শিক্ষকের চেয়ার বসে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব কাম্য নয়; একজন আদর্শ শিক্ষক পারেন আদর্শ স্কুল গড়তে

শিক্ষকের চেয়ার বসে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব  কাম্য নয়; একজন আদর্শ শিক্ষক পারেন আদর্শ স্কুল গড়তে

শিক্ষকের চেয়ার বসে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব কাম্য নয়; একজন আদর্শ শিক্ষক পারেন আদর্শ স্কুল গড়তে

মোঃ হাসানুর জামান বাবুঃশিক্ষা, শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শব্দগুলোর সম্পর্ক নিবিড়। একটি ছাড়া আরেকটি অচল। শিক্ষকের অর্বতমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলে না। আবার উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশহীন স্কুলে ভালো শিক্ষক তার মেধা ও মননের বিকাশ ঘটাতে পারে না।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছে পরিবর্তন, লেগেছে যুগের হাওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই আধুনিক শিক্ষা আর পরিবর্তনটা কি শুধু অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর ব্যবসায়িক মনোভাবকেই বাড়িয়েছে? বাড়ায়নি কি মানসম্মত আর আদর্শ শিক্ষার হার? উত্তরটা হবে বেড়েছে দুটোই। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে সুনাম অর্জন করে, তেমনি শিক্ষকতার মহান পেশায় যারা জড়িত থাকেন তাদের আমাদের সমাজের সব পর্যায়ের লোক সম্মান করেন। আমাদের এ সমাজ, সেসব মহান পেশার ব্যক্তিকে শিক্ষক হিসাবে, ওস্তাদ নামে সম্বোধন করেন থাকে।আবার উনারা যখন শিক্ষকতার এই মহান পেশার একটি চেয়ার বসে একটি নিদিষ্ট রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পরিচালনা করেন,ক্লাসে বিষয় ভিত্তিক শ্রেণী কার্যক্রমের বাহিরে নিজ দলের নীতি আদর্শ গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করেন,তখন ঐ শিক্ষকের প্রতি আস্তে আস্তে এলাকার মানুষের সার্বজনীন সম্মান শ্রদ্ধা ভালোবাসা ওস্তাদ বলে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের সম্মান উল্টো ঘৃণা ধিক্কার সমালোচনায় পরিনত হয়ে উঠে। কারণ রাজনীতি নিজের ব্যক্তিগত বিষয় এবং গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতি করা নাগরিক অধিকার।
কিন্তু প্রশ্ন হলো আমাদের সন্তানদের আমরা বুকভরা ভরসা নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাই ওস্তাদের হাতে বহুমুখী প্রতিভাবান হয়ে একজন দেশের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এবং স্কুলের শিক্ষকের ও অভিভাবকে এর মুখ উজ্জ্বল করতে; আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের কাজ থেকে রাজনৈতিক দলের দীক্ষা নেওয়ার জন্য এতো টাকা পয়সা খরচ করে বেতন ভাতা ফি দিয়ে স্কুলে ভর্তি করাই না।এখন ভর্তির পর যখন দেখি আমাদের সকলের সম্মানে পাত্র ওস্তাদ যখন পাঠ্যবইয়ের মৌলিক বিষয় বাদ উনার নিজের রাজনীতির দলের নীতি আদর্শ গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করেন, তখন স্বাভাবিক ভাবেই শিক্ষকের প্রতি ঘৃণা অশ্রদ্ধা অশ্লীল বাক্য ছুঁড়ে দিতে আমরা অভিভাবকরা এক মিনিট চিন্তা করিনা। কারণ জাতির মেরুদণ্ড একজন শিক্ষক যখন নিজের নীতি আদর্শ সম্মান শ্রদ্ধা ভালোবাসা ওস্তাদ হিসেবে নীতি নৈতিকতা বুঝতে সক্ষম নয়,এবং নিজের পেশার মর্যাদা নিজেই বুঝতে পারেন না। তাহলে আমরা উনাকে আর এতো সম্মান শ্রদ্ধা ভালোবাসা দিয়ে ওস্তাদ বানিয়ে মাথায় তুলে রেখে কি লাভ⁉️
কথা গুলো এইজন্যই বলতে বাধ্য হলাম এই জন্য যে আমাদের চট্টগ্রাম পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কিছু সম্মানিত শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধান শ্রেনী কক্ষে ক্লাস টাইমে ছাত্রদের একটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের দীক্ষা দিচ্ছেন! সম্প্রতি এমন কিছু ছবি ভিডিও দেখে আমি রীতিমতো অবাক হয়ে গেলাম!! যেখানে সরকারি বেতনভুক্ত জনগণের টেক্স এর টাকায় বেতন ভাতা নেওয়া কোন কর্মকর্তা শিক্ষক শিক্ষিকা কর্মচারী কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে অংশ গ্রহণ প্রচার প্রচরণা চালানো সুস্পষ্ট চাকুরীবিধি লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
ঠিক সেই সময় সেই পরিস্থিতিতে কিভাবে আমাদের এলাকায় খোদ ক্লাস রুমে ক্লাস চলাকালীন সময়ে সরাসরি রাজনৈতিক দলের দীক্ষা দেওয়া ও কার্যক্রম পরিচালনা করার মতো সাহস কিভাবে করেন উনারা ⁉️ উনারা কি তাহলে বর্তমান সরকারের সকল নিয়ম নীতি আদর্শের বাহিরে? উনারা কি তাহলে সরকারকে এবং সরকারি বেসরকারি চাকুরী বিধি মানের না⁉️যদি সত্যি তাই হয়ে থাকে তাহলে আসলেই উনাদের খুঁটির জোর কোথায়? আজকে আর বেশি লিখবো না যেহেতু অনেক ডকুমেন্টস ইতিমধ্যে আমার হাতে এসেছে পরবর্তীতে একদিন বিস্তারিত তথ্য প্রমাণ সহ লিখবো।
তবে দুঃখ জনক হলেও সত্য এইসব শিক্ষকদের মধ্যে থেকে একজন প্রধান শিক্ষক ও একজন সিনিয়র শিক্ষককে চট্টগ্রাম-১২ পটিয়া নির্বাচনী এলাকার মাননীয় সংসদ সদস্য জননেতা আলহাজ্ব এনামুল হক এনাম সাহেব ইতিমধ্যে পরোক্ষভাবে দুইবার সতর্ক করেছেন এবং পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয় ও পরিচালনা কমিটির সভাপতির মাধ্যমে উনাদের সতর্ক করেছেন। কিছু উনাদের হাত এতোটাই লম্বা যে, কথাবার্তায় মনে হয় উনারা প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও শক্তিশালী।যাই হোক আজকে এই দিকে আর যাবোনা।

