ইসলামই আমাদের সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি — ড. শেখ আকরাম আলী

ইসলামই আমাদের সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি — ড. শেখ আকরাম আলী

জনগণের ঐক্যকে একটি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ তাদের রাজনৈতিক যাত্রার শুরু থেকেই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে টিকে থাকার সংগ্রাম করে আসছে, কিন্তু ইতিহাসের বিগত পঞ্চান্ন বছরেও এর নিশ্চিত গ্যারান্টি দেখতে পায়নি। সাধারণত জনগণের জাতীয়তাবাদই তাদের ঐক্য জোগায় এবং সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়।

কিন্তু এখন, পাঁচ দশকের পথচলার পর অনুভূতি হচ্ছে যে, কেবল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ একা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার গ্যারান্টি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি আমাদের এমন একটি শক্তিশালী আদর্শ প্রয়োজন, যা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি বন্ধন উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে—আর সেটি হলো ইসলাম। এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক সমাজে ঐক্য ফিরিয়ে আনতে এটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। মধ্যযুগে মুসলিম শাসনের সময় ভারতও শান্তি ও ঐক্যের মাধ্যম হিসেবে ইসলামের ভূমিকা প্রত্যক্ষ করেছে।

চলুন পেছনের ইতিহাসে নজর দেওয়া যাক, যখন ইসলাম সামাজিকভাবে সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল, কিন্তু সংখ্যাগুরু অমুসলিম জনগণের ওপর কখনোই তা চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। যদিও আমাদের সমাজে ইসলামের মূল অনেক গভীরে প্রোথিত ছিল, তবুও ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর এটি কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকের মহান ইসলামী পণ্ডিত শাহ ওয়ালিউল্লাহ উল্লেখ করেছিলেন যে, সম্রাট আওরঙ্গজেবের পর ভারতে মুসলিম শাসনের পতনের কারণ ছিল ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়া। তাঁর পুত্র শাহ আব্দুল আজিজেরও ভারতে মুসলমানদের পতন সম্পর্কে একই মতামত ছিল। সৈয়দ আহমেদ বেরলভীর নেতৃত্বে পরিচালিত ওহাবী আন্দোলনও ছিল ইসলামের প্রকৃত চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য। পরবর্তীতে হাজী শরীয়তুল্লাহর ফারায়েজী আন্দোলন পূর্ববঙ্গের সমাজে ইসলামের সত্যিকারের চেতনা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছিল। তবে তাঁদের আন্দোলনের কোনটিই পুরোপুরি সফল হয়নি।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অবদানের মাধ্যমে ইসলামের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি সাফল্যের মুখ দেখে। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে স্যার সৈয়দ আমীর আলী এবং নবাব আবদুল লতিফ বাংলায় এই একই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং মুসলমানদের মধ্যে এক বিশাল জাগরণ দেখতে পান। ১৯১৩ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন মুসলিম লিগে যোগ দেন, তখন মুসলমানদের রাজনৈতিক যাত্রা নতুন প্রাণ পায়।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঐতিহাসিক ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের জন্য সকল সংজ্ঞায় একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করার দিকনির্দেশক নীতি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

ভারতের মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক জন্মভূমির দাবির বিরুদ্ধে কংগ্রেস নেতাদের তীব্র বিরোধিতা ছিল, কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ব্রিটিশ সরকারকে তাঁর ধারণা মেনে নিতে বোঝাতে সক্ষম হন এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতকে দুই ভাগে বিভক্ত করতে সম্মত হয়। এভাবে ভারতের মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান সৃষ্টি হয় এবং এটি আবারও জিন্নাহর নেতৃত্বগুণকে প্রমাণ করে।

তবে পাকিস্তানকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও ইসলামকে সঠিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সরকারের এই ব্যর্থতা ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর ভিত্তি করে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর জন্ম দেয় এবং শেখ মুজিবের নেতৃত্বে এটি পূর্ব পাকিস্তানে একটি জনপ্রিয় আন্দোলনে পরিণত হয়।

