জুলাই যোদ্ধারা

জুলাই যোদ্ধারা

জুলাই যোদ্ধারা

ড. শেখ আকরাম আলী

জুলাই ছিল এমন কিছু যোদ্ধার লড়াইয়ের ফসল, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন এবং কোনো তলোয়ার বা অস্ত্র ছাড়াই লড়াই করে জাতির জন্য এক মহান বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। তারা ছিলেন নিঃস্বার্থ যোদ্ধা—রাজনৈতিক নেতাদের মতো ক্ষমতার কোনো লোভ তাদের ছিল না। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং হেফাজতে ইসলাম ফ্যাসিবাদী শাসনের পুরো সময় জুড়ে তাদের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম ও ত্যাগের মাধ্যমে একটি পটভূমি তৈরি করেছিল। তবে বাস্তবতা হলো, তারা যখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সব আশা ছেড়ে দিয়েছিল, তখন এই নিরস্ত্র যোদ্ধারাই জাতিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে এবং সফল হয়।

যদিও এর কোনো একক নেতৃত্ব ছিল না এবং কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শন ছিল না, তাও এটি ঘটেছে। ঠিক কী কারণে এই হঠাৎ আন্দোলন শুরু হলো এবং এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন নিয়ে এলো—তা দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষকদের মনে বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, বেশিরভাগ বিশ্লেষকেরই পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে এবং তারা হয় কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি দুর্বল, না হয় বিদেশি কোনো শক্তির হয়ে কাজ করেন। আর জাতীয় জীবনে যেসব বিষয়ের মুখোমুখি আমরা হই, সেগুলোর একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন পাওয়া আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনকভাবেই বিরল।

মূলত, কোটা ব্যবস্থার বিলোপ এবং সমাজে মেধার মূল্যায়নের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার এক সুপ্ত দর্শন এর পেছনে কাজ করেছিল। যেকোনো সমাজে অভ্যুত্থানের পেছনে অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্য সব সময়ই মূল কারণ হিসেবে কাজ করে। মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈষম্যের ফলেই পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল, কারণ ভবিষ্যৎ সমাধানের কোনো আশা ছিল না। আবার তৎকালীন আওয়ামী লীগ কর্তৃক পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য তুলে ধরা হয়েছিল, যা আন্দোলনকারীদের আবেগকে উসকে দিতে দারুণ কাজ করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্মের পথ সুগম করেছিল।

স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশের মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে তারা পরিস্থিতির শিকার। অতীতে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের ব্যর্থতা এবং শাসকদলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর চালানো নির্যাতন তাদের রাজনীতিতে পরিবর্তনের চিন্তা করতে বাধ্য করেছিল।

১৯৭৪ সালের ঐতিহাসিক দুর্ভিক্ষ এবং একদলীয় শাসন ব্যবস্থা ‘বাকশাল’-এর প্রবর্তন আগস্ট ১৯৭৫-এর মাঝামাঝি সময়ে শেখ মুজিবের ফ্যাসিবাদী শাসন পরিবর্তনের বিপ্লবের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে কাজ করেছিল। এটা নিশ্চিত যে, এর পেছনে দেশের বাইরের কোনো মাস্টারমাইন্ড কাজ করেছিল এবং তারা বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুদের মাধ্যমে এটি সম্ভব করেছিল। কিন্তু সেটি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত ভাগ্য জিয়াউর রহমানের পক্ষে যায়, যিনি জাতির জন্য এক মহান নেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন। তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন এবং ভারতের আধিপত্যবাদী প্রভাব থেকে মুক্ত এক আধুনিক বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন ও জাতিকে রক্ষা করেছিলেন, কিন্তু নিজের জীবন বাঁচাতে ব্যর্থ হন।

পরবর্তী যুগের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক—উভয় চর্চাই দেখা গেছে এবং জনগণ কম-বেশি শান্তিতে ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা ভারতের সরাসরি সমর্থনে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসেন, যা তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাংলাদেশের মানুষকে শাসন করার ব্যাপারে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

তিনি জনগণকে নয়, বরং ভারতকে তার ক্ষমতার একমাত্র উৎস বলে মনে করতেন এবং শিগগিরই তার পিতা শেখ মুজিবের মতো বাংলাদেশের একজন স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে আবির্ভূত হন। ক্ষমতার স্বার্থে তিনি জনগণের প্রতি কতটা নির্দয় ও কঠোর হতে পারেন, ইতিহাসে তা খুব কমই দেখা গেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীসহ সমগ্র সমাজ যখন গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকার পরিবর্তনের আশা একপ্রকার ছেড়েই দিয়েছিল, তখন ছাত্র যোদ্ধাদের নেতৃত্বে কোটা আন্দোলনের রূপ ধরে হঠাৎ এক অভ্যুত্থান ঘটে। এটি মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র দেশকে নাড়িয়ে দেয়, যার জন্য মানুষ দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।