আমাদের ব্যাক্তি-রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শিক্ষার গুরুত্ব অনেক। ধর্মীয়ভাবেও রয়েছে শিক্ষার অপরিসীম গুরুত্ব । সেই গুরুত্বকে বাড়িয়ে দিতে প্রয়োজন ভালো এবং মেধাসম্পন্ন শিক্ষক। আর আদর্শ শিক্ষকের ক্ষেত্র তৈরিতে দরকার ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এখানে শিক্ষা ও শিক্ষক শব্দ দুটি একটি অপরটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হলে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। মূল কথা হচ্ছে, শিক্ষাই আলো, শিক্ষাই জাতির মেরুদ-, শিক্ষা ছাড়া সব মত-পথ অন্ধকার। একটি কথা উল্লেখযোগ্য যে, প্রকৃত এবং আদর্শ শিক্ষাগ্রহণ করতে হলে আদর্শবান, ভালো শিক্ষক ছাড়া তা অসম্ভব।

শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। শিক্ষকতার উদ্দেশ্য জ্ঞানের বিকাশ ঘটানো, মনুষ্যত্বকে ফুটিয়ে তোলা, একজন শিক্ষার্থীকে সঠিক পাঠদানের মাধ্যমে তাকে আদর্শবান করে গড়ে তোলা। একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্য বইয়ের নয়, এর বাইরেও বিভিন্ন বিষয়ে যেমনÑনৈতিক শিক্ষা, চেতনা, দেশপ্রেম, মা-বাবা ও পরিবার ও সামাজিকতা শিক্ষাসহ অনেক বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। একজন শিক্ষক হচ্ছেন জাতি গঠন করার কারিগর। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর জন্য হবেন মডেল। শিক্ষকতা পেশাকে কেবলমাত্র চাকরি বা অর্থ উপাজর্নের মাধ্যম নয়, মহান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করবেন এবং তা আন্তরিকতার সঙ্গে অনেকটা নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দেবেন তার মেধা-মননে। শিক্ষাদানের কৌশল হিসেবে একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখবেন, যাতে তার মেধার সব পর্যায় বিকাশ হয়। একজন সঠিক লক্ষ্যধারী স্বপ্নবাজ শিক্ষক নিজে স্বপ্ন দেখবেন সঙ্গে তার শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখাবেন। সত্যি বলতে একজন আদর্শ ও ভালো শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীর সার্বক্ষণিক অভিভাবক। তিনি আদেশ, উপদেশ, শাসন আর বন্ধুত্ব সুলভ আচরণে চমৎকার সম্পর্ককে শানিত করবেন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। আর এভাবেই শিক্ষার্থীর মঙ্গলের সঙ্গেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে আদর্শ, শিক্ষক হবেন উত্তম আদর্শবান। একজন অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকের এটাই চাওয়া।