অল্প সময়ের মধ্যেই শেখ মুজিব কেবল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্ঠীর একক নেতা হিসেবেই আবির্ভূত হননি, বরং তাঁর ‘ছয় দফা’কে এক জনপ্রিয় দাবিতে পরিণত করেছিলেন। এটি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয় এনে দেয়, যা চূড়ান্তভাবে মুক্তিযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে এবং এভাবে ভারতের সমর্থনে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশের সৃষ্টি ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং নবজাত এ দেশে ইসলামকে একপাশে ঠেলে দেওয়া হয়; সেই সাথে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের ব্যর্থতা প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মনিরপেক্ষতার এই নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পছন্দ করেনি, তবে শেখ মুজিবের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সেই দিনগুলোতে ইসলামের পক্ষে জোর আওয়াজ তোলার কোনো সুযোগ ছিল না। ১৯৭৫ সালের আগস্টে শেখ মুজিবের পতনের সাথে সাথে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়।

জিয়াউর রহমান পাহাড়ি জনগোষ্ঠীসহ বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতি সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছিলেন এবং আঞ্চলিক নাগরিকত্বের ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ইসলামের চেতনাকেও যথোপযুক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং ধর্মনিরপেক্ষতার স্থানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস’ প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। তিনি ইসলামভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার সুযোগও করে দেন, যা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত করেছিল।

এরশাদ মাদ্রাসার শিক্ষকদের সরকারি বেতন প্রদান এবং দেশের মসজিদগুলোতে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সুবিধাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে সমাজে ইসলামী পরিবেশ তৈরিতে আরও অগ্রগতি আনেন। বাংলাদেশকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা ছিল তাঁর একটি ঐতিহাসিক অবদান, যা আমাদের সমাজে ইসলামের গুরুত্বের এক সুস্পষ্ট স্বীকৃতি।

বেগম খালেদা জিয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ এবং এর প্রভূ ভারতের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের উত্থানে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ এনে তাঁর ওপর দায় চাপানো হয়। তিনি তাঁর প্রথম মেয়াদে চরম রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন এবং নির্বাচনে হেরে যান। পরবর্তীতে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তাঁর দ্বিতীয় সরকার পরিচালনা করার সময়ও তিনি ভারতীয় চক্রান্তের শিকার হন।

তবে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সমর্থনে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। তিনি সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনা ফিরিয়ে আনেন এবং সংবিধান থেকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর আস্থার অংশটি বাদ দেন। প্রতিবেশী দেশের পরামর্শে সমাজ থেকে ইসলামকে একপাশে ঠেলে দেওয়ার জন্য তিনি সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

তিনি ও ভারত উভয়েই ইসলামের উত্থানকে তাদের স্বার্থের জন্য বড় হুমকি মনে করতেন, ফলে জামায়াতে ইসলামী তাদের যৌথ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তিনি দলটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে হত্যা করেন এবং এর কর্মী ও নেতাদের সরকারের প্রত্যক্ষ নির্যাতনের মুখে ফেলেন। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কর্মীদের ওপর হত্যাকাণ্ড ছিল সমাজে ইসলামী উত্থানের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করার আরেকটি চরম পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের মানুষকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ থেকে সরাতে না পারলেও, তিনি সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনেন এবং সমাজে বাঙালি সংস্কৃতির প্রসারের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনা প্রতিষ্ঠার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেন। কিন্তু কোনো কিছুই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁর ঐতিহাসিক পতনকে ঠেকাতে পারেনি, যা শেষ পর্যন্ত এক বিপ্লবের রূপ নেয়।

জুলাই বিপ্লব একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে এবং বাংলাদেশের মানুষের চিন্তাভাবনায় এক তীব্র পরিবর্তন এনেছে; তারা এখন বাংলাদেশে বৈষম্যহীন সমাজ ও বিচার দেখতে চায়। বর্তমানে আমাদের সমাজে গভীরে প্রোথিত ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশ জনগণের প্রত্যাশার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই মুহূর্তে আমাদের ইসলামী আকীদা ও মূল্যবোধ নিয়ে গুরুত্বের সাথে ভাবা প্রয়োজন, যা অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক চরিত্রে এক তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।

