বাংলাদেশ ফার্স্ট ড. শেখ আকরাম আলী

বাংলাদেশ ফার্স্ট  ড. শেখ আকরাম আলী

“বাংলাদেশ ফার্স্ট” (বাংলাদেশ আগে) হলো তারেক রহমানের বর্তমান সরকারের মূল স্লোগান। এর অর্থ হলো বাংলাদেশ সবসময় এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে থাকবে। যদিও গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে মাত্র ছয় মাস আগে শুরু হওয়া তাঁর সরকারের মেয়াদের শুরুর দিকে এটি খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি, তবে তাঁর মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের মানুষকে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তাঁর সরকারের উদ্যোগগুলো বুঝতে সাহায্য করেছে।

এটি প্রকাশ করে যে বর্তমান জাতীয়তাবাদী সরকার ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতি উভয় ক্ষেত্রকেই যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা অনুসরণ করছে। সরকারের এই পদক্ষেপগুলো তাদের সমাজে বেশ জনপ্রিয় করে তুলেছে এবং সরকারের পরিপক্ক ও বিজ্ঞ সিদ্ধান্তের ওপর দেশের মানুষ আরও বেশি আস্থা অর্জন করেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোসহ বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণ বিষয়টিকে সাদরে গ্রহণ করেছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা ছিল। তবে ভারতের পক্ষ থেকে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই মুহূর্তে ভারত সফর না করার সরকারি ঘোষণায় তারা এখন স্বস্তি প্রকাশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের সাথে আলোচনায় বসতে আগ্রহী, যদি শেখ হাসিনাকে যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রধানমন্ত্রী জনগণের পালস বা অনুভূতি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন এবং আবারও প্রমাণ করেছেন যে তাঁর কাছে “বাংলাদেশ ফার্স্ট” ছাড়া অন্য কিছু প্রাধান্য পায় না।

যেখানে ভারত তাদের ভূখণ্ডে রেখে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘শেখ হাসিনা কার্ড’ ব্যবহার করে আসছিল, সেখানে এই সময়ে ভারত সফর না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তারেক রহমান জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে একটি সাহসী ও পরিপক্ক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে ভারত বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতির পরোয়া না করে আন্তর্জাতিক আইন ও রীতি লঙ্ঘন করে বাংলাদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আসছে।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’-এর চেতনাকে সমুন্নত রাখার মতো সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য বাংলাদেশের জনগণ তারেক রহমানের বর্তমান সরকারের পাশে রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত ঐক্য জাতিকে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পথ দেখাবে, তা দেশের ভেতর থেকেই আসুক বা বাইর থেকে। জনগণের এই ঐক্যই একটি জাতির সর্বোচ্চ শক্তি এবং এটিকে সর্বদা বর্তমান সরকারের পাশে থাকতে হবে।

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ভারত যেমন কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করেনি, বর্তমান তারেক রহমানের সরকারও ভালো করেই জানে যে ভারত তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। এই ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও সরকার রাজনৈতিক কৌশলকে বাণিজ্যিক কূটনীতির ওপর সফলভাবে প্রয়োগ করেছে এবং বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক ঝুঁকি নিয়েছে।

বর্তমান বিএনপি সরকার আবারও বাংলাদেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছে এবং প্রমাণ করেছে যে তারা সবসময় তাদের মহান নেতা জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার রেখে যাওয়া পদচিহ্ন অনুসরণ করে চলে। এই দুই নেতাই তাঁদের নিজ নিজ শাসননামলে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন মনোভাব প্রদর্শন করেছিলেন।

জিয়াউর রহমানই প্রথম বাংলাদেশে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তিনি কেবল ভারতের আধিপত্যবাদী নিয়ন্ত্রণ বলয় থেকে সফলভাবে বের হয়ে আসেননি, বরং একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন দেশ হিসেবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তিনি কখনোই বাংলাদেশের স্বার্থের সাথে আপস করেননি।