‘কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের সহজ-সরল ভাষায় সুন্দর বাচনভঙ্গি ও উপস্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া উচিত। ভালো শিক্ষকের নির্দিষ্ট কয়েকটি গুণ রয়েছে, যেমনÑ১. শিক্ষাদানে সবসময় প্রস্তুত থাকেন, ২. সবসময় পড়াশোনার মধ্যে থাকেন, ৩. সব ধরনের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে চলেন, ৪. ছাত্রছাত্রীদের সত্য ও আদর্শের পথে চালিত করেন, ৫. ছাত্রছাত্রীদের ভালো কাজে উৎসাহ দিয়ে থাকেন, ৬. ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আন্তরিক বন্ধন তৈরি করেন, ৭. আনন্দের সঙ্গে পড়ান।’ (সংগৃহীত)

যখন একজন শিক্ষক এসব আদর্শকে অর্থের কাছে বিকিয়ে দিয়ে শিক্ষাকে বাণিজ্যিক চিন্তার ভেতর ঢুকিয়ে দেন তখন শিক্ষা আর আদর্শকে ধরে রাখতে পারে না। শিক্ষক হয়ে পড়েন লোভী, শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তখন সে নামধারী ভালো-আদর্শ থেকে মেধা-মননের বিকাশ আশা করা বোকামি। তারপরও আমাদের সমাজে সেই শিক্ষা ব্যবস্থাতেই আমাদের অভিভাবক অন্ধমোহে ছুটছেন সন্তানকে নিয়ে নোংরা প্রতিযোগিতায়, যেখানে ভবিষ্যৎ আলোর বদলে আঁধারকেই উসকে দিচ্ছে কতিপয় স্বার্থান্বেষীর অসৎ উদ্দেশ্যে। যা কখনো কাম্য নয়। আমরা নিজেদের অবস্থান থেকে শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে এই শিক্ষা বাণিজ্য থেকে বেরিয়ে আসি এবং সবাই মেধার মূল্যায়ন, আদর্শ ও নৈতিকতার চর্চা অব্যাহত রাখি।

একজন আদর্শ শিক্ষক তিনিই, শিক্ষাকে যিনি পূর্ণতা দেন, যিনি ভালো শিক্ষা দেন। সে কারণে যিনি শিক্ষকতার মতো মহৎ পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেন তিনি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। শিক্ষাদান একটি মহৎ শিল্প। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকই এই শিল্পের মাধ্যম ও কারিগর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় গুণসম্পন্ন একজন শিক্ষক দেশ ও সমাজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তেমনি সব বিষয়ে শিক্ষাবান্ধব স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদ। আর এসব সম্পদকে টিকিয়ে রাখতে শিক্ষকদের চাহিদা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে উন্নত ও মানসম্মত করতে সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়ন জরুরি। পরিশেষে বলা যায়, একজন আদর্শ-ভালো শিক্ষক কেবল শিক্ষার্থীকেই নয় একটি স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।

লেখক:- মিডিয়া কর্মী ক্রীড়া সংগঠক ও সাবেক একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্য।

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

শিক্ষকের চেয়ার বসে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব  কাম্য নয়; একজন আদর্শ শিক্ষক পারেন আদর্শ স্কুল গড়তে

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল থেকে স্বীকৃতির মঞ্চে; ২০১৩ সাল থেকে শিক্ষকতা, আনন্দঘন পাঠদান ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থা

নিজস্ব প্রতিনিধি : একটি গান, একটি রিল ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও ট্রল। ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল ভার্চুয়াল জগতে। নানা মন্তব্য আর সমালোচনার মধ্যে একসময় ভিডিওটি সরিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই বিতর্কের কয়েক মাস পরই সামনে এলো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের আরেকটি পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাকে পেছনে ফেলে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিউটি রানী পাল।

তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে চারজনকে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁদের একজন বিউটি রানী পাল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর স্বাক্ষর করা একটি স্মারকের মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষকদের নাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও সেখানে বিউটি রানী পালের নাম ছিল না।