ইসলামী মূল্যবোধ সযত্নে প্রতিষ্ঠিত হলে তা স্বল্পতে সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সততা ও নিষ্ঠার চরিত্র গঠনে সহায়তা করবে। তারা জনগণের কাছে কিছু আশা না করে কেবল দায়িত্ববোধ থেকেই সেবা দিতে অনুপ্রাণিত হবে।

যখন তারা সমাজের কল্যাণে আত্মত্যাগ ও সততার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবে, তখন প্রয়োজনে জীবনের উৎসর্গ করতেও তারা দ্বিধা করবে না। শহীদ আবু সাঈদের একক জীবন উৎসর্গ জুলাই আন্দোলনকে ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের এক বৃহৎ লক্ষ্যভেদে রূপান্তরিত করেছিল।

বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে শহীদ ওসমান হাদীর আত্মত্যাগ জাতির ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গীকৃত হওয়ার আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আত্মত্যাগের এই উভয় ক্ষেত্রেই তারা জাতির প্রতি সাহস ও প্রতিশ্রুতির যে স্পষ্ট উদাহরণ স্থাপন করেছেন, তা তারা সম্ভবত ইসলামের চর্চা থেকেই শিখেছেন। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এগুলো বীরত্বের অনন্য উদাহরণ।

বাংলাদেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ইসলাম দেশের মূল আদর্শ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু বলেছেন, ইসলাম তাঁর দেশের সার্বভৌমত্ব ও সংস্কৃতিকে নিশ্চিত করতে পারে। বাংলাদেশের বিশিষ্ট পণ্ডিত ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হুসায়ন তাঁর লেখার মাধ্যমে মতামত প্রকাশ করেছিলেন যে, কেবল ইসলামই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে পারে।

জুলাই বিপ্লব আমাদের ইসলামকে অন্তরের সাথে ভালোবাসতেও শেখায়। বাংলাদেশের মানুষের এখন এমন একটি আদর্শের প্রয়োজন যা ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হতে জাতিকে যেকোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধ রাখতে অনুপ্রাণিত করবে। একমাত্র ইসলামই তার সঠিক চর্চার মাধ্যমে আমাদের সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি দিতে পারে।

লেখক: আইনের অধ্যাপক

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

ইসলামই আমাদের সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি — ড. শেখ আকরাম আলী

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল থেকে স্বীকৃতির মঞ্চে; ২০১৩ সাল থেকে শিক্ষকতা, আনন্দঘন পাঠদান ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থা

নিজস্ব প্রতিনিধি : একটি গান, একটি রিল ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও ট্রল। ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল ভার্চুয়াল জগতে। নানা মন্তব্য আর সমালোচনার মধ্যে একসময় ভিডিওটি সরিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই বিতর্কের কয়েক মাস পরই সামনে এলো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের আরেকটি পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাকে পেছনে ফেলে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিউটি রানী পাল।

তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে চারজনকে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁদের একজন বিউটি রানী পাল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর স্বাক্ষর করা একটি স্মারকের মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষকদের নাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও সেখানে বিউটি রানী পালের নাম ছিল না।

যে রিল ঘিরে আলোচনাঃ

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ‘ডিফরেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় একটি গানের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি রানী পাল। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’—গানের এই অংশ ব্যবহারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটির সঙ্গে নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে তা প্রচার করা হলে তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও ট্রল। সাইবার বুলিংয়ের মুখে একপর্যায়ে ভিডিওটি সরিয়ে নেন তিনি।

তবে ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল একজন শিক্ষককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকার শত শত নারী শিক্ষক একই গানের সঙ্গে নিজেদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। শিক্ষক সমাজের এমন অভিনব প্রতিবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সংহতি প্রকাশ করেন।

ফলে একটি ব্যক্তিগত রিল ভিডিওকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনা পরিণত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী শিক্ষকদের প্রতি আচরণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অনলাইন হয়রানি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায়।

