শাহরাস্তিতে দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
শাহরাস্তিতে দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
গরিব-অসহায় মানুষের সঞ্চয় নিয়ে বিপাকে শত শত পরিবার, থানায় পৃথক অভিযোগ
শাহরাস্তি (চাঁদপুর) প্রতিনিধি : কেউ সংসারের খরচ বাঁচিয়ে, কেউবা দিনের পর দিন শ্রমের উপার্জন থেকে একটু একটু করে টাকা জমিয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল বিপদের দিনে সেই সঞ্চয়ই হবে পরিবারের ভরসা। কিন্তু প্রয়োজনের সময় সেই টাকা ফেরত না পেয়ে এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন চাঁদপুরের শাহরাস্তির সূচিপাড়া উত্তর ইউনিয়নের শত শত মানুষ।
উপজেলার প্রান্তিক বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড ও সর্দার বহুমুখী এগ্রো ফার্ম নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ও গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে শাহরাস্তি মডেল থানায় পৃথক দুটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয় ও আর্থিক সুবিধার আশ্বাস দিয়ে স্থানীয় গরিব, অসহায় ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে আসছিল প্রতিষ্ঠান দুটি। পরে গ্রাহকেরা তাঁদের জমা করা টাকা ফেরত চাইলে নানা ধরনের টালবাহানার মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা। এতে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে।
স্থানীয় শোরশাক বাজারে অবস্থিত প্রান্তিক বহুমুখী সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন সর্দারসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ইয়াসমিন আক্তার বলেন, সংসারের কষ্টার্জিত টাকা নিরাপদে রাখার আশায় তিনি সমিতিতে সঞ্চয় করেছিলেন। কিন্তু প্রয়োজনের সময় সেই টাকা ফেরত না পাওয়ায় তিনি চরম বিপাকে পড়েছেন।
রাগৈ গ্রামের বাসিন্দা আয়শা বেগমের দাবি, প্রান্তিক বহুমুখী সমবায় সমিতিতে তাঁর ৯৮ হাজার ১৬ টাকা সঞ্চয় রয়েছে। টাকা ফেরত চাইলে সমিতির পক্ষ থেকে জমি বিক্রি করে টাকা পরিশোধের কথা বলা হলেও দীর্ঘদিনেও তিনি টাকা পাননি।
অন্যদিকে, রাগৈ গ্রামে অবস্থিত সর্দার বহুমুখী এগ্রো ফার্মের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন মোহাম্মদ হোসেন। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন আশ্বাস ও প্রলোভনে তিনি প্রতিষ্ঠানটিতে টাকা জমা দিয়েছিলেন। পরে টাকা ফেরত চাইলে তাঁকে নানা ধরনের টালবাহানার মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠানটিতে আরও কয়েক শ মানুষ সঞ্চয়ের আশায় টাকা জমা দিয়েছেন।
আরেক ভুক্তভোগী রহিমা বেগম বলেন, কষ্ট করে জমানো ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ফেরত না পাওয়ায় তাঁর পরিবার এখন দিশেহারা। দ্রুত তদন্ত করে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
‘জমি বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করা হবে’
অভিযোগের বিষয়ে প্রান্তিক বহুমুখী সমবায় সমিতির কর্মকর্তা ও সর্দার বহুমুখী এগ্রো ফার্মের কর্ণধার মো. আব্দুল মতিন সর্দার বলেন, অর্থনৈতিক মন্দার কারণে প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। তবে তাঁদের পর্যাপ্ত জমি রয়েছে। এসব জমি বিক্রি করে গ্রাহকদের সঞ্চয়ের টাকা মুনাফাসহ ফেরত দেওয়া হবে।
তবে কবে নাগাদ গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি।
সমবায় অফিসের বক্তব্য
শাহরাস্তি উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. মোতালেব খান বলেন, তিনি যোগদানের আগেই প্রান্তিক বহুমুখী সমবায় সমিতির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সমিতিটি বর্তমানে অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
তিনি বলেন, সমিতিটির আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে জেলা সমবায় কার্যালয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল। পরে জেলা সমবায় কার্যালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি শাহরাস্তিতে এসে সমিতির কর্তৃপক্ষ বা গ্রাহকদের কাউকেই খুঁজে পায়নি।
অভিযোগ খতিয়ে দেখবে পুলিশ
শাহরাস্তি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান বলেন, শোরশাক বাজারের প্রান্তিক বহুমুখী সমবায় সমিতি এবং রাগৈ গ্রামের সর্দার বহুমুখী এগ্রো ফার্মের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কষ্টার্জিত সঞ্চয় ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা ভুক্তভোগীদের এখন একটাই প্রত্যাশা—অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, প্রকৃত ঘটনা সামনে আসুক এবং তাঁদের জমা করা অর্থ ফেরতের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাঁদের ভাষায়, সামান্য সামান্য করে জমানো এই অর্থ শুধু টাকা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু পরিবারের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন ও নিরাপত্তার আশ্বাস।






