শাহরাস্তিতে বিদ্যুৎ বিলের ‘অস্বাভাবিক’ হিসাব নিয়ে গ্রাহকদের ক্ষোভ
শাহরাস্তিতে বিদ্যুৎ বিলের ‘অস্বাভাবিক’ হিসাব নিয়ে গ্রাহকদের ক্ষোভ
১ হাজার টাকার বিল এক মাসে ১১ হাজার, পরের মাসে ৮ হাজার; মিটার ও বিলের হিসাব যাচাইয়ের দাবি
শাহরাস্তি (চাঁদপুর) প্রতিনিধি : বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণে বড় কোনো পরিবর্তন না এলেও হঠাৎ কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে মাসিক বিল—এমন অভিযোগ উঠেছে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার টামটা উত্তর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকজন গ্রাহকের কাছ থেকে। কারও মাসিক বিল যেখানে দীর্ঘদিন ধরে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে ছিল, সেখানে হঠাৎ এক মাসে তা দাঁড়িয়েছে ১১ হাজারে। পরের মাসেও এসেছে প্রায় ৮ হাজার টাকা। একইভাবে কয়েকজন গ্রাহকের ৩০০–৫০০ টাকার বিল বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত।
অস্বাভাবিক এই বিল নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও ক্ষোভ। তাঁদের প্রশ্ন, একদিকে নিয়মিত লোডশেডিং, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল—এর কারণ কী? তাঁরা মিটার রিডিং, আগের ও বর্তমান বিলের হিসাব এবং মিটারটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করে প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের দাবি জানিয়েছেন।
১১ হাজার টাকার বিল
দৈলবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা শাফায়াত উল্লাহর অভিযোগ, জুন মাসে তাঁর বিদ্যুৎ বিল এসেছে ১১ হাজার টাকা। জুলাই মাসে এসেছে ৮ হাজার টাকা। অথচ এর আগে তাঁর মাসিক বিল সাধারণত ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে থাকত।
শাফায়াত উল্লাহ বলেন, “আগে যেখানে মাসে এক হাজার টাকার মতো বিল আসত, সেখানে হঠাৎ করে এত বেশি বিল কীভাবে আসে, তা বুঝতে পারছি না। বিষয়টি জানাতে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করেও কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাইনি।”
তাঁর অভিযোগ, বিষয়টি জানাতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। তাঁর দাবি, মিটার পরীক্ষা, পূর্ববর্তী বিল ও বর্তমান বিলের তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ব্যবহারের ভিত্তিতে বিল নির্ধারণ করা হোক।
৪০০–৫০০ টাকার বিল বেড়ে ১ হাজার ৬০০
একই এলাকার আরেক গ্রাহক মোস্তফা কামাল বলেন, আগে তাঁর মাসিক বিদ্যুৎ বিল গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আসত। কিন্তু জুন মাসে বিল এসেছে ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং জুলাই মাসে ১ হাজার ১০০ টাকা।
মোস্তফা কামালের ভাষ্য, “আমরা অতিরিক্ত এই বিলের কারণ জানতে চাই। নিয়মিত বিদ্যুৎ না পেলেও যদি বিল এত বেশি আসে, তাহলে সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে তা পরিশোধ করা কঠিন।”
একই গ্রামের এক প্রান্তিক কৃষক জানান, তাঁর মাসিক বিল আগে ৩০০–৪০০ টাকার মধ্যে থাকত। কিন্তু জুন মাসে এসেছে ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং জুলাই মাসে ২ হাজার ২০০ টাকা।
ওই কৃষকের প্রশ্ন, “আমি একজন প্রান্তিক কৃষক। এত বেশি বিল কীভাবে দেব? একদিকে বিদ্যুৎ সব সময় থাকে না, অন্যদিকে বিল কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। দুই কামরার একটি বাড়িতে এত টাকা বিল আসার কারণ কী, সেটিই বুঝতে পারছি না।”
মসজিদ-মাদ্রাসার বিল নিয়েও অভিযোগ
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু আবাসিক গ্রাহকেরাই নন, এলাকার কিছু মসজিদ ও মাদ্রাসার বিদ্যুৎ বিল নিয়েও অতিরিক্ত বিল আসার অভিযোগ রয়েছে।
টামটা উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবুল হোসেন বলেন, তাঁর ওয়ার্ডের অনেক পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহক বেশি বিল আসার অভিযোগ করেছেন। তাঁর নিজেরও বেশি বিল এসেছে বলে জানান তিনি।
আবুল হোসেন বলেন, “শুধু বাড়িঘর নয়, মসজিদ-মাদ্রাসার বিদ্যুৎ বিল নিয়েও মানুষের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি দ্রুত যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।”
লোডশেডিংয়ের মধ্যেও বাড়তি বিল
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় লোডশেডিংও বেড়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার পরও কয়েক গুণ বেশি বিল আসায় গ্রাহকদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে বিদ্যুৎ বিল বেশি আসার পেছনে প্রকৃত কারণ কী, তা কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। মিটার রিডিং, মিটারের কার্যকারিতা, পূর্ববর্তী ও বর্তমান বিলের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করলেই বিষয়টির প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন গ্রাহকেরা।
তাঁদের দাবি, মিটার রিডিংয়ে ভুল, মিটারের কারিগরি ত্রুটি কিংবা বিল তৈরির প্রক্রিয়ায় কোনো অসংগতি থাকলে তা শনাক্ত করে দ্রুত সংশোধন করা হোক।
‘আমার কাছে কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেননি’
গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর শাহরাস্তি জোনাল অফিসের দায়িত্বে থাকা এজিএম রোকসানা আক্তারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি ২৭ জুলাই এখানে যোগদান করেছি। আমার কাছে এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে কেউ আসেননি।”
তিনি অভিযোগকারী গ্রাহকদের তাঁর কাছে এসে বিষয়টি জানানোর অনুরোধ করেন।
দ্রুত যাচাই চান গ্রাহকেরা
বিদ্যুৎ বিল একটি পরিবারের মাসিক ব্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য স্বাভাবিক বিলের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থের বোঝা তৈরি হলে তা সহজেই হয়ে উঠতে পারে বড় ধরনের দুশ্চিন্তার কারণ।
তাই অভিযোগগুলোকে শুধু গ্রাহকের অসন্তোষ হিসেবে না দেখে মিটার রিডিং, মিটার পরীক্ষা এবং বিলের হিসাব যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
গ্রাহকদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে। কোনো ভুল বা কারিগরি ত্রুটি পাওয়া গেলে তা সংশোধন করে গ্রাহকদের স্বস্তি ফিরিয়ে আনা হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের কোনো ভিত্তি না থাকলে সেটিও পরিষ্কারভাবে গ্রাহকদের জানানো হবে।
বিদ্যুৎ বিল নিয়ে তৈরি হওয়া এই প্রশ্নের দ্রুত ও স্বচ্ছ সমাধানই এখন স্থানীয় গ্রাহকদের প্রত্যাশা।






