নিজ গ্রামে পাকা বাড়ি, তবু উদ্বাস্তু পরিচয়ে সরকারি প্রথম শ্রেণির বাসভবন দখল!
নিজ গ্রামে পাকা বাড়ি, তবু উদ্বাস্তু পরিচয়ে সরকারি প্রথম শ্রেণির বাসভবন দখল!
নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজ গ্রামে রয়েছে পাকা বসতবাড়ি। অথচ নিজেকে উদ্বাস্তু পরিচয় দিয়ে চট্টগ্রামের নাছিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত একটি সরকারি বাসভবন দীর্ঘদিন ধরে দখলে রাখার অভিযোগ উঠেছে ইদ্রিচ নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নাছিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির রোড নং ২-এর ৫ নম্বর বাড়িটি প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত আবাসিক ভবন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ইদ্রিচ ওই বাসভবনে বসবাস করছেন। কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তিনি সরকারি এই বাসভবনের দখল পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইদ্রিচের গ্রামের বাড়ি আনোয়ারা উপজেলার মাহাতা গ্রামে। তাঁর দাবি, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘটনার সূত্র ধরে তিনি নিজেকে উদ্বাস্তু হিসেবে পরিচয় দিয়ে সরকারি আবাসনের সুবিধা নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাহাতা গ্রামে ইদ্রিচের নিজস্ব বসতবাড়ি রয়েছে। তার বাড়িটি কখনো পুড়ে যায়নি, বা পুড়ে দেয়া হয়নি। এরকম কোন সঠিক তথ্য বা সংবাদ অনুসন্ধানে পাওয়া যায় নি। বতমানে সেখানে একটি পাকা ভবনও রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—নিজ গ্রামে বসতবাড়ি ও পাকা ভবন থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে এবং কোন সরকারি নীতির আওতায় উদ্বাস্তু হিসেবে সরকারি আবাসনের সুবিধা পেলেন?
এই ইদ্রিচের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, স্থানীয় চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর জাল করে নিজেকে উদ্বাস্তু প্রমাণের জন্য একটি সনদ তৈরি ও দাখিল করা হয়েছিল। ওই সনদের ভিত্তিতেই নানা কৌশলে সরকারি আবাসনের সুবিধা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে কথিত সনদটি আসল নাকি জাল, চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর প্রকৃত নাকি নকল এবং সনদটি কোন দপ্তরে কীভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল—এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই করার প্রয়োজন।
নাছিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির রোড নং ২-এর ৫ নম্বর বাড়িটি কীভাবে ইদ্রিচের দখলে এলো—এ প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যদি উদ্বাস্তু পরিচয়ে বাসভবনটি পেয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর উদ্বাস্তু পরিচয়ের স্বপক্ষে কী নথি দাখিল করা হয়েছিল? সেই নথি কে যাচাই করেছিল? তাঁর নিজ গ্রামে থাকা বসতবাড়ি ও পাকা ভবনের তথ্য কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল? সরকারি আবাসন বরাদ্দের আগে তাঁর পরিচয় ও সম্পত্তির বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।
ইদ্রিচ নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করেন এবং সরকারি ভাতা গ্রহণ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের বৈধতা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, মুক্তিযুদ্ধের সময় ইদ্রিচের বিরুদ্ধে ডাকাতি এবং কয়েকজন নিরাপরাধ মানুষকে হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগের কথাও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
ইদ্রিচের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে তিনি ‘চাঁদাবাজ ইদ্রিচ’ নামে বেশ পরিচিত—এমন দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কোনো দৃশ্যমান পেশা বা কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত না থেকেও তিনি বিভিন্নভাবে অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সরকারি আবাসনের একটি ভবন যদি নিয়মবহির্ভূতভাবে দীর্ঘদিন দখলে থাকে, তাহলে সরকার আর্থিকভাবে কতটা ক্ষতির মুখে পড়েছে? সরকারি বাসভবন ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ভাড়া, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং দীর্ঘদিনের অবৈধ বা অনিয়মিত দখলের কারণে সরকারের যে আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে, সেটিও নিরূপণ করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে বরাদ্দ ও ব্যবহারসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করে প্রকৃত হিসাব বের করতে পারে।
মাহাতা গ্রামে ইদ্রিচের বসতবাড়ি ও পাকা ভবনের মালিকানা, কথিত উদ্বাস্তু সনদের সত্যতা, চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরের বৈধতা, নাছিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির রোড নং ২-এর ৫ নম্বর বাড়ি বরাদ্দের নথি, তাঁর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি ও সরকারি ভাতা গ্রহণের তথ্য এবং চাঁদাবাজির অভিযোগসংক্রান্ত নথিপত্র—সবকিছু যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সরকারি সম্পত্তি দখলমুক্ত করার পাশাপাশি জাল কাগজপত্র ব্যবহার বা প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে সরকারি বাসভবনটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারের কারণে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকলে, তারও হিসাব নিরূপণ করা প্রয়োজন। প্রশ্ন থেকেই যায়—নিজ গ্রামে পাকা বাড়ি থাকা একজন ব্যক্তি কীভাবে উদ্বাস্তু পরিচয়ে বছরের পর বছর প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত বাসভবন ব্যবহার করছেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, সরকারি নথির স্বচ্ছ যাচাই এবং প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ।