যে রিল ঘিরে আলোচনাঃ

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ‘ডিফরেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় একটি গানের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি রানী পাল। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’—গানের এই অংশ ব্যবহারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটির সঙ্গে নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে তা প্রচার করা হলে তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও ট্রল। সাইবার বুলিংয়ের মুখে একপর্যায়ে ভিডিওটি সরিয়ে নেন তিনি।

তবে ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল একজন শিক্ষককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকার শত শত নারী শিক্ষক একই গানের সঙ্গে নিজেদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। শিক্ষক সমাজের এমন অভিনব প্রতিবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সংহতি প্রকাশ করেন।

ফলে একটি ব্যক্তিগত রিল ভিডিওকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনা পরিণত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী শিক্ষকদের প্রতি আচরণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অনলাইন হয়রানি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায়।

বিতর্কের বাইরে অন্য এক পরিচয়ঃ

তবে বিউটি রানী পালের শিক্ষকতা জীবনের গল্প শুরু হয়নি ওই রিল ভিডিও দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত তিনি। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সৃজনশীল নানা কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন তিনি। আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শরীরচর্চা এবং নাচের ছন্দে পড়াশোনাকে সহজ করে তোলার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এসব উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এর আগেও তিনি একবার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো জেলা পর্যায়ের এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বনাম শ্রেণিকক্ষঃ

বিউটি রানী পালের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। অনলাইনে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও যেমন দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তেমনি সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মন্তব্য বা প্রচারণাও মুহূর্তে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে একজন শিক্ষকের প্রকৃত কাজের পরিধি অনেক দীর্ঘ। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, তাদের আগ্রহ তৈরি করা, শেখার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার মূল্যায়ন একটি রিল ভিডিওর কয়েক মিনিটের দৃশ্য দিয়ে করা সম্ভব নয়।

বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা তাঁকে আলোচনায় এনেছিল। কিন্তু জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের কাজ ও অবদানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্বীকৃতি কি বদলে দেয় আলোচনার ভাষা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ দ্রুত মতামত দেয়। সেখানে প্রেক্ষাপট, দীর্ঘমেয়াদি কাজ কিংবা একজন ব্যক্তির সামগ্রিক পরিচয় অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। বিউটি রানী পালের ঘটনাতেও প্রথমে সামনে এসেছিল একটি রিল ভিডিও। পরে সামনে এসেছে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পাঠদানের বিষয়টি।

জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার তথ্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই ব্যক্তিকে ঘিরে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর পেশাগত কাজের স্বীকৃতিও রয়েছে—দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে।

শিক্ষকের পরিচয় শ্রেণিকক্ষেইঃ

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর শ্রেণিকক্ষের কাজ—শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বাইরে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের এই দিকটিই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার।

একটি রিল তাঁকে পরিচিত করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; আর শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ তাঁকে এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিউটি রানী পালের গল্পটি যেন মনে করিয়ে দেয়—ভার্চুয়াল জগতের কয়েক মুহূর্তের আলোচনার চেয়ে একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের কাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

শিক্ষকের চেয়ার বসে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব  কাম্য নয়; একজন আদর্শ শিক্ষক পারেন আদর্শ স্কুল গড়তে

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ অনুদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা এবং অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এ অনুদান দেওয়া হবে।

এবার অনলাইনের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির মাধ্যমে সুপারিশকৃত আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে পৌঁছাতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিচালন বাজেটের আওতায় বিশেষ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থ বিতরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাইগভ প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত, দুর্গম, উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকার অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যে খাতে দেওয়া হবে অনুদান:

বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মেরামত ও সংস্কার, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা, প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা এবং পাঠাগার উন্নয়নে বিশেষ অনুদান দেওয়া হবে।

এ ছাড়া বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনাজনিত কারণে আর্থিক সহায়তার জন্যও আবেদন করা যাবে।

অগ্রাধিকার পাবেন যেসব শিক্ষার্থীঃ

সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনায় আক্রান্ত, দুস্থ, মেধাবী, এতিম, অদম্য মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অসহায় ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন।

দেশের উপকূলীয়, চরাঞ্চল, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদেরও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যেভাবে করতে হবে আবেদনঃ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। আর স্নাতক বা সমমান এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে জমা দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রার আবেদনগুলো গ্রহণ করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে একত্র করবেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।

