শাহরাস্তিতে আগুনে পুড়ে ৩ গরুর মৃত্যু, হৃদরোগে আক্রান্ত খামারি
শাহরাস্তিতে আগুনে পুড়ে ৩ গরুর মৃত্যু, হৃদরোগে আক্রান্ত খামারি
বিশেষ প্রতিনিধি, শাহরাস্তি (চাঁদপুর) থেকে : গভীর রাতে গো-খামারে আগুন। মুহূর্তেই দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে খামার। চোখের সামনে পুড়ে মারা যায় প্রিয় তিনটি গরু। আগুনে ছাই হয়ে যায় খামারও। এই মর্মান্তিক দৃশ্য ও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির ধাক্কা সামলাতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন খামারি ইয়াকুব আলী। পরিবারের দাবি, পরে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার টামটা দক্ষিণ ইউনিয়নের আলীপুর মিজি বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতো রাতে নিজের গরুগুলোর দেখাশোনা শেষে ঘুমিয়ে পড়েন ইয়াকুব আলী। গভীর রাতে হঠাৎ তাঁর গো-খামারে আগুন জ্বলতে দেখে স্থানীয়রা চিৎকার করে বিষয়টি তাঁকে জানান। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে তিনি দেখতে পান, খামারটি আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে।
স্থানীয়রা আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত খামারে থাকা তিনটি গরুকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। আগুনে খামারটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। পরে বুধবার দুপুরে পুড়ে মারা যাওয়া গরুগুলো বাড়ির পাশে মাটিচাপা দেওয়া হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, খামার ও গরুগুলো পুড়ে যাওয়ার দৃশ্য ইয়াকুব আলীকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। দীর্ঘদিনের শ্রম, অর্থ ও স্বপ্নে গড়ে তোলা খামারটি এক রাতেই পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি চোখের সামনে গরুগুলোর মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে আগুনের ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইয়াকুব আলীর ছেলে আমান উল্লাহর অভিযোগ, পূর্বশত্রুতার জের ধরে পরিকল্পিতভাবে খামারে আগুন দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
পরিবারের জামাতা মো. খোকনও একই ধরনের সন্দেহের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, কিছুদিন আগে ওই খামার থেকে একটি গরু চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় লোকজন বিষয়টি দেখে ফেলেন। তখন চোরেরা গরুটি রেখে পালিয়ে যায়। ওই ঘটনার সঙ্গে বর্তমান অগ্নিকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
পরিবারের দাবি, খামারে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না। তাদের ধারণা, কোনো দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার।
ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। এক রাতের আগুনে তিনটি গরুর মৃত্যু এবং খামার পুড়ে যাওয়ায় পরিবারটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুন বলেন, ‘এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।’
শাহরাস্তি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। ক্ষতিগ্রস্ত মালিক অভিযোগ দিলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।’
সাবেক শাহরাস্তি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. দুলাল চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। একজন খামারি নিজের শ্রম, অর্থ ও স্বপ্ন দিয়ে একটি খামার গড়ে তোলেন। এটি শুধু তাঁর জীবিকার উৎস নয়, পরিবারের ভবিষ্যৎ ও স্বপ্নেরও অন্যতম অবলম্বন। সেই খামারে আগুন দিয়ে গবাদিপশুর মৃত্যু ঘটানো অত্যন্ত অমানবিক ও নিন্দনীয়। এমন ঘটনা কোনো সভ্য সমাজে কাম্য নয়।’
পরিবারটির এখন একটাই প্রত্যাশা—আগুনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন হোক। এটি দুর্ঘটনা হয়ে থাকলে তার কারণ জানা প্রয়োজন, আর পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ হয়ে থাকলে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক। এক রাতের আগুনে শুধু তিনটি প্রাণই পুড়ে যায়নি; পুড়ে গেছে একজন খামারির দীর্ঘদিনের শ্রম, সঞ্চয় ও স্বপ্নও।