বিতর্কের বাইরে অন্য এক পরিচয়ঃ

তবে বিউটি রানী পালের শিক্ষকতা জীবনের গল্প শুরু হয়নি ওই রিল ভিডিও দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত তিনি। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সৃজনশীল নানা কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন তিনি। আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শরীরচর্চা এবং নাচের ছন্দে পড়াশোনাকে সহজ করে তোলার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এসব উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এর আগেও তিনি একবার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো জেলা পর্যায়ের এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বনাম শ্রেণিকক্ষঃ

বিউটি রানী পালের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। অনলাইনে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও যেমন দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তেমনি সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মন্তব্য বা প্রচারণাও মুহূর্তে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে একজন শিক্ষকের প্রকৃত কাজের পরিধি অনেক দীর্ঘ। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, তাদের আগ্রহ তৈরি করা, শেখার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার মূল্যায়ন একটি রিল ভিডিওর কয়েক মিনিটের দৃশ্য দিয়ে করা সম্ভব নয়।

বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা তাঁকে আলোচনায় এনেছিল। কিন্তু জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের কাজ ও অবদানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্বীকৃতি কি বদলে দেয় আলোচনার ভাষা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ দ্রুত মতামত দেয়। সেখানে প্রেক্ষাপট, দীর্ঘমেয়াদি কাজ কিংবা একজন ব্যক্তির সামগ্রিক পরিচয় অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। বিউটি রানী পালের ঘটনাতেও প্রথমে সামনে এসেছিল একটি রিল ভিডিও। পরে সামনে এসেছে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পাঠদানের বিষয়টি।

জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার তথ্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই ব্যক্তিকে ঘিরে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর পেশাগত কাজের স্বীকৃতিও রয়েছে—দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে।

শিক্ষকের পরিচয় শ্রেণিকক্ষেইঃ

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর শ্রেণিকক্ষের কাজ—শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বাইরে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের এই দিকটিই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার।

একটি রিল তাঁকে পরিচিত করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; আর শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ তাঁকে এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিউটি রানী পালের গল্পটি যেন মনে করিয়ে দেয়—ভার্চুয়াল জগতের কয়েক মুহূর্তের আলোচনার চেয়ে একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের কাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

ইসলামই আমাদের সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি — ড. শেখ আকরাম আলী

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ অনুদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা এবং অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এ অনুদান দেওয়া হবে।

এবার অনলাইনের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির মাধ্যমে সুপারিশকৃত আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে পৌঁছাতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিচালন বাজেটের আওতায় বিশেষ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থ বিতরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাইগভ প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত, দুর্গম, উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকার অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যে খাতে দেওয়া হবে অনুদান:

বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মেরামত ও সংস্কার, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা, প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা এবং পাঠাগার উন্নয়নে বিশেষ অনুদান দেওয়া হবে।

এ ছাড়া বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনাজনিত কারণে আর্থিক সহায়তার জন্যও আবেদন করা যাবে।

অগ্রাধিকার পাবেন যেসব শিক্ষার্থীঃ

সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনায় আক্রান্ত, দুস্থ, মেধাবী, এতিম, অদম্য মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অসহায় ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন।

দেশের উপকূলীয়, চরাঞ্চল, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদেরও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যেভাবে করতে হবে আবেদনঃ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। আর স্নাতক বা সমমান এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে জমা দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রার আবেদনগুলো গ্রহণ করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে একত্র করবেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।

অনলাইন ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাতে দ্বৈতভাবে সুপারিশ না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ জন্য জেলা কমিটি আগে অনলাইনে সুপারিশ করা তালিকার সঙ্গে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাওয়া আবেদনসমূহ সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে।

নির্ধারিত আবেদন ফরম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট www.shed.gov.bd-এ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

সময়সীমা ১৫ অক্টোবরঃ

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাওয়া আবেদন জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবে। সুপারিশকৃত তালিকা আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর পৌঁছাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া কোনো আবেদন বিবেচনা করা হবে না।

শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা যেন কেবল শহর কিংবা সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে সরকারি সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

ইসলামই আমাদের সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি — ড. শেখ আকরাম আলী

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

—— মানিক লাল ঘোষ ——
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে কজন বিপ্লবীর নাম সাহস, আত্মত্যাগ ও দুর্জয় প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নারী ছিলেন না; ছিলেন এমন এক সময়ের অদম্য কণ্ঠ, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নারীর জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ ছিল নানা বাধায় পরিপূর্ণ। মাত্র ২১ বছরের জীবনে প্রীতিলতা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয়।
২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর শহীদ হওয়ার দিন। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে—যিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভায় চাকরি করতেন এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন গৃহিণী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও মননশীল।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই অসাধারণ সাফল্য প্রমাণ করে, প্রীতিলতা কেবল সাহসী বিপ্লবীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গভীর মননশীল ও মেধাবী নারীও।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। নন্দনকানন অপরনাচরণ স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন এবং পরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বও পালন করেন। একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশাজীবন তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দেশের পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং বৈষম্যের বাস্তবতা তাঁকে অন্য এক পথে টেনে নেয়।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রীতিলতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় পড়াশোনার সময় তিনি দীপালি সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন—যে সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের শারীরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান সংগঠক মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ তখন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু প্রীতিলতা ধীরে ধীরে সংগঠনের আস্থা অর্জন করেন। গোপন যোগাযোগ, বিপ্লবীদের সহায়তা, সংবাদ ও প্রচারপত্র পৌঁছে দেওয়া, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তিনি অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন সহযোগী নন, গুরুত্বপূর্ণ একজন সংগঠক ও নেতৃত্বদানের যোগ্য বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩২ সালে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলন তখন চট্টগ্রামে তীব্রতর। এরই মধ্যে পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থায় ক্লাবটি ছিল ইউরোপীয়দের সামাজিক আধিপত্য ও বর্ণবৈষম্যের একটি প্রতীক। ক্লাবটির প্রবেশপথে থাকা ‘Dogs and Indians not allowed’ ধরনের বর্ণবাদী বার্তা ভারতীয়দের প্রতি ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার নির্মম প্রকাশ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এই ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতার ওপর অর্পিত হয়। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে, যা ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহর পর্যন্ত গড়ায়, তিনি বিপ্লবীদের একটি দল নিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করেন। পুরুষের ছদ্মবেশে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবীরা ক্লাবে হামলা চালায় এবং ভবনের অংশবিশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন এবং একপর্যায়ে তিনি বিচ্ছিন্ন ও ঘেরাও হয়ে পড়েন।
প্রীতিলতা জানতেন, ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে। বিপ্লবীদের মধ্যে বন্দিত্ব এড়ানোর জন্য সায়ানাইড বহনের পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তী ময়নাতদন্তে জানা যায়, গুলির আঘাতটি প্রাণঘাতী ছিল না; সায়ানাইড বিষক্রিয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।
প্রীতিলতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি জীবন থেমে গেলেও তাঁর আদর্শ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস থেমে যায়নি। তিনি হয়ে উঠলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক। সমকালীন ও পরবর্তী ইতিহাসচর্চায় তাঁকে বাংলার প্রথম নারী শহীদদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
প্রীতিলতার জীবনকে শুধু তাঁর মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে বিচার করলে তাঁর সংগ্রামের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। একজন মেধাবী ছাত্রী থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে বিপ্লবী সংগঠক এবং শেষ পর্যন্ত একটি সশস্ত্র অভিযানের নেত্রী—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাই তাঁর জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য।
আজকের দিনে প্রীতিলতাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই মূল্যবোধগুলো একজন মানুষকে ইতিহাসের অংশ করে তুলতে পারে। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর তাঁর স্মৃতি অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন অগ্নিঝরা এক জীবন, যার দীপ্তি মাত্র ২১ বছরের আয়ুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে।
শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)