১১ বছর পর নেপালে ভয়াবহ দুর্যোগ, ৩৮৯ মরদেহ উদ্ধার; দেড় হাজার নিখোঁজ, নতুন করে বড় বন্যার শঙ্কা—১ সেপ্টেম্বর ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
১১ বছর পর নেপালে ভয়াবহ দুর্যোগ, ৩৮৯ মরদেহ উদ্ধার; দেড় হাজার নিখোঁজ, নতুন করে বড় বন্যার শঙ্কা—১ সেপ্টেম্বর ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশেষ প্রতিবেদন : সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই। আকাশ পরিষ্কার, ঝলমলে রোদ। আগের রাতে বৃষ্টিরও দেখা মেলেনি। নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার নদীতীরবর্তী মানুষ তাই স্বাভাবিকভাবেই বেরিয়েছিলেন নিজেদের কাজে। কেউ বাজারে, কেউ কর্মস্থলে, কেউবা সীমান্তপথে। কাঠমান্ডু থেকে তিব্বতের লাসাগামী সড়কেও চলছিল পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত।
কেউ ভাবতেও পারেননি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যাবে সবকিছু।
সকাল গড়াতেই তিব্বতের দিক থেকে হঠাৎ নেমে আসে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির ভয়ংকর স্রোত। মুহূর্তের মধ্যে তছনছ হয়ে যায় চেনা জনপদ। ভেসে যায় ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিদ্যুৎ প্রকল্প। নদীর স্রোত হয়ে ওঠে যেন ধ্বংসের এক অপ্রতিরোধ্য বাহন।
বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপালে ৩৮৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ প্রায় দেড় হাজার মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৭০০ জন বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতের নাগরিক বলে জানা গেছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ৭৯৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে নিয়োজিত রয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী।
বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ উদ্ধার অভিযানে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করলেও নেপাল জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে।
বিপদ কাটেনি, বরং সামনে নতুন শঙ্কা
প্রথম ধাক্কা সামলানোর আগেই নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তিব্বতের একটি এলাকায় প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে দ্রুত পানি জমছে। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গিরং এলাকার উজানে তৈরি হওয়া ওই হ্রদে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছে। আগামী তিন দিনে সেখানে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে।
প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে গেলে আবারও বড় ধরনের বন্যা হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, পানির প্রবাহ ১ সেপ্টেম্বরের দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
ফলে উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি নতুন করে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
১০ ঘণ্টায় কয়েক নদী পেরিয়ে ধেয়ে আসে ঢল
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের সেন্টার অব হাইড্রোলজি অ্যান্ড ওয়াটার রিসোর্সেস রিসার্চের ফ্লাড ফোরকাস্টিং ডিভিশনের কারিগরি প্রতিবেদনে ভয়াবহ এই ঢলের গতিপথের একটি প্রাথমিক চিত্র পাওয়া গেছে।
সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি কম্পন রেকর্ড হয়। এর ২৮ মিনিট পর, সকাল ৯টা ৫ মিনিটে কর্তৃপক্ষ জানতে পারে—তিব্বতের দিক থেকে প্রবল ঢল ভোতেকোশি নদীতে ঢুকে পড়েছে।
এরপর ভোতেকোশি থেকে ত্রিশূলী নদী হয়ে ঢল দ্রুত ভাটির দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
সকাল ৯টা ১৫ থেকে ৯টা ১৬ মিনিটের মধ্যে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ান জেলার নদীতীরবর্তী মানুষকে সতর্ক করে ছয় লাখের বেশি এসএমএস পাঠানো হয়।
কিন্তু সময় ছিল অল্প।
বেলা ১১টা ২৬ মিনিটে মালেখুর ফুরকে পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে। মাত্র ১৭ মিনিট পর, ১১টা ৪৩ মিনিটে বন্যার পানিতে ফুরকে সেতু ও আশপাশের স্থাপনা ভেসে যায়।
দুপুরের দিকে ঢল মুগলিন এলাকা অতিক্রম করে। পরে দেবঘাট পর্যন্ত ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে ঢল নারায়ণী-দেবঘাট এলাকায় পৌঁছে যায়। বিকেল ৪টায় দেবঘাটে পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৫৭ মিটারে ওঠে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পানি কমতে শুরু করে।
প্রাথমিক হিসাবে, বন্যার সঙ্গে প্রায় দুই কোটি ঘনমিটার অতিরিক্ত পানি নেমে আসে। তিব্বতের দিক থেকে ভোতেকোশিতে প্রবেশের পর প্রায় ১০ ঘণ্টায় সেই ঢল ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী পেরিয়ে দেবঘাটে পৌঁছে যায়।
ধস থেকেই কি তৈরি হয়েছিল ভয়াবহ বন্যা?
