১১ বছর পর নেপালে ভয়াবহ দুর্যোগ, ৩৮৯ মরদেহ উদ্ধার; দেড় হাজার নিখোঁজ, নতুন করে বড় বন্যার শঙ্কা—১ সেপ্টেম্বর ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

১১ বছর পর নেপালে ভয়াবহ দুর্যোগ, ৩৮৯ মরদেহ উদ্ধার; দেড় হাজার নিখোঁজ, নতুন করে বড় বন্যার শঙ্কা—১ সেপ্টেম্বর ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

১১ বছর পর নেপালে ভয়াবহ দুর্যোগ, ৩৮৯ মরদেহ উদ্ধার; দেড় হাজার নিখোঁজ, নতুন করে বড় বন্যার শঙ্কা—১ সেপ্টেম্বর ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

বিশেষ প্রতিবেদন : সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই। আকাশ পরিষ্কার, ঝলমলে রোদ। আগের রাতে বৃষ্টিরও দেখা মেলেনি। নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার নদীতীরবর্তী মানুষ তাই স্বাভাবিকভাবেই বেরিয়েছিলেন নিজেদের কাজে। কেউ বাজারে, কেউ কর্মস্থলে, কেউবা সীমান্তপথে। কাঠমান্ডু থেকে তিব্বতের লাসাগামী সড়কেও চলছিল পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত।

কেউ ভাবতেও পারেননি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যাবে সবকিছু।

সকাল গড়াতেই তিব্বতের দিক থেকে হঠাৎ নেমে আসে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির ভয়ংকর স্রোত। মুহূর্তের মধ্যে তছনছ হয়ে যায় চেনা জনপদ। ভেসে যায় ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিদ্যুৎ প্রকল্প। নদীর স্রোত হয়ে ওঠে যেন ধ্বংসের এক অপ্রতিরোধ্য বাহন।

বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপালে ৩৮৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ প্রায় দেড় হাজার মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৭০০ জন বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতের নাগরিক বলে জানা গেছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ৭৯৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে নিয়োজিত রয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী।

বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ উদ্ধার অভিযানে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করলেও নেপাল জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে।

বিপদ কাটেনি, বরং সামনে নতুন শঙ্কা

প্রথম ধাক্কা সামলানোর আগেই নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তিব্বতের একটি এলাকায় প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে দ্রুত পানি জমছে। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গিরং এলাকার উজানে তৈরি হওয়া ওই হ্রদে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছে। আগামী তিন দিনে সেখানে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে।

প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে গেলে আবারও বড় ধরনের বন্যা হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, পানির প্রবাহ ১ সেপ্টেম্বরের দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

ফলে উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি নতুন করে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

১০ ঘণ্টায় কয়েক নদী পেরিয়ে ধেয়ে আসে ঢল
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের সেন্টার অব হাইড্রোলজি অ্যান্ড ওয়াটার রিসোর্সেস রিসার্চের ফ্লাড ফোরকাস্টিং ডিভিশনের কারিগরি প্রতিবেদনে ভয়াবহ এই ঢলের গতিপথের একটি প্রাথমিক চিত্র পাওয়া গেছে।

সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি কম্পন রেকর্ড হয়। এর ২৮ মিনিট পর, সকাল ৯টা ৫ মিনিটে কর্তৃপক্ষ জানতে পারে—তিব্বতের দিক থেকে প্রবল ঢল ভোতেকোশি নদীতে ঢুকে পড়েছে।

এরপর ভোতেকোশি থেকে ত্রিশূলী নদী হয়ে ঢল দ্রুত ভাটির দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

সকাল ৯টা ১৫ থেকে ৯টা ১৬ মিনিটের মধ্যে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ান জেলার নদীতীরবর্তী মানুষকে সতর্ক করে ছয় লাখের বেশি এসএমএস পাঠানো হয়।