অনলাইন ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাতে দ্বৈতভাবে সুপারিশ না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ জন্য জেলা কমিটি আগে অনলাইনে সুপারিশ করা তালিকার সঙ্গে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাওয়া আবেদনসমূহ সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে।

নির্ধারিত আবেদন ফরম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট www.shed.gov.bd-এ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

সময়সীমা ১৫ অক্টোবরঃ

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাওয়া আবেদন জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবে। সুপারিশকৃত তালিকা আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর পৌঁছাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া কোনো আবেদন বিবেচনা করা হবে না।

শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা যেন কেবল শহর কিংবা সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে সরকারি সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

শিক্ষকের চেয়ার বসে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব  কাম্য নয়; একজন আদর্শ শিক্ষক পারেন আদর্শ স্কুল গড়তে

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

—— মানিক লাল ঘোষ ——
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে কজন বিপ্লবীর নাম সাহস, আত্মত্যাগ ও দুর্জয় প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নারী ছিলেন না; ছিলেন এমন এক সময়ের অদম্য কণ্ঠ, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নারীর জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ ছিল নানা বাধায় পরিপূর্ণ। মাত্র ২১ বছরের জীবনে প্রীতিলতা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয়।
২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর শহীদ হওয়ার দিন। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে—যিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভায় চাকরি করতেন এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন গৃহিণী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও মননশীল।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই অসাধারণ সাফল্য প্রমাণ করে, প্রীতিলতা কেবল সাহসী বিপ্লবীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গভীর মননশীল ও মেধাবী নারীও।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। নন্দনকানন অপরনাচরণ স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন এবং পরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বও পালন করেন। একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশাজীবন তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দেশের পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং বৈষম্যের বাস্তবতা তাঁকে অন্য এক পথে টেনে নেয়।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রীতিলতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় পড়াশোনার সময় তিনি দীপালি সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন—যে সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের শারীরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান সংগঠক মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ তখন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু প্রীতিলতা ধীরে ধীরে সংগঠনের আস্থা অর্জন করেন। গোপন যোগাযোগ, বিপ্লবীদের সহায়তা, সংবাদ ও প্রচারপত্র পৌঁছে দেওয়া, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তিনি অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন সহযোগী নন, গুরুত্বপূর্ণ একজন সংগঠক ও নেতৃত্বদানের যোগ্য বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩২ সালে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলন তখন চট্টগ্রামে তীব্রতর। এরই মধ্যে পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থায় ক্লাবটি ছিল ইউরোপীয়দের সামাজিক আধিপত্য ও বর্ণবৈষম্যের একটি প্রতীক। ক্লাবটির প্রবেশপথে থাকা ‘Dogs and Indians not allowed’ ধরনের বর্ণবাদী বার্তা ভারতীয়দের প্রতি ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার নির্মম প্রকাশ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এই ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতার ওপর অর্পিত হয়। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে, যা ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহর পর্যন্ত গড়ায়, তিনি বিপ্লবীদের একটি দল নিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করেন। পুরুষের ছদ্মবেশে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবীরা ক্লাবে হামলা চালায় এবং ভবনের অংশবিশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন এবং একপর্যায়ে তিনি বিচ্ছিন্ন ও ঘেরাও হয়ে পড়েন।
প্রীতিলতা জানতেন, ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে। বিপ্লবীদের মধ্যে বন্দিত্ব এড়ানোর জন্য সায়ানাইড বহনের পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তী ময়নাতদন্তে জানা যায়, গুলির আঘাতটি প্রাণঘাতী ছিল না; সায়ানাইড বিষক্রিয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।
প্রীতিলতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি জীবন থেমে গেলেও তাঁর আদর্শ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস থেমে যায়নি। তিনি হয়ে উঠলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক। সমকালীন ও পরবর্তী ইতিহাসচর্চায় তাঁকে বাংলার প্রথম নারী শহীদদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
প্রীতিলতার জীবনকে শুধু তাঁর মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে বিচার করলে তাঁর সংগ্রামের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। একজন মেধাবী ছাত্রী থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে বিপ্লবী সংগঠক এবং শেষ পর্যন্ত একটি সশস্ত্র অভিযানের নেত্রী—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাই তাঁর জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য।
আজকের দিনে প্রীতিলতাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই মূল্যবোধগুলো একজন মানুষকে ইতিহাসের অংশ করে তুলতে পারে। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর তাঁর স্মৃতি অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন অগ্নিঝরা এক জীবন, যার দীপ্তি মাত্র ২১ বছরের আয়ুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে।
শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)