একটি ছাত্র আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও, সাধারণ মানুষের গণহত্যার পর এই আন্দোলনটি পূর্ণাঙ্গ গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আন্দোলনের এই তীব্রতার পেছনে চলমান সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা সংকটও জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল—যার মধ্যে ছিল জাতীয় অর্থনীতি পরিচালনায় সরকারের চরম ব্যর্থতা, সরকারি কর্মকর্তাদের লাগামহীন দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, শেখ হাসিনা কর্তৃক দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ এবং ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদ ও গণতন্ত্রের পতন।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ, যার ১৬ জুলাই গুলিতে মৃত্যু সারা দেশে প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিয়েছিল। নিরাপত্তা বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন দল-সংযুক্ত গোষ্ঠীগুলো কর্তৃক বৈষম্যবিরোধী প্রতিবাদ দমনের সময় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে অধিকাংশ ছিল তরুণ আন্দোলনকারী ও শিশু (যার মধ্যে চার বছর বয়সী শিশু আবদুল আহাদও ছিল)।

বিক্ষোভ দমনে সান্ধ্য আইন (কারফিউ), ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং তাজা গুলি ব্যবহার করা হয়। জুলাইয়ের শেষের দিকে, সরকারের তীব্র দমনপীড়নের কারণে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে, যেখানে ১৯ জুলাই সহিংসতার চরম রূপ নেয় এবং একদিনেই অন্তত ৬৬ জন নিহত হন। অন্যান্য সুপরিচিত শিকারদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্র মীর মুগ্ধ এবং সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়, যারা প্রতিবাদ করার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

জুলাইয়ের শেষের দিকে সরকার আন্দোলনকারীদের ওপর যে গণহত্যা চালায়—যা ‘জুলাই গণহত্যা’ নামে পরিচিত—তার পর এই আন্দোলন একটি পূর্ণাঙ্গ গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই আন্দোলনে নারীদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ দেখা গেছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। তরুণী বিশ্ববিদ্যালয় ও হাইস্কুলের ছাত্রীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে। আগস্টের শুরুর দিকে আন্দোলনটি অসহযোগ আন্দোলনে রূপ নেয়, যা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এটিকে বিশ্বের প্রথম সফল ‘জেন জি (Gen Z)’ বিপ্লব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল।

শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এক সাংবিধানিক সংকটের জন্ম দেয়, যার ফলে ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। অনেক বিশেষজ্ঞই এটিকে একটি সফল বিপ্লবের পর একটি অস্বাভাবিক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। সেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবর্তে একটি বিপ্লবী সরকার গঠিত হওয়া উচিত ছিল। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল নিজেই তাদের অপরিপক্কতা ও অজ্ঞতার কথা স্বীকার করেছিলেন এবং এর ফলে ড. ইউনূসের সরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিপ্লবী চেতনা ও সাহসিকতার অভাবে ভুগেছিল। তারা আন্তরিক ছিলেন, কিন্তু জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ব্যর্থ হন। তা সত্ত্বেও, তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা, জুলাই সনদের গুরুত্ব এবং গত ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টিকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। সফল প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গণভোট আয়োজন করাও ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য একটি মাইলফলক।

এখন বল বর্তমান সরকারের কোর্টে এবং তারা জুলাই সনদকে উপেক্ষা করতে পারবে না, আবার গণভোটের মাধ্যমে প্রদত্ত রায় বাস্তবায়ন এড়াতেও পারবে না। যত দ্রুত সম্ভব এটি বাস্তবায়ন করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে, অন্যথায় বাংলাদেশের মানুষ তারিক রহমানের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে যেতেও দ্বিধা করবে না। জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার কোনো নজির ইতিহাসে নেই।

যেসব যোদ্ধা স্বেচ্ছায় জীবন দিয়েছেন এবং যারা দৃষ্টিশক্তি হারানোসহ হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন—তাদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে হলেও সংস্কার ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ দেখতে চায় যে এই যোদ্ধারা যেন সমাজে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা পান। ২০২৪ সালের জুলাই নিশ্চিতভাবেই এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে অনুপস্থিত ছিল। জাতির ভবিষ্যৎ নিশ্চিতভাবেই জুলাইয়ের চেতনা এবং এর সঠিক বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে।

নতুন বাংলাদেশের জন্য জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে কারোই উপেক্ষা করা উচিত নয়। ভবিষ্যতের এই চ্যালেঞ্জপূর্ণ যাত্রায় পরিপক্কতা ও প্রজ্ঞা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বর্তমান সরকার সঠিক পথেই আছে বলে মনে হচ্ছে, তবে জনগণ ও দেশ এখনো বিপদমুক্ত নয়। বাংলাদেশ ইতিহাসের একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে আমাদের এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। আর জাতির আসল শক্তি লুকিয়ে আছে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত জনগণের ঐক্যের মধ্যে।