কিন্তু সময় ছিল অল্প।

বেলা ১১টা ২৬ মিনিটে মালেখুর ফুরকে পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে। মাত্র ১৭ মিনিট পর, ১১টা ৪৩ মিনিটে বন্যার পানিতে ফুরকে সেতু ও আশপাশের স্থাপনা ভেসে যায়।

দুপুরের দিকে ঢল মুগলিন এলাকা অতিক্রম করে। পরে দেবঘাট পর্যন্ত ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে ঢল নারায়ণী-দেবঘাট এলাকায় পৌঁছে যায়। বিকেল ৪টায় দেবঘাটে পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৫৭ মিটারে ওঠে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পানি কমতে শুরু করে।

প্রাথমিক হিসাবে, বন্যার সঙ্গে প্রায় দুই কোটি ঘনমিটার অতিরিক্ত পানি নেমে আসে। তিব্বতের দিক থেকে ভোতেকোশিতে প্রবেশের পর প্রায় ১০ ঘণ্টায় সেই ঢল ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী পেরিয়ে দেবঘাটে পৌঁছে যায়।

ধস থেকেই কি তৈরি হয়েছিল ভয়াবহ বন্যা?

দুর্যোগের কারণ নিয়ে এখনো বিশ্লেষণ চলছে। তবে স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢাল থেকে বিপুল বরফ ও পাথর ধসে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে।

৭ হাজার ২৪৫ মিটার উচ্চতার এই পর্বত থেকে নেমে আসা ধ্বংসাবশেষ লহেন্দেখোলা নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। এতে তৈরি হয় প্রাকৃতিক বাঁধ। বর্ষার পানিতে বাঁধের পেছনে পানি জমে সাময়িক হ্রদ সৃষ্টি হয়। পরে সেই বাঁধ ভেঙে বিপুল পানি, বরফ, পাথর ও কাদার স্রোত ভোতেকোশির দিকে ধেয়ে যায়।

নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটিও বরফ ও পাথরের ধসকে বন্যার প্রধান সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছে।

সেকেন্ডে ৫০ মিটার বেগে ধেয়ে আসে স্রোত

চীনের সরকারি ভূতত্ত্ববিদ গুও ঝাওচেংয়ের মতে, উঁচু পার্বত্য এলাকায় বরফধস থেকে ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ তৈরি হয়। পথে পাথর ও কাদা যুক্ত হয়ে সেটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

এই স্রোতের গতি ছিল প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫০ মিটার। চীনের অংশে তা ২০ কিলোমিটারের বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

এত দ্রুত বিপর্যয় নেমে আসায় বহু মানুষ নিজেদের রক্ষারও সুযোগ পাননি।

নেপাল রেডক্রস জানিয়েছে, কয়েকটি গ্রাম পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বহু এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ছায়া?

বন্যার তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে সরাসরি দায়ী করার বিষয়ে বিজ্ঞানীরা সতর্ক। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পার্বত্য এলাকায় বরফ ও পাথর অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন তাঁরা।

তাপমাত্রা বাড়লে বরফ গলার পরিমাণ বাড়ে। একই সঙ্গে পরিবর্তিত হয় তুষারপাত ও বৃষ্টির ধরন। এতে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে বড় ধরনের ধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

জাতিসংঘের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে নেপালের তুষারাবৃত পাহাড়ের মোট বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গলে গেছে। আগের দশকের তুলনায় সর্বশেষ দশকে দেশটির হিমবাহ গলার হার বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ।

হাসপাতালের সামনে অপেক্ষা, নদীর তীরে স্বজনদের খোঁজ

দুর্যোগের পর নেপালে চলছে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান। নদীতীর ও ভাটির বিভিন্ন এলাকায় নিখোঁজদের সন্ধান করছেন পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টারে করে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে খাবার, তাঁবু ও জরুরি সামগ্রী।

কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলোতে চলছে আরেক ধরনের অপেক্ষা। নিখোঁজ স্বজনের ছবি হাতে মানুষ ঘুরছেন এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে।

ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে পুলিশ ডেস্কে টানানো হয়েছে নিখোঁজদের নাম ও ছবি। কোনো অ্যাম্বুলেন্স এলেই উৎকণ্ঠিত স্বজনেরা ছুটে যাচ্ছেন—হয়তো ভেতরে আছেন তাঁদের হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জন।

৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বারালের গল্প যেন এই দুর্যোগের মানবিক বেদনার প্রতিচ্ছবি। কাদার বিশাল ঢল ঘরে ঢুকে পড়ার পর স্ত্রীকে নিয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু প্রবল স্রোত তাঁর হাত থেকে স্ত্রীকে ছিনিয়ে নেয়।

এখনও তিনি অপেক্ষা করছেন। কাদার নিচে কোথাও হয়তো তাঁর স্ত্রী আছেন—এই আশায় তাঁকে খুঁজে চলেছেন।

২০১৫-এর পর আবারও বড় পরীক্ষা

২০১৫ সালের এপ্রিলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে নেপালে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনো দেশটির মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।

১১ বছর পর আবারও প্রকৃতির ভয়াবহ রূপের মুখোমুখি নেপাল।

উদ্ধারকর্মীরা ছুটছেন ধ্বংসস্তূপের ভেতর, নদীর তীরে, দুর্গম পাহাড়ি পথে। কোথাও চলছে নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান, কোথাও ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ হিসাব করছেন ক্ষতির।

কিন্তু সামনে আরও এক শঙ্কা—প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে জমছে পানি।

১ সেপ্টেম্বরের দিকে সম্ভাব্য নতুন ঢলের আশঙ্কায় তাই আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার প্রহর গুনছে নেপাল।
এই মুহূর্তে দেশটির মানুষের একটাই প্রত্যাশা—আর কোনো নদী যেন মানুষের ঘর কেড়ে না নেয়, আর কোনো পরিবার যেন স্বজন হারানোর বেদনায় নিঃস্ব না হয়।

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

১১ বছর পর নেপালে ভয়াবহ দুর্যোগ, ৩৮৯ মরদেহ উদ্ধার; দেড় হাজার নিখোঁজ, নতুন করে বড় বন্যার শঙ্কা—১ সেপ্টেম্বর ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল থেকে স্বীকৃতির মঞ্চে; ২০১৩ সাল থেকে শিক্ষকতা, আনন্দঘন পাঠদান ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থা

নিজস্ব প্রতিনিধি : একটি গান, একটি রিল ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও ট্রল। ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল ভার্চুয়াল জগতে। নানা মন্তব্য আর সমালোচনার মধ্যে একসময় ভিডিওটি সরিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই বিতর্কের কয়েক মাস পরই সামনে এলো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের আরেকটি পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাকে পেছনে ফেলে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিউটি রানী পাল।

তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে চারজনকে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁদের একজন বিউটি রানী পাল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর স্বাক্ষর করা একটি স্মারকের মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষকদের নাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও সেখানে বিউটি রানী পালের নাম ছিল না।

যে রিল ঘিরে আলোচনাঃ

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ‘ডিফরেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় একটি গানের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি রানী পাল। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’—গানের এই অংশ ব্যবহারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটির সঙ্গে নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে তা প্রচার করা হলে তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও ট্রল। সাইবার বুলিংয়ের মুখে একপর্যায়ে ভিডিওটি সরিয়ে নেন তিনি।

তবে ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল একজন শিক্ষককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকার শত শত নারী শিক্ষক একই গানের সঙ্গে নিজেদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। শিক্ষক সমাজের এমন অভিনব প্রতিবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সংহতি প্রকাশ করেন।

ফলে একটি ব্যক্তিগত রিল ভিডিওকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনা পরিণত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী শিক্ষকদের প্রতি আচরণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অনলাইন হয়রানি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায়।

বিতর্কের বাইরে অন্য এক পরিচয়ঃ

তবে বিউটি রানী পালের শিক্ষকতা জীবনের গল্প শুরু হয়নি ওই রিল ভিডিও দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত তিনি। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সৃজনশীল নানা কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন তিনি। আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শরীরচর্চা এবং নাচের ছন্দে পড়াশোনাকে সহজ করে তোলার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এসব উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এর আগেও তিনি একবার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো জেলা পর্যায়ের এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বনাম শ্রেণিকক্ষঃ

