এভাবে আর কোনো পুলককে গণমাধ্যম অঙ্গন থেকে হারাতে চাই না

এভাবে আর কোনো পুলককে গণমাধ্যম অঙ্গন থেকে হারাতে চাই না

আহমেদ আবু জাফর : এভাবে আর কোনো পুলককে গণমাধ্যম অঙ্গন থেকে আমরা হারাতে চাইনা। দেশের অরক্ষিত গণমাধ্যম, অনিশ্চিত সাংবাদিকতা এবং আমাদের গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রযন্ত্রের দায় এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয় । একজন সাংবাদিক যখন আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, তখন সত্যিই আর কিছু বলার থাকে না। তবে কিন্তু কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। যে প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার আদৌ সুযোগ নেই। বরং একজন সাংবাদিকের এমন করুণ মৃত্যু আমাদের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা অঙ্গনের ভেতরে জমে থাকা অদৃশ্য সংকটগুলো নতুন করে সামনে এনে দেয়। পারবে রাষ্ট্র কি পারবে গণমাধ্যম অঙ্গনের এই অসঙ্গতি গুলো পুরোপুরি সমাধান দিতে? পুলক চ্যাটার্জী হয়তো চেয়েছিলেন বরিশালে সমকাল অফিসের মধ্যে আত্মাহুতি দিয়ে গোটা গণমাধ্যম অঙ্গনকে মুক্তি দিতে। সাংবাদিকরা কী পারবে তার সেই আত্মাহুতির অনুভূতি টের পেতে? তিনি চিরকুটে লেখে গেছেন তার সেই অনুভূতি গুলো। এখন দরকার সেই অনুভূতি গুলো নিয়ে আলোচনা করা, সমস্যার সমাধানে কাজ করা।

বরিশালের সিনিয়র সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু তেমনই এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে আমাদের। পুলক চ্যাটার্জি ছিলেন দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বরিশালের ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একজন অভিজ্ঞ সংবাদকর্মী। তিনি বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ন্যাশনাল ডেইলিজ ব্যুরো চীফ অ্যাসোসিয়েশন-এনডিবিএ’র স্থানীয় সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি ছিলেন সাহসী, স্পষ্টবাদী ও দায়িত্বশীল কলমযোদ্ধা।

শুক্রবার সন্ধ্যায় বরিশাল নগরীর প্যারারা রোডে দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরো কার্যালয় থেকে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও এর প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। ঘটনাস্থলের ছবি, মরদেহের অবস্থান এবং তার রেখে যাওয়া সুইসাইড নোটকে ঘিরে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কোনো ছবি বা প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কিন্তু একটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তে নির্ধারিত হবে এটি যেমন সত্য, তেমনি সেই মৃত্যু আমাদের সামনে যে বৃহত্তর প্রশ্নগুলো রেখে যায়, সেগুলো নিয়েও গণমাধ্যম অঙ্গনের সাথে জড়িতদের কথা বলা জরুরি।

বলুনতো, একজন সাংবাদিকের চাকরি কি শুধু একটি পদ? চাকরি হারানোর পর একজন দীর্ঘদিনের পেশাজীবীর জীবনে কী ধরনের আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক সংকট তৈরি হতে পারে তা গোটা দেশের সামনে পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নটি নির্মমভাবে সামনে এনেছে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে একজন সাংবাদিকের চাকরি অনেকের কাছে হয়তো একটি পদ, একটি বেতন কিংবা একটি কর্মসংস্থান। কিন্তু একজন সাংবাদিকের কাছে চাকরিটি তার