লেখক পরিচিতি : ড.শেখ আকরাম আলী, একজন আইনের অধ্যাপক।

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

জুলাই যোদ্ধারা

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল থেকে স্বীকৃতির মঞ্চে; ২০১৩ সাল থেকে শিক্ষকতা, আনন্দঘন পাঠদান ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থা

নিজস্ব প্রতিনিধি : একটি গান, একটি রিল ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও ট্রল। ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল ভার্চুয়াল জগতে। নানা মন্তব্য আর সমালোচনার মধ্যে একসময় ভিডিওটি সরিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই বিতর্কের কয়েক মাস পরই সামনে এলো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের আরেকটি পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাকে পেছনে ফেলে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিউটি রানী পাল।

তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে চারজনকে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁদের একজন বিউটি রানী পাল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর স্বাক্ষর করা একটি স্মারকের মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষকদের নাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও সেখানে বিউটি রানী পালের নাম ছিল না।

যে রিল ঘিরে আলোচনাঃ

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ‘ডিফরেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় একটি গানের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি রানী পাল। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’—গানের এই অংশ ব্যবহারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটির সঙ্গে নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে তা প্রচার করা হলে তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও ট্রল। সাইবার বুলিংয়ের মুখে একপর্যায়ে ভিডিওটি সরিয়ে নেন তিনি।

তবে ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল একজন শিক্ষককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকার শত শত নারী শিক্ষক একই গানের সঙ্গে নিজেদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। শিক্ষক সমাজের এমন অভিনব প্রতিবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সংহতি প্রকাশ করেন।

ফলে একটি ব্যক্তিগত রিল ভিডিওকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনা পরিণত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী শিক্ষকদের প্রতি আচরণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অনলাইন হয়রানি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায়।

বিতর্কের বাইরে অন্য এক পরিচয়ঃ

তবে বিউটি রানী পালের শিক্ষকতা জীবনের গল্প শুরু হয়নি ওই রিল ভিডিও দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত তিনি। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সৃজনশীল নানা কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন তিনি। আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শরীরচর্চা এবং নাচের ছন্দে পড়াশোনাকে সহজ করে তোলার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এসব উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এর আগেও তিনি একবার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো জেলা পর্যায়ের এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বনাম শ্রেণিকক্ষঃ

বিউটি রানী পালের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। অনলাইনে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও যেমন দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তেমনি সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মন্তব্য বা প্রচারণাও মুহূর্তে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে একজন শিক্ষকের প্রকৃত কাজের পরিধি অনেক দীর্ঘ। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, তাদের আগ্রহ তৈরি করা, শেখার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার মূল্যায়ন একটি রিল ভিডিওর কয়েক মিনিটের দৃশ্য দিয়ে করা সম্ভব নয়।

বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা তাঁকে আলোচনায় এনেছিল। কিন্তু জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের কাজ ও অবদানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্বীকৃতি কি বদলে দেয় আলোচনার ভাষা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ দ্রুত মতামত দেয়। সেখানে প্রেক্ষাপট, দীর্ঘমেয়াদি কাজ কিংবা একজন ব্যক্তির সামগ্রিক পরিচয় অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। বিউটি রানী পালের ঘটনাতেও প্রথমে সামনে এসেছিল একটি রিল ভিডিও। পরে সামনে এসেছে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পাঠদানের বিষয়টি।

জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার তথ্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই ব্যক্তিকে ঘিরে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর পেশাগত কাজের স্বীকৃতিও রয়েছে—দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে।

শিক্ষকের পরিচয় শ্রেণিকক্ষেইঃ

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর শ্রেণিকক্ষের কাজ—শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বাইরে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের এই দিকটিই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার।

একটি রিল তাঁকে পরিচিত করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; আর শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ তাঁকে এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিউটি রানী পালের গল্পটি যেন মনে করিয়ে দেয়—ভার্চুয়াল জগতের কয়েক মুহূর্তের আলোচনার চেয়ে একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের কাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

জুলাই যোদ্ধারা

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ অনুদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা এবং অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এ অনুদান দেওয়া হবে।

এবার অনলাইনের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির মাধ্যমে সুপারিশকৃত আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে পৌঁছাতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিচালন বাজেটের আওতায় বিশেষ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থ বিতরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাইগভ প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত, দুর্গম, উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকার অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যে খাতে দেওয়া হবে অনুদান:

বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মেরামত ও সংস্কার, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা, প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা এবং পাঠাগার উন্নয়নে বিশেষ অনুদান দেওয়া হবে।

এ ছাড়া বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনাজনিত কারণে আর্থিক সহায়তার জন্যও আবেদন করা যাবে।