বিউটি রানী পালের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। অনলাইনে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও যেমন দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তেমনি সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মন্তব্য বা প্রচারণাও মুহূর্তে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে একজন শিক্ষকের প্রকৃত কাজের পরিধি অনেক দীর্ঘ। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, তাদের আগ্রহ তৈরি করা, শেখার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার মূল্যায়ন একটি রিল ভিডিওর কয়েক মিনিটের দৃশ্য দিয়ে করা সম্ভব নয়।

বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা তাঁকে আলোচনায় এনেছিল। কিন্তু জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের কাজ ও অবদানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্বীকৃতি কি বদলে দেয় আলোচনার ভাষা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ দ্রুত মতামত দেয়। সেখানে প্রেক্ষাপট, দীর্ঘমেয়াদি কাজ কিংবা একজন ব্যক্তির সামগ্রিক পরিচয় অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। বিউটি রানী পালের ঘটনাতেও প্রথমে সামনে এসেছিল একটি রিল ভিডিও। পরে সামনে এসেছে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পাঠদানের বিষয়টি।

জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার তথ্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই ব্যক্তিকে ঘিরে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর পেশাগত কাজের স্বীকৃতিও রয়েছে—দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে।

শিক্ষকের পরিচয় শ্রেণিকক্ষেইঃ

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর শ্রেণিকক্ষের কাজ—শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বাইরে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের এই দিকটিই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার।

একটি রিল তাঁকে পরিচিত করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; আর শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ তাঁকে এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিউটি রানী পালের গল্পটি যেন মনে করিয়ে দেয়—ভার্চুয়াল জগতের কয়েক মুহূর্তের আলোচনার চেয়ে একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের কাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

১১ বছর পর নেপালে ভয়াবহ দুর্যোগ, ৩৮৯ মরদেহ উদ্ধার; দেড় হাজার নিখোঁজ, নতুন করে বড় বন্যার শঙ্কা—১ সেপ্টেম্বর ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ অনুদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা এবং অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এ অনুদান দেওয়া হবে।

এবার অনলাইনের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির মাধ্যমে সুপারিশকৃত আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে পৌঁছাতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিচালন বাজেটের আওতায় বিশেষ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থ বিতরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাইগভ প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত, দুর্গম, উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকার অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যে খাতে দেওয়া হবে অনুদান:

বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মেরামত ও সংস্কার, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা, প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা এবং পাঠাগার উন্নয়নে বিশেষ অনুদান দেওয়া হবে।

এ ছাড়া বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনাজনিত কারণে আর্থিক সহায়তার জন্যও আবেদন করা যাবে।

অগ্রাধিকার পাবেন যেসব শিক্ষার্থীঃ

সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনায় আক্রান্ত, দুস্থ, মেধাবী, এতিম, অদম্য মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অসহায় ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন।

দেশের উপকূলীয়, চরাঞ্চল, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদেরও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যেভাবে করতে হবে আবেদনঃ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। আর স্নাতক বা সমমান এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে জমা দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রার আবেদনগুলো গ্রহণ করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে একত্র করবেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।

অনলাইন ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাতে দ্বৈতভাবে সুপারিশ না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ জন্য জেলা কমিটি আগে অনলাইনে সুপারিশ করা তালিকার সঙ্গে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাওয়া আবেদনসমূহ সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে।

নির্ধারিত আবেদন ফরম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট www.shed.gov.bd-এ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

সময়সীমা ১৫ অক্টোবরঃ

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাওয়া আবেদন জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবে। সুপারিশকৃত তালিকা আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর পৌঁছাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া কোনো আবেদন বিবেচনা করা হবে না।

শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা যেন কেবল শহর কিংবা সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে সরকারি সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