বেগম খালেদা জিয়াও সাহসিকতার সাথে জিয়াউর রহমানের সূচনা করা একই পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছিলেন এবং প্রজ্ঞা ও পরিপক্কতার সাথে ভারতের হুমকি মোকাবিলা করেছিলেন। কিন্তু পরিশেষে তিনি ২০০৬ সালে ভারতের আধিপত্যবাদী রাজনীতির শিকার হন। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় এনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও সফলভাবে ফিরে আসে।

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে পতন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ভারত শেখ হাসিনার অভিভাবক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। শেখ হাসিনা ও মোদী—উভয় সরকারের জন্যই ঘটনাটি একটি বড় ধাক্কা ছিল। ভারত ড. ইউনূসের সরকারকে সহযোগিতা করেনি; বরং তাঁর সরকারকে অস্থিতিশীল করতে নানা বৈরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। তবে ড. ইউনূসের সরকারের সময়ে বন্ধ করে দেওয়া ভিসা সুবিধাসহ বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে ভারত তারেক রহমানের বর্তমান সরকারের সাথে আবারও সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করে।

বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের শুরুর দিক থেকে ভারত বেশ বন্ধুসুলভ আচরণ দেখালেও, একই সাথে তারা তাদের নিজস্ব ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে রাজনীতি করতে উৎসাহিত করে ‘হাসিনা কার্ড’ ব্যবহার শুরু করে। ভারত সরকারের আশকারা পেয়ে শেখ হাসিনা ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। ভারত ভেবেছিল বাংলাদেশের মানুষ তাদের এই আধিপত্যবাদী রাজনীতি বুঝবে না। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার ভারতের এই পুরোনো খেলার পেছনের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরে সতর্ক হয়ে যায়।

অবশেষে এই পরিস্থিতিই বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে যে, ভারত যতক্ষণ না শেখ হাসিনাকে ফেরত দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি ভারত সফর করবেন না। ভারতের দ্বিচারিতা এখন পুরো বাংলাদেশের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে এবং তা জনগণ ও সরকারের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে পারে না। ফলে সমগ্র জাতি তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তাঁর পাশে থাকার অঙ্গীকার করছে।

তারেক রহমান ভারতের আধিপত্যবাদী রাজনীতি বুঝতে পেরেছেন এবং তাঁর সরকারের জন্য সামনে কী পরিণতি অপেক্ষা করছে তা জেনেও ভারতের অন্যায্য প্রস্তাবকে ‘না’ বলার অসাধারণ সাহস দেখিয়েছেন। তিনিই বাংলাদেশের প্রথম নেতা যিনি ভারতের আধিপত্যবাদী কর্মকাণ্ডকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।

এটি নিশ্চিতভাবেই একজন রাষ্ট্রনায়কের সঠিক কাজ, যিনি অন্তর থেকে তাঁর দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসেন। একজন দেশপ্রেমিক নেতা সর্বদা জনগণের আকাঙ্ক্ষার সাথে চলেন এবং জনগণকে তাঁর আসল শক্তি মনে করেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে তাঁকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। তাঁর প্রথম কাজ হবে জুলাই বিপ্লবের সময় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মত্যাগকে যথাযোগ্য সম্মান জানিয়ে তাদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করা। দেশে গণতান্ত্রিক চর্চার স্বার্থে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার সুযোগ বা স্পেস দেওয়া উচিত।