দুর্যোগের কারণ নিয়ে এখনো বিশ্লেষণ চলছে। তবে স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢাল থেকে বিপুল বরফ ও পাথর ধসে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে।
৭ হাজার ২৪৫ মিটার উচ্চতার এই পর্বত থেকে নেমে আসা ধ্বংসাবশেষ লহেন্দেখোলা নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। এতে তৈরি হয় প্রাকৃতিক বাঁধ। বর্ষার পানিতে বাঁধের পেছনে পানি জমে সাময়িক হ্রদ সৃষ্টি হয়। পরে সেই বাঁধ ভেঙে বিপুল পানি, বরফ, পাথর ও কাদার স্রোত ভোতেকোশির দিকে ধেয়ে যায়।
নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটিও বরফ ও পাথরের ধসকে বন্যার প্রধান সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছে।
সেকেন্ডে ৫০ মিটার বেগে ধেয়ে আসে স্রোত
চীনের সরকারি ভূতত্ত্ববিদ গুও ঝাওচেংয়ের মতে, উঁচু পার্বত্য এলাকায় বরফধস থেকে ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ তৈরি হয়। পথে পাথর ও কাদা যুক্ত হয়ে সেটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এই স্রোতের গতি ছিল প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫০ মিটার। চীনের অংশে তা ২০ কিলোমিটারের বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
এত দ্রুত বিপর্যয় নেমে আসায় বহু মানুষ নিজেদের রক্ষারও সুযোগ পাননি।
নেপাল রেডক্রস জানিয়েছে, কয়েকটি গ্রাম পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বহু এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ছায়া?
বন্যার তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে সরাসরি দায়ী করার বিষয়ে বিজ্ঞানীরা সতর্ক। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পার্বত্য এলাকায় বরফ ও পাথর অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
তাপমাত্রা বাড়লে বরফ গলার পরিমাণ বাড়ে। একই সঙ্গে পরিবর্তিত হয় তুষারপাত ও বৃষ্টির ধরন। এতে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে বড় ধরনের ধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে নেপালের তুষারাবৃত পাহাড়ের মোট বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গলে গেছে। আগের দশকের তুলনায় সর্বশেষ দশকে দেশটির হিমবাহ গলার হার বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ।
হাসপাতালের সামনে অপেক্ষা, নদীর তীরে স্বজনদের খোঁজ
দুর্যোগের পর নেপালে চলছে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান। নদীতীর ও ভাটির বিভিন্ন এলাকায় নিখোঁজদের সন্ধান করছেন পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টারে করে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে খাবার, তাঁবু ও জরুরি সামগ্রী।
কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলোতে চলছে আরেক ধরনের অপেক্ষা। নিখোঁজ স্বজনের ছবি হাতে মানুষ ঘুরছেন এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে।
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে পুলিশ ডেস্কে টানানো হয়েছে নিখোঁজদের নাম ও ছবি। কোনো অ্যাম্বুলেন্স এলেই উৎকণ্ঠিত স্বজনেরা ছুটে যাচ্ছেন—হয়তো ভেতরে আছেন তাঁদের হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জন।
৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বারালের গল্প যেন এই দুর্যোগের মানবিক বেদনার প্রতিচ্ছবি। কাদার বিশাল ঢল ঘরে ঢুকে পড়ার পর স্ত্রীকে নিয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু প্রবল স্রোত তাঁর হাত থেকে স্ত্রীকে ছিনিয়ে নেয়।
এখনও তিনি অপেক্ষা করছেন। কাদার নিচে কোথাও হয়তো তাঁর স্ত্রী আছেন—এই আশায় তাঁকে খুঁজে চলেছেন।
২০১৫-এর পর আবারও বড় পরীক্ষা
২০১৫ সালের এপ্রিলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে নেপালে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনো দেশটির মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।
১১ বছর পর আবারও প্রকৃতির ভয়াবহ রূপের মুখোমুখি নেপাল।
উদ্ধারকর্মীরা ছুটছেন ধ্বংসস্তূপের ভেতর, নদীর তীরে, দুর্গম পাহাড়ি পথে। কোথাও চলছে নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান, কোথাও ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ হিসাব করছেন ক্ষতির।
কিন্তু সামনে আরও এক শঙ্কা—প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে জমছে পানি।
১ সেপ্টেম্বরের দিকে সম্ভাব্য নতুন ঢলের আশঙ্কায় তাই আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার প্রহর গুনছে নেপাল।
এই মুহূর্তে দেশটির মানুষের একটাই প্রত্যাশা—আর কোনো নদী যেন মানুষের ঘর কেড়ে না নেয়, আর কোনো পরিবার যেন স্বজন হারানোর বেদনায় নিঃস্ব না হয়।






