শাহরাস্তিতে প্রথমবার জরুরি বিভাগেই সাপে-কাটা রোগীকে অ্যান্টিভেনম; ৮ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা তরুণীর চিকিৎসায় চিকিৎসক, নার্স ও SACMOদের সমন্বিত উদ্যোগ
শাহরাস্তিতে প্রথমবার জরুরি বিভাগেই সাপে-কাটা রোগীকে অ্যান্টিভেনম; ৮ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা তরুণীর চিকিৎসায় চিকিৎসক, নার্স ও SACMOদের সমন্বিত উদ্যোগ
বিশেষ প্রতিনিধি, শাহরাস্তি (চাঁদপুর) থেকে : চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথমবারের মতো সাপের কামড়ে আক্রান্ত এক রোগীকে জরুরি বিভাগেই অ্যান্টি-স্নেক ভেনম (ASV) দেওয়া হয়েছে। সাপের বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে রাতেই অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ শুরু করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। চিকিৎসক, নার্স ও SACMOদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় প্রাথমিক চিকিৎসার পর রোগীর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। পরে উন্নত চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য তাঁকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
রোগী আসমা আক্তার (২৩) শাহরাস্তি উপজেলার মনিপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর স্বামী আল-আমীন। গতকাল বুধবার রাত আনুমানিক আটটার দিকে নিজ বাড়িতে সাপের কামড়ের শিকার হন তিনি। পরে স্বজনেরা তাঁকে রাত প্রায় নয়টার দিকে শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। ওই সময় আসমা আক্তার প্রায় আট সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, জরুরি বিভাগে আনার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নুরুন নবী জুয়েল রোগীকে পরীক্ষা করেন। এ সময় তাঁর কামড়ের স্থান কালচে ও ফোলা অবস্থায় দেখা যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে রোগীর শরীরে সাপের বিষক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। এর মধ্যে চোখের পাতা ঝুলে পড়া বা Ptosis এবং Broken Neck Sign-এর মতো লক্ষণও দেখা যায়।
রোগীর শারীরিক অবস্থা ও বিষক্রিয়ার লক্ষণ বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসকেরা দ্রুত অ্যান্টিভেনম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। রাত আনুমানিক সাড়ে নয়টার দিকে শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগেই অ্যান্টি-স্নেক ভেনম প্রয়োগ শুরু করা হয়। চিকিৎসা পর্যায়ে রোগীকে মোট ১০ ভায়াল অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়।
চিকিৎসা দেওয়ার পর রোগীর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তাঁকে আরও উন্নত চিকিৎসা এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা জানান, সাপের কামড়ের পর বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসায় তাঁর শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে পরবর্তী চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন থাকায় তাঁকে উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হয়।
জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কার্যক্রমে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নুরুন নবী জুয়েল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি হাসপাতালের অন্যান্য চিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-পরামর্শ ও সহযোগিতা দেন। নার্সিং টিম এবং SACMOরা রোগীর চিকিৎসা, শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও জরুরি ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করেন।
শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের UHFPO ডা. মো. আবু নাছের শাকিল বলেন, “জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ঘটনায় দায়িত্ব পালনকারী সকল চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”
হাসপাতাল সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই প্রথম সাপে-কাটা রোগীকে জরুরি বিভাগেই অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়েছে। ফলে ঘটনাটি স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে রোগীটি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় পরিস্থিতিটি ছিল আরও সংবেদনশীল। এমন অবস্থায় সাপের বিষক্রিয়ার লক্ষণ শনাক্ত করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা এবং পরবর্তী উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীকে রেফার করার পুরো প্রক্রিয়ায় হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
সাপের কামড়ের ঘটনায় অনেক সময় রোগীকে হাসপাতালে নিতে বিলম্ব হয়। স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন প্রচলিত পদ্ধতিতে চিকিৎসার চেষ্টা না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা।
শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই প্রথম জরুরি বিভাগে সাপে-কাটা রোগীকে অ্যান্টিভেনম দেওয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি চিকিৎসা কার্যক্রম নয়; জরুরি মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত, চিকিৎসকদের সমন্বয় এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্বশীলতারও একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।