অগ্রাধিকার পাবেন যেসব শিক্ষার্থীঃ

সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনায় আক্রান্ত, দুস্থ, মেধাবী, এতিম, অদম্য মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অসহায় ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন।

দেশের উপকূলীয়, চরাঞ্চল, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদেরও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যেভাবে করতে হবে আবেদনঃ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। আর স্নাতক বা সমমান এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে জমা দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রার আবেদনগুলো গ্রহণ করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে একত্র করবেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।

অনলাইন ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাতে দ্বৈতভাবে সুপারিশ না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ জন্য জেলা কমিটি আগে অনলাইনে সুপারিশ করা তালিকার সঙ্গে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাওয়া আবেদনসমূহ সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে।

নির্ধারিত আবেদন ফরম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট www.shed.gov.bd-এ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

সময়সীমা ১৫ অক্টোবরঃ

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাওয়া আবেদন জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবে। সুপারিশকৃত তালিকা আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর পৌঁছাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া কোনো আবেদন বিবেচনা করা হবে না।

শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা যেন কেবল শহর কিংবা সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে সরকারি সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

জুলাই যোদ্ধারা

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

—— মানিক লাল ঘোষ ——
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে কজন বিপ্লবীর নাম সাহস, আত্মত্যাগ ও দুর্জয় প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নারী ছিলেন না; ছিলেন এমন এক সময়ের অদম্য কণ্ঠ, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নারীর জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ ছিল নানা বাধায় পরিপূর্ণ। মাত্র ২১ বছরের জীবনে প্রীতিলতা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয়।
২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর শহীদ হওয়ার দিন। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে—যিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভায় চাকরি করতেন এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন গৃহিণী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও মননশীল।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই অসাধারণ সাফল্য প্রমাণ করে, প্রীতিলতা কেবল সাহসী বিপ্লবীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গভীর মননশীল ও মেধাবী নারীও।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। নন্দনকানন অপরনাচরণ স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন এবং পরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বও পালন করেন। একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশাজীবন তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দেশের পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং বৈষম্যের বাস্তবতা তাঁকে অন্য এক পথে টেনে নেয়।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রীতিলতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় পড়াশোনার সময় তিনি দীপালি সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন—যে সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের শারীরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান সংগঠক মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ তখন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু প্রীতিলতা ধীরে ধীরে সংগঠনের আস্থা অর্জন করেন। গোপন যোগাযোগ, বিপ্লবীদের সহায়তা, সংবাদ ও প্রচারপত্র পৌঁছে দেওয়া, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তিনি অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন সহযোগী নন, গুরুত্বপূর্ণ একজন সংগঠক ও নেতৃত্বদানের যোগ্য বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩২ সালে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলন তখন চট্টগ্রামে তীব্রতর। এরই মধ্যে পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থায় ক্লাবটি ছিল ইউরোপীয়দের সামাজিক আধিপত্য ও বর্ণবৈষম্যের একটি প্রতীক। ক্লাবটির প্রবেশপথে থাকা ‘Dogs and Indians not allowed’ ধরনের বর্ণবাদী বার্তা ভারতীয়দের প্রতি ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার নির্মম প্রকাশ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এই ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতার ওপর অর্পিত হয়। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে, যা ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহর পর্যন্ত গড়ায়, তিনি বিপ্লবীদের একটি দল নিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করেন। পুরুষের ছদ্মবেশে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবীরা ক্লাবে হামলা চালায় এবং ভবনের অংশবিশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন এবং একপর্যায়ে তিনি বিচ্ছিন্ন ও ঘেরাও হয়ে পড়েন।
প্রীতিলতা জানতেন, ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে। বিপ্লবীদের মধ্যে বন্দিত্ব এড়ানোর জন্য সায়ানাইড বহনের পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তী ময়নাতদন্তে জানা যায়, গুলির আঘাতটি প্রাণঘাতী ছিল না; সায়ানাইড বিষক্রিয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।
প্রীতিলতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি জীবন থেমে গেলেও তাঁর আদর্শ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস থেমে যায়নি। তিনি হয়ে উঠলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক। সমকালীন ও পরবর্তী ইতিহাসচর্চায় তাঁকে বাংলার প্রথম নারী শহীদদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
প্রীতিলতার জীবনকে শুধু তাঁর মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে বিচার করলে তাঁর সংগ্রামের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। একজন মেধাবী ছাত্রী থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে বিপ্লবী সংগঠক এবং শেষ পর্যন্ত একটি সশস্ত্র অভিযানের নেত্রী—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাই তাঁর জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য।
আজকের দিনে প্রীতিলতাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই মূল্যবোধগুলো একজন মানুষকে ইতিহাসের অংশ করে তুলতে পারে। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর তাঁর স্মৃতি অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন অগ্নিঝরা এক জীবন, যার দীপ্তি মাত্র ২১ বছরের আয়ুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে।
শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)