দ্বিতীয় কাজ হবে ভারত যদি ভবিষ্যতে কোনো কঠোর অবস্থান নেয়—যা কোনোভাবেই হেলাফেলা করা উচিত নয়—তবে অন্য কোনো দেশ থেকে অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক সহায়তা নিশ্চিত করা। প্রতিবেশী দেশের পক্ষ থেকে আসতে পারে এমন যেকোনো সম্ভাব্য রাজনৈতিক হুমকি বা ব্ল্যাকমেইল মোকাবিলার জন্য সরকারকে আগেই একটি আপদকালীন পরিকল্পনা (contingency plan) প্রস্তুত রাখতে হবে। এটিও একটি বাস্তবতা যে ভবিষ্যতের এই ধরনের সংকটে কেবল চীনই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় সহায়তা দিতে পারে। বাংলাদেশ সফর ও আলোচনার পর চীন ইতোমধ্যেই এলএনজি (LNG) ভর্তি জাহাজ পাঠিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট কমাতে এগিয়ে এসেছে এবং সহজ শর্তে ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। সংকটের সময়ে তারা আমাদের পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এটি নিশ্চিত যে ভারত তাদের ‘হাসিনা কার্ড’ খেলা ছেড়ে দেবে না এবং তারা শেষ পর্যন্ত এটি ব্যবহার করার চেষ্টা করবে। তাই ভবিষ্যতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে সরকারের এবং এর নেতার সাহস ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তা সহজেই মোকাবিলা করা সম্ভব। জাতি যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতি বাস্তবায়নে তারেক রহমানের বর্তমান সরকারের পাশে থাকে, তবে কেউ দেশের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। ‘সকালের সূর্যই জানিয়ে দেয় দিনটি কেমন যাবে’ (Morning shows the day)—আর আজ পর্যন্ত পরিস্থিতি বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছে।

বাংলাদেশের আকাশ এখনো কালো মেঘমুক্ত নয় এবং সংকট এখনো কেটে যায়নি। তবে জনগণ যদি সাহসের সাথে এটি মোকাবিলার সংকল্প করে, তবে মানুষের এই ঐক্য যেকোনো সংকট অতিক্রম করতে পারে এবং চিরউন্নত শিরে জাতির টিকে থাকার পথ তৈরি করতে পারে। যদি কোনো কিছু “বাংলাদেশ ফার্স্ট”-এর স্বার্থবিরোধী হয়, তবে আমাদের অবশ্যই স্পষ্ট করে ‘না’ বলতে সক্ষম হতে হবে। এই মহান ও সাহসী নেতা তারেক রহমানকে জাতির সালাম।

লেখক: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন গবেষক।

২০ আগস্ট ২০২৬

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

বাংলাদেশ ফার্স্ট  ড. শেখ আকরাম আলী

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল থেকে স্বীকৃতির মঞ্চে; ২০১৩ সাল থেকে শিক্ষকতা, আনন্দঘন পাঠদান ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থা

নিজস্ব প্রতিনিধি : একটি গান, একটি রিল ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও ট্রল। ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল ভার্চুয়াল জগতে। নানা মন্তব্য আর সমালোচনার মধ্যে একসময় ভিডিওটি সরিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই বিতর্কের কয়েক মাস পরই সামনে এলো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের আরেকটি পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাকে পেছনে ফেলে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিউটি রানী পাল।

তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে চারজনকে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁদের একজন বিউটি রানী পাল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর স্বাক্ষর করা একটি স্মারকের মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষকদের নাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও সেখানে বিউটি রানী পালের নাম ছিল না।

যে রিল ঘিরে আলোচনাঃ

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ‘ডিফরেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় একটি গানের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি রানী পাল। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’—গানের এই অংশ ব্যবহারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটির সঙ্গে নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে তা প্রচার করা হলে তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও ট্রল। সাইবার বুলিংয়ের মুখে একপর্যায়ে ভিডিওটি সরিয়ে নেন তিনি।

তবে ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল একজন শিক্ষককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকার শত শত নারী শিক্ষক একই গানের সঙ্গে নিজেদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। শিক্ষক সমাজের এমন অভিনব প্রতিবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সংহতি প্রকাশ করেন।

ফলে একটি ব্যক্তিগত রিল ভিডিওকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনা পরিণত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী শিক্ষকদের প্রতি আচরণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অনলাইন হয়রানি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায়।