১১ বছর পর নেপালে ভয়াবহ দুর্যোগ, ৩৮৯ মরদেহ উদ্ধার; দেড় হাজার নিখোঁজ, নতুন করে বড় বন্যার শঙ্কা—১ সেপ্টেম্বর ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

—— মানিক লাল ঘোষ ——
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে কজন বিপ্লবীর নাম সাহস, আত্মত্যাগ ও দুর্জয় প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নারী ছিলেন না; ছিলেন এমন এক সময়ের অদম্য কণ্ঠ, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নারীর জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ ছিল নানা বাধায় পরিপূর্ণ। মাত্র ২১ বছরের জীবনে প্রীতিলতা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয়।
২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর শহীদ হওয়ার দিন। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে—যিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভায় চাকরি করতেন এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন গৃহিণী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও মননশীল।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই অসাধারণ সাফল্য প্রমাণ করে, প্রীতিলতা কেবল সাহসী বিপ্লবীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গভীর মননশীল ও মেধাবী নারীও।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। নন্দনকানন অপরনাচরণ স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন এবং পরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বও পালন করেন। একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশাজীবন তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দেশের পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং বৈষম্যের বাস্তবতা তাঁকে অন্য এক পথে টেনে নেয়।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রীতিলতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় পড়াশোনার সময় তিনি দীপালি সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন—যে সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের শারীরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান সংগঠক মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ তখন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু প্রীতিলতা ধীরে ধীরে সংগঠনের আস্থা অর্জন করেন। গোপন যোগাযোগ, বিপ্লবীদের সহায়তা, সংবাদ ও প্রচারপত্র পৌঁছে দেওয়া, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তিনি অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন সহযোগী নন, গুরুত্বপূর্ণ একজন সংগঠক ও নেতৃত্বদানের যোগ্য বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩২ সালে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলন তখন চট্টগ্রামে তীব্রতর। এরই মধ্যে পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থায় ক্লাবটি ছিল ইউরোপীয়দের সামাজিক আধিপত্য ও বর্ণবৈষম্যের একটি প্রতীক। ক্লাবটির প্রবেশপথে থাকা ‘Dogs and Indians not allowed’ ধরনের বর্ণবাদী বার্তা ভারতীয়দের প্রতি ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার নির্মম প্রকাশ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এই ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতার ওপর অর্পিত হয়। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে, যা ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহর পর্যন্ত গড়ায়, তিনি বিপ্লবীদের একটি দল নিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করেন। পুরুষের ছদ্মবেশে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবীরা ক্লাবে হামলা চালায় এবং ভবনের অংশবিশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন এবং একপর্যায়ে তিনি বিচ্ছিন্ন ও ঘেরাও হয়ে পড়েন।
প্রীতিলতা জানতেন, ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে। বিপ্লবীদের মধ্যে বন্দিত্ব এড়ানোর জন্য সায়ানাইড বহনের পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তী ময়নাতদন্তে জানা যায়, গুলির আঘাতটি প্রাণঘাতী ছিল না; সায়ানাইড বিষক্রিয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।
প্রীতিলতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি জীবন থেমে গেলেও তাঁর আদর্শ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস থেমে যায়নি। তিনি হয়ে উঠলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক। সমকালীন ও পরবর্তী ইতিহাসচর্চায় তাঁকে বাংলার প্রথম নারী শহীদদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
প্রীতিলতার জীবনকে শুধু তাঁর মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে বিচার করলে তাঁর সংগ্রামের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। একজন মেধাবী ছাত্রী থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে বিপ্লবী সংগঠক এবং শেষ পর্যন্ত একটি সশস্ত্র অভিযানের নেত্রী—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাই তাঁর জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য।
আজকের দিনে প্রীতিলতাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই মূল্যবোধগুলো একজন মানুষকে ইতিহাসের অংশ করে তুলতে পারে। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর তাঁর স্মৃতি অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন অগ্নিঝরা এক জীবন, যার দীপ্তি মাত্র ২১ বছরের আয়ুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে।
শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)