বিটিভির লোগো পরিবর্তন নয়; দরকার দায়িত্বশীল গণমাধ্যমে রূপান্তর

বিটিভির লোগো পরিবর্তন নয়; দরকার দায়িত্বশীল গণমাধ্যমে রূপান্তর

বিটিভির লোগো পরিবর্তন নয়; দরকার দায়িত্বশীল গণমাধ্যমে রূপান্তর

রাষ্ট্রায়ত্ত তিন গণমাধ্যমের সংকট কাটাতে প্রয়োজন গণমুখী নীতি, তৃণমূলে সাংবাদিক নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতা। একটি গণমাধ্যমের শক্তি তার লোগোতে নয়, মানুষের আস্থায়। দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, দ্রুত ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জনগণের কথা তুলে ধরার সক্ষমতাই একটি গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করে। সেই জায়গা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও বাংলাদেশ বেতারকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বিটিভির লোগো পরিবর্তন নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন প্রশ্ন উঠছে, শুধু লোগো বদলালেই কি বদলাবে রাষ্ট্রায়ত্ত এই সম্প্রচার মাধ্যমের দর্শক গ্রহণযোগ্যতা? নাকি প্রয়োজন এর কাঠামো, সংবাদ পরিবেশনের ধরন এবং তৃণমূল পর্যায়ে কার্যক্রমের আমূল পরিবর্তন?

বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের মতে, বিটিভির লোগো পরিবর্তনের চেয়ে বেশি জরুরি প্রতিষ্ঠানটিকে দায়িত্বশীল ও গণমুখী গণমাধ্যমে পরিণত করা। তার ভাষায়, বিটিভির গ্রহণযোগ্যতা ও দর্শকসংখ্যা তলানিতে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের অন্যতম পথ হতে পারে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়ানো।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের বসবাস রাজধানীর বাইরে। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা কিংবা সীমান্তবর্তী এলাকার প্রতিদিনের অসংখ্য ঘটনা জাতীয় গণমাধ্যমের আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ এসব এলাকার মানুষের জীবন, সংকট, সম্ভাবনা ও উন্নয়নচিত্রই বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম যদি জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়, তাহলে তার সংবাদ কাভারেজও হওয়া উচিত জনগণকেন্দ্রিক। উপজেলা পর্যায়ে দক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রতিনিধি থাকলে স্থানীয় সমস্যা, প্রশাসনের কার্যক্রম, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, কৃষি, নদীভাঙন, দুর্যোগ, অপরাধ, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনার খবর সরাসরি জাতীয় সম্প্রচারে উঠে আসতে পারে। এতে শুধু বিটিভির সংবাদভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে না; বরং তৃণমূলের মানুষও রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে নিজেদের গণমাধ্যম হিসেবে ভাবার সুযোগ পাবে।

জনগনের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রের এ গণমাধ্যমগুলোর আর্থিক অবস্থাও নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের মে মাসের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বিটিভির আয় ছিল ৮ কোটি ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২৫৪ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। আগের কয়েক বছরের হিসাবেও একই ধরনের বড় ব্যবধান দেখা যায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিটিভির আয় ছিল ৩৪ কোটি ৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, বিপরীতে ব্যয় ২৮০ কোটি ৮১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ৪০ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ২৮৫ কোটি ৪৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় দাঁড়ায় ৩০ কোটি ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, আর ব্যয় বেড়ে হয় ৩৭০ কোটি ৬১ লাখ ৫১ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় ৪৪ কোটি ৪১ লাখ ২২ হাজার টাকা হলেও ব্যয় হয়েছে ২৯৮ কোটি ৫৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ২৭ কোটি ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ৩০৭ কোটি ১২ লাখ ২২ হাজার টাকা। সংখ্যাগুলো শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের কার্যকারিতা, ব্যবস্থাপনা ও জনসম্পৃক্ততা নিয়ে বড় প্রশ্নও সামনে আনে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা—বাসসের চিত্রও উদ্বেগজনক। দেশে মিডিয়াভুক্ত ৫৮৪টি পত্রিকা ও ৩৬টি টেলিভিশন চ্যানেল থাকার পরও বাসসের গ্রাহকসংখ্যা ৫০-এর নিচে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। বাসসের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির গ্রাহক ৪৮টি; এর মধ্যে নিয়মিত সেবা নেয় ২৮টি মিডিয়া। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাসসের অবস্থান শক্তিশালী নয়। ভারত, পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ সংস্থার সঙ্গে খবর আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকলেও বিদেশে বাসসের নিজস্ব গ্রাহক নেই। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির গ্রাহক বাসস। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাসসকে অন্য সংস্থার সেবা নিতে হচ্ছে, অথচ নিজের উৎপাদিত সংবাদ আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির সক্ষমতা তৈরি হয়নি—এটি প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বাসসের বিজ্ঞাপন আয়ও নেই। বার্ষিক গ্রাহক ফি থেকে আয় প্রায় ৬৭ লাখ টাকা হলেও সেই অর্থও অনাদায়ী থাকার কথা বলা হচ্ছে। বিপরীতে সরকার থেকে বছরে ৩৮ কোটি টাকার বেশি অনুদান নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা যদি বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় করে পরিচালিত হয়, তাহলে তার সংবাদসেবা কতটা জনগণ ও দেশের গণমাধ্যমের কাজে লাগছে?

বাসসকে ঘিরে আরেকটি অভিযোগ হলো—দলীয়করণ, ইচ্ছেমতো নিয়োগ ও পদোন্নতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনের তুলনায় ভারী হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারি অর্থের বড় অংশ বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে।রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে কর্মীদের চাকরি ও অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জনস্বার্থে তার অবদান। তাই প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট কর্মীর বিরুদ্ধে নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে আরও দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক ও সেবামুখী হতে পারে—সেটিই হওয়া উচিত মূল আলোচনার বিষয়।

বিটিভি ও বাসসের পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতারও রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় দেশের কোটি মানুষের কাছে সংবাদ, বিনোদন ও জনসচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল বেতার। ডিজিটাল যুগে এসে মানুষের তথ্য গ্রহণের অভ্যাস বদলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমগুলোর সামনে প্রতিযোগিতা এখন অনেক বেশি। এই বাস্তবতায় শুধু পুরোনো কাঠামো ধরে রাখলে হবে না। বেতারকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, স্থানীয় কনটেন্ট, দ্রুত সংবাদ এবং জনসম্পৃক্ত অনুষ্ঠানকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শক্তিশালী প্রতিনিধি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি।

বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম দীর্ঘদিন ধরে বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতারে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছে। সাংবাদিকদের রুটি-রুজির ১৪ দফা দাবির মধ্যেও এটি অন্যতম। দাবিটি বাস্তবায়িত হলে সারাদেশে দেড় হাজারের বেশি সাংবাদিকের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সুফল শুধু কর্মসংস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের সংবাদ সংগ্রহের পরিধিও বহুগুণে বাড়তে পারে।একজন স্থানীয় প্রতিনিধি তার এলাকার এমন অনেক খবর জানেন, যা ঢাকার কোনো ডেস্কের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। সঠিক প্রশিক্ষণ, নৈতিকতার মানদণ্ড এবং পেশাগত জবাবদিহির আওতায় এই প্রতিনিধিদের কাজে লাগানো গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের সংবাদভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

একটি গণমাধ্যমের ব্র্যান্ডিং গুরুত্বপূর্ণ—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ব্র্যান্ডের বাহ্যিক পরিবর্তনের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের পরিবর্তন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিটিভির পর্দায় নতুন লোগো দর্শকের চোখে পড়বে; কিন্তু দর্শককে ধরে রাখবে ভালো অনুষ্ঠান, নির্ভরযোগ্য সংবাদ, দ্রুত আপডেট, স্থানীয় মানুষের কথা এবং রাষ্ট্রের পাশাপাশি জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া সাংবাদিকতা। একইভাবে বাসসের নতুন ভবন, নতুন প্রযুক্তি কিংবা নতুন স্লোগান তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সংবাদ দেশের সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ বেতারও তখনই তার পুরোনো শক্তি ফিরে পাবে, যখন শ্রোতা মনে করবেন—এই মাধ্যমটি তার জীবনের কথা বলে।

রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে বাঁচাতে হলে শুধু সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, পেশাদার নেতৃত্ব, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সংবাদ পরিবেশনের সংস্কৃতি এবং কঠোর জবাবদিহি। এর পাশাপাশি প্রয়োজন এমন সাংবাদিক, যারা চাকরিকে শুধু বেতন-ভাতার সুযোগ হিসেবে দেখবেন না; বরং জনগণের প্রতি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করবেন। যারা মাঠে যাবেন, মানুষের কথা শুনবেন, তথ্য যাচাই করবেন এবং রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত গণমাধ্যমকে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে ভূমিকা রাখবেন। বেসরকারি গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে সরকারি প্রতিষ্ঠানসুলভ ধীরগতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে পেশাদার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে হবে।

বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতার—এই তিন প্রতিষ্ঠান কেবল সরকারি দপ্তর নয়; এগুলো জনগণের অর্থে পরিচালিত জাতীয় গণমাধ্যম। তাই এগুলোর সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে জনগণের অর্থ, তথ্যের অধিকার এবং গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে। লোগো পরিবর্তন একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু দর্শকের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বড় পরিবর্তন। প্রয়োজন তৃণমূলে প্রতিনিধি, দ্রুত ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, জনসম্পৃক্ত অনুষ্ঠান, দক্ষ মানবসম্পদ, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারিত্ব এবং সর্বোপরি সামাজিক দায়বদ্ধতা। রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে যদি সত্যিকার অর্থে গণমুখী করা যায়, তাহলে সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরশীল তিনটি প্রতিষ্ঠানও একদিন বেসরকারি গণমাধ্যমের জন্য প্রতিযোগিতার শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

দেখার অপেক্ষায় নতুন সরকারের নতুন দায়িত্বশীলরা কী পারবেন খাদের কিনারা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে রাষ্টায়াত্ত এ তিনটি গণমাধ্যমকে গণমানুষের প্রতিষ্ঠানে পরিনত করতে?

লেখক: আহমেদ আবু জাফর, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশ।01712306501/[email protected]

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

বিটিভির লোগো পরিবর্তন নয়; দরকার দায়িত্বশীল গণমাধ্যমে রূপান্তর

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল থেকে স্বীকৃতির মঞ্চে; ২০১৩ সাল থেকে শিক্ষকতা, আনন্দঘন পাঠদান ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থা

নিজস্ব প্রতিনিধি : একটি গান, একটি রিল ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও ট্রল। ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল ভার্চুয়াল জগতে। নানা মন্তব্য আর সমালোচনার মধ্যে একসময় ভিডিওটি সরিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই বিতর্কের কয়েক মাস পরই সামনে এলো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের আরেকটি পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাকে পেছনে ফেলে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিউটি রানী পাল।

তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে চারজনকে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁদের একজন বিউটি রানী পাল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর স্বাক্ষর করা একটি স্মারকের মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষকদের নাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও সেখানে বিউটি রানী পালের নাম ছিল না।

যে রিল ঘিরে আলোচনাঃ

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ‘ডিফরেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় একটি গানের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি রানী পাল। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’—গানের এই অংশ ব্যবহারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটির সঙ্গে নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে তা প্রচার করা হলে তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও ট্রল। সাইবার বুলিংয়ের মুখে একপর্যায়ে ভিডিওটি সরিয়ে নেন তিনি।

তবে ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল একজন শিক্ষককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকার শত শত নারী শিক্ষক একই গানের সঙ্গে নিজেদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। শিক্ষক সমাজের এমন অভিনব প্রতিবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সংহতি প্রকাশ করেন।

ফলে একটি ব্যক্তিগত রিল ভিডিওকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনা পরিণত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী শিক্ষকদের প্রতি আচরণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অনলাইন হয়রানি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায়।

বিতর্কের বাইরে অন্য এক পরিচয়ঃ

তবে বিউটি রানী পালের শিক্ষকতা জীবনের গল্প শুরু হয়নি ওই রিল ভিডিও দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত তিনি। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সৃজনশীল নানা কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন তিনি। আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শরীরচর্চা এবং নাচের ছন্দে পড়াশোনাকে সহজ করে তোলার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এসব উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এর আগেও তিনি একবার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো জেলা পর্যায়ের এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বনাম শ্রেণিকক্ষঃ

বিউটি রানী পালের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। অনলাইনে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও যেমন দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তেমনি সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মন্তব্য বা প্রচারণাও মুহূর্তে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে একজন শিক্ষকের প্রকৃত কাজের পরিধি অনেক দীর্ঘ। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, তাদের আগ্রহ তৈরি করা, শেখার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার মূল্যায়ন একটি রিল ভিডিওর কয়েক মিনিটের দৃশ্য দিয়ে করা সম্ভব নয়।

বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা তাঁকে আলোচনায় এনেছিল। কিন্তু জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের কাজ ও অবদানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্বীকৃতি কি বদলে দেয় আলোচনার ভাষা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ দ্রুত মতামত দেয়। সেখানে প্রেক্ষাপট, দীর্ঘমেয়াদি কাজ কিংবা একজন ব্যক্তির সামগ্রিক পরিচয় অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। বিউটি রানী পালের ঘটনাতেও প্রথমে সামনে এসেছিল একটি রিল ভিডিও। পরে সামনে এসেছে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পাঠদানের বিষয়টি।

জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার তথ্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই ব্যক্তিকে ঘিরে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর পেশাগত কাজের স্বীকৃতিও রয়েছে—দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে।

শিক্ষকের পরিচয় শ্রেণিকক্ষেইঃ

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর শ্রেণিকক্ষের কাজ—শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বাইরে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের এই দিকটিই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার।

একটি রিল তাঁকে পরিচিত করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; আর শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ তাঁকে এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিউটি রানী পালের গল্পটি যেন মনে করিয়ে দেয়—ভার্চুয়াল জগতের কয়েক মুহূর্তের আলোচনার চেয়ে একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের কাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

বিটিভির লোগো পরিবর্তন নয়; দরকার দায়িত্বশীল গণমাধ্যমে রূপান্তর

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ অনুদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা এবং অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এ অনুদান দেওয়া হবে।

এবার অনলাইনের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির মাধ্যমে সুপারিশকৃত আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে পৌঁছাতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিচালন বাজেটের আওতায় বিশেষ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থ বিতরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাইগভ প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত, দুর্গম, উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকার অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যে খাতে দেওয়া হবে অনুদান:

বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মেরামত ও সংস্কার, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা, প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা এবং পাঠাগার উন্নয়নে বিশেষ অনুদান দেওয়া হবে।

এ ছাড়া বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনাজনিত কারণে আর্থিক সহায়তার জন্যও আবেদন করা যাবে।

অগ্রাধিকার পাবেন যেসব শিক্ষার্থীঃ

সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনায় আক্রান্ত, দুস্থ, মেধাবী, এতিম, অদম্য মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অসহায় ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন।

দেশের উপকূলীয়, চরাঞ্চল, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদেরও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যেভাবে করতে হবে আবেদনঃ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। আর স্নাতক বা সমমান এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে জমা দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রার আবেদনগুলো গ্রহণ করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে একত্র করবেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।

অনলাইন ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাতে দ্বৈতভাবে সুপারিশ না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ জন্য জেলা কমিটি আগে অনলাইনে সুপারিশ করা তালিকার সঙ্গে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাওয়া আবেদনসমূহ সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে।

নির্ধারিত আবেদন ফরম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট www.shed.gov.bd-এ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

সময়সীমা ১৫ অক্টোবরঃ

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাওয়া আবেদন জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবে। সুপারিশকৃত তালিকা আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর পৌঁছাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া কোনো আবেদন বিবেচনা করা হবে না।

শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা যেন কেবল শহর কিংবা সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে সরকারি সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

বিটিভির লোগো পরিবর্তন নয়; দরকার দায়িত্বশীল গণমাধ্যমে রূপান্তর

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

—— মানিক লাল ঘোষ ——
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে কজন বিপ্লবীর নাম সাহস, আত্মত্যাগ ও দুর্জয় প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নারী ছিলেন না; ছিলেন এমন এক সময়ের অদম্য কণ্ঠ, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নারীর জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ ছিল নানা বাধায় পরিপূর্ণ। মাত্র ২১ বছরের জীবনে প্রীতিলতা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয়।
২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর শহীদ হওয়ার দিন। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে—যিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভায় চাকরি করতেন এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন গৃহিণী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও মননশীল।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই অসাধারণ সাফল্য প্রমাণ করে, প্রীতিলতা কেবল সাহসী বিপ্লবীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গভীর মননশীল ও মেধাবী নারীও।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। নন্দনকানন অপরনাচরণ স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন এবং পরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বও পালন করেন। একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশাজীবন তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দেশের পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং বৈষম্যের বাস্তবতা তাঁকে অন্য এক পথে টেনে নেয়।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রীতিলতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় পড়াশোনার সময় তিনি দীপালি সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন—যে সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের শারীরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান সংগঠক মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ তখন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু প্রীতিলতা ধীরে ধীরে সংগঠনের আস্থা অর্জন করেন। গোপন যোগাযোগ, বিপ্লবীদের সহায়তা, সংবাদ ও প্রচারপত্র পৌঁছে দেওয়া, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তিনি অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন সহযোগী নন, গুরুত্বপূর্ণ একজন সংগঠক ও নেতৃত্বদানের যোগ্য বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩২ সালে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলন তখন চট্টগ্রামে তীব্রতর। এরই মধ্যে পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থায় ক্লাবটি ছিল ইউরোপীয়দের সামাজিক আধিপত্য ও বর্ণবৈষম্যের একটি প্রতীক। ক্লাবটির প্রবেশপথে থাকা ‘Dogs and Indians not allowed’ ধরনের বর্ণবাদী বার্তা ভারতীয়দের প্রতি ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার নির্মম প্রকাশ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এই ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতার ওপর অর্পিত হয়। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে, যা ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহর পর্যন্ত গড়ায়, তিনি বিপ্লবীদের একটি দল নিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করেন। পুরুষের ছদ্মবেশে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবীরা ক্লাবে হামলা চালায় এবং ভবনের অংশবিশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন এবং একপর্যায়ে তিনি বিচ্ছিন্ন ও ঘেরাও হয়ে পড়েন।
প্রীতিলতা জানতেন, ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে। বিপ্লবীদের মধ্যে বন্দিত্ব এড়ানোর জন্য সায়ানাইড বহনের পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তী ময়নাতদন্তে জানা যায়, গুলির আঘাতটি প্রাণঘাতী ছিল না; সায়ানাইড বিষক্রিয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।
প্রীতিলতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি জীবন থেমে গেলেও তাঁর আদর্শ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস থেমে যায়নি। তিনি হয়ে উঠলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক। সমকালীন ও পরবর্তী ইতিহাসচর্চায় তাঁকে বাংলার প্রথম নারী শহীদদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
প্রীতিলতার জীবনকে শুধু তাঁর মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে বিচার করলে তাঁর সংগ্রামের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। একজন মেধাবী ছাত্রী থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে বিপ্লবী সংগঠক এবং শেষ পর্যন্ত একটি সশস্ত্র অভিযানের নেত্রী—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাই তাঁর জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য।
আজকের দিনে প্রীতিলতাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই মূল্যবোধগুলো একজন মানুষকে ইতিহাসের অংশ করে তুলতে পারে। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর তাঁর স্মৃতি অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন অগ্নিঝরা এক জীবন, যার দীপ্তি মাত্র ২১ বছরের আয়ুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে।
শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)