বিতর্কের বাইরে অন্য এক পরিচয়ঃ

তবে বিউটি রানী পালের শিক্ষকতা জীবনের গল্প শুরু হয়নি ওই রিল ভিডিও দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত তিনি। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সৃজনশীল নানা কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন তিনি। আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শরীরচর্চা এবং নাচের ছন্দে পড়াশোনাকে সহজ করে তোলার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এসব উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এর আগেও তিনি একবার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো জেলা পর্যায়ের এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বনাম শ্রেণিকক্ষঃ

বিউটি রানী পালের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। অনলাইনে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও যেমন দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তেমনি সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মন্তব্য বা প্রচারণাও মুহূর্তে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে একজন শিক্ষকের প্রকৃত কাজের পরিধি অনেক দীর্ঘ। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, তাদের আগ্রহ তৈরি করা, শেখার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার মূল্যায়ন একটি রিল ভিডিওর কয়েক মিনিটের দৃশ্য দিয়ে করা সম্ভব নয়।

বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা তাঁকে আলোচনায় এনেছিল। কিন্তু জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের কাজ ও অবদানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্বীকৃতি কি বদলে দেয় আলোচনার ভাষা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ দ্রুত মতামত দেয়। সেখানে প্রেক্ষাপট, দীর্ঘমেয়াদি কাজ কিংবা একজন ব্যক্তির সামগ্রিক পরিচয় অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। বিউটি রানী পালের ঘটনাতেও প্রথমে সামনে এসেছিল একটি রিল ভিডিও। পরে সামনে এসেছে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পাঠদানের বিষয়টি।

জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার তথ্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই ব্যক্তিকে ঘিরে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর পেশাগত কাজের স্বীকৃতিও রয়েছে—দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে।

শিক্ষকের পরিচয় শ্রেণিকক্ষেইঃ

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর শ্রেণিকক্ষের কাজ—শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বাইরে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের এই দিকটিই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার।

একটি রিল তাঁকে পরিচিত করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; আর শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ তাঁকে এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিউটি রানী পালের গল্পটি যেন মনে করিয়ে দেয়—ভার্চুয়াল জগতের কয়েক মুহূর্তের আলোচনার চেয়ে একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের কাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

বাংলাদেশ ফার্স্ট  ড. শেখ আকরাম আলী

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ অনুদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা এবং অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এ অনুদান দেওয়া হবে।

এবার অনলাইনের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির মাধ্যমে সুপারিশকৃত আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে পৌঁছাতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিচালন বাজেটের আওতায় বিশেষ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থ বিতরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাইগভ প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত, দুর্গম, উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকার অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যে খাতে দেওয়া হবে অনুদান:

বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মেরামত ও সংস্কার, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা, প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা এবং পাঠাগার উন্নয়নে বিশেষ অনুদান দেওয়া হবে।

এ ছাড়া বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনাজনিত কারণে আর্থিক সহায়তার জন্যও আবেদন করা যাবে।

অগ্রাধিকার পাবেন যেসব শিক্ষার্থীঃ

সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনায় আক্রান্ত, দুস্থ, মেধাবী, এতিম, অদম্য মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অসহায় ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন।

দেশের উপকূলীয়, চরাঞ্চল, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদেরও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যেভাবে করতে হবে আবেদনঃ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। আর স্নাতক বা সমমান এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে জমা দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রার আবেদনগুলো গ্রহণ করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে একত্র করবেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।

অনলাইন ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাতে দ্বৈতভাবে সুপারিশ না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ জন্য জেলা কমিটি আগে অনলাইনে সুপারিশ করা তালিকার সঙ্গে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাওয়া আবেদনসমূহ সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে।

নির্ধারিত আবেদন ফরম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট www.shed.gov.bd-এ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

সময়সীমা ১৫ অক্টোবরঃ

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাওয়া আবেদন জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবে। সুপারিশকৃত তালিকা আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর পৌঁছাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া কোনো আবেদন বিবেচনা করা হবে না।

শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা যেন কেবল শহর কিংবা সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে সরকারি সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

বাংলাদেশ ফার্স্ট  ড. শেখ আকরাম আলী

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

—— মানিক লাল ঘোষ ——
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে কজন বিপ্লবীর নাম সাহস, আত্মত্যাগ ও দুর্জয় প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নারী ছিলেন না; ছিলেন এমন এক সময়ের অদম্য কণ্ঠ, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নারীর জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ ছিল নানা বাধায় পরিপূর্ণ। মাত্র ২১ বছরের জীবনে প্রীতিলতা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয়।
২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর শহীদ হওয়ার দিন। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে—যিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভায় চাকরি করতেন এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন গৃহিণী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও মননশীল।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই অসাধারণ সাফল্য প্রমাণ করে, প্রীতিলতা কেবল সাহসী বিপ্লবীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গভীর মননশীল ও মেধাবী নারীও।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। নন্দনকানন অপরনাচরণ স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন এবং পরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বও পালন করেন। একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশাজীবন তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দেশের পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং বৈষম্যের বাস্তবতা তাঁকে অন্য এক পথে টেনে নেয়।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রীতিলতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় পড়াশোনার সময় তিনি দীপালি সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন—যে সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের শারীরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান সংগঠক মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ তখন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু প্রীতিলতা ধীরে ধীরে সংগঠনের আস্থা অর্জন করেন। গোপন যোগাযোগ, বিপ্লবীদের সহায়তা, সংবাদ ও প্রচারপত্র পৌঁছে দেওয়া, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তিনি অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন সহযোগী নন, গুরুত্বপূর্ণ একজন সংগঠক ও নেতৃত্বদানের যোগ্য বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩২ সালে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলন তখন চট্টগ্রামে তীব্রতর। এরই মধ্যে পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থায় ক্লাবটি ছিল ইউরোপীয়দের সামাজিক আধিপত্য ও বর্ণবৈষম্যের একটি প্রতীক। ক্লাবটির প্রবেশপথে থাকা ‘Dogs and Indians not allowed’ ধরনের বর্ণবাদী বার্তা ভারতীয়দের প্রতি ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার নির্মম প্রকাশ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এই ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতার ওপর অর্পিত হয়। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে, যা ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহর পর্যন্ত গড়ায়, তিনি বিপ্লবীদের একটি দল নিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করেন। পুরুষের ছদ্মবেশে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবীরা ক্লাবে হামলা চালায় এবং ভবনের অংশবিশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন এবং একপর্যায়ে তিনি বিচ্ছিন্ন ও ঘেরাও হয়ে পড়েন।
প্রীতিলতা জানতেন, ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে। বিপ্লবীদের মধ্যে বন্দিত্ব এড়ানোর জন্য সায়ানাইড বহনের পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তী ময়নাতদন্তে জানা যায়, গুলির আঘাতটি প্রাণঘাতী ছিল না; সায়ানাইড বিষক্রিয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।
প্রীতিলতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি জীবন থেমে গেলেও তাঁর আদর্শ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস থেমে যায়নি। তিনি হয়ে উঠলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক। সমকালীন ও পরবর্তী ইতিহাসচর্চায় তাঁকে বাংলার প্রথম নারী শহীদদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
প্রীতিলতার জীবনকে শুধু তাঁর মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে বিচার করলে তাঁর সংগ্রামের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। একজন মেধাবী ছাত্রী থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে বিপ্লবী সংগঠক এবং শেষ পর্যন্ত একটি সশস্ত্র অভিযানের নেত্রী—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাই তাঁর জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য।
আজকের দিনে প্রীতিলতাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই মূল্যবোধগুলো একজন মানুষকে ইতিহাসের অংশ করে তুলতে পারে। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর তাঁর স্মৃতি অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন অগ্নিঝরা এক জীবন, যার দীপ্তি মাত্র ২১ বছরের আয়ুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে।
শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)