিতার জীবনের সঙ্গে জাফর ইকবালের সম্পর্ক নিয়েও চলচ্চিত্রাঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা রয়েছে। তাঁর অকালমৃত্যু, ব্যক্তিজীবনের নানা টানাপোড়েন এবং ববিতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক—এসব নিয়ে বহু গল্প প্রচলিত হলেও সবকিছুর সত্যতা যাচাই করা কঠিন।
ইফতেখার আলমের মৃত্যুর পর ববিতা তাঁর সাবেক স্বামীর লাশ দেখতে গিয়েছিলেন—এমন কথাও বিভিন্ন লেখায় এসেছে। সেখানে ইফতেখারের পরিবারের কয়েকজন সদস্য ববিতার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর জন্য তাঁকে দায়ী করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এ ঘটনারও স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন।
ববিতা ও ইফতেখার আলমের সম্পর্কের গল্প তাই শুধু একটি তারকা দম্পতির বিয়ে ও বিচ্ছেদের গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে ভালোবাসা, প্রত্যাশা, ভুল বোঝাবুঝি, ব্যক্তিগত সংঘাত এবং শেষ পর্যন্ত আলাদা হয়ে যাওয়ার এক জটিল অধ্যায়।
তারকাদের জীবনের গল্প সাধারণ মানুষের কৌতূহল তৈরি করে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের এমন গল্পে আবেগের পাশাপাশি দায়িত্বশীলতাও জরুরি। কারণ আলোচিত মানুষের জীবন নিয়ে প্রচলিত গল্পের সঙ্গে সত্য ঘটনা অনেক সময় একাকার হয়ে যায়। ইতিহাসের কাছে তাই সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে থাকে যাচাই করা তথ্য, নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বক্তব্য।
স্বীকৃতি : ফেইসবুক পেইজ থেকে নেয়া।






