‘স্ত্রীকে হারানোর চেয়ে বড় আযাব নেই’—অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে মিম হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইলেন স্বামী
'স্ত্রীকে হারানোর চেয়ে বড় আযাব নেই’—অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে মিম হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইলেন স্বামী
নিজস্ব প্রতিবেদক | শাহরাস্তি (চাঁদপুর) থেকে : একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একজন মানুষের জীবনই কেড়ে নেয় না; মুহূর্তেই ভেঙে দেয় একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিশ্চিন্ততা আর ভবিষ্যতের সব পরিকল্পনা। প্রিয়জনের শূন্যতা কোনো ভাষায় পূরণ হয় না। চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে আলোচিত গৃহবধূ রিগান আক্তার মিম হত্যাকাণ্ডের পর এমনই অসহনীয় শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন তাঁর স্বামী সাইফুল ইসলাম রনি।
দীর্ঘ নীরবতার পর প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন একটি আবেগঘন বক্তব্য। সেখানে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি লিখেছেন, “স্ত্রীকে হারানোর চেয়ে বড় আযাব এই পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না।”
রনি বলেন, জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন তিনি। একদিকে স্ত্রীকে হারানোর গভীর বেদনা, অন্যদিকে দুই অবুঝ শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর কাছে যেন এক দীর্ঘ মানসিক সংগ্রাম।
তিনি বলেন, “যারা আমার স্ত্রীর হত্যার সঙ্গে জড়িত, তারা যে-ই হোক না কেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। কোনো নির্দোষ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, আবার কোনো অপরাধীও যেন ছাড় না পায়।”
সম্প্রতি একটি মানববন্ধনে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলার এক আসামির জামিন চাওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রনি অভিযোগটি সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, শুরু থেকেই তিনি হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছেন। অপরাধীদের পক্ষে তিনি কখনো অবস্থান নেননি এবং ভবিষ্যতেও নেবেন না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি আরও উল্লেখ করেন, শোকের এই সময়ে অনেকের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহমর্মিতা পাননি। বরং বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিত্তিহীন মন্তব্য ও অভিযোগ তাঁর মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দুই শিশুসন্তানের কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রনি। তিনি বলেন, “ওদের ভবিষ্যৎ এখন আমার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কিন্তু মায়ের শূন্যতা কখনোই পূরণ করা সম্ভব নয়।” তিনি প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সমাজের সচেতন মানুষের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়।
এদিকে, মিম হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে শাহরাস্তিতে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। গত ১৮ জুলাই বিকেলে মেহের কালীবাড়ি এলাকায় আয়োজিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে নিহতের পরিবার, স্বজন এবং স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে শাহরাস্তি পৌরসভার বাত্তলা এলাকার বেপারী বাড়িতে নিজ ঘরে নিহত হন গৃহবধূ রিগান আক্তার মিম। পরদিন তাঁর বাবা মো. কবির হোসেন শাহরাস্তি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার পর পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানের নির্দেশনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. লুৎফর রহমানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়। তদন্তের এক পর্যায়ে নিহতের জা কাজী সুমাইয়া হোসেন মিনা (২৩)-কে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পারিবারিক বিরোধের জেরে গলা চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যার কথা স্বীকার করেন। পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। তবে মামলার তদন্ত এখনো চলমান। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ হত্যাকাণ্ড ঘিরে শাহরাস্তিজুড়ে এখনও শোক, ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দা, নিহতের পরিবার এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের একটাই প্রত্যাশা—নিরপেক্ষ, দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন নির্মম ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে না হয়।
একটি পরিবারের কান্না যেন আরেকটি পরিবারের ভাগ্য না হয়—এটাই এখন শাহরাস্তির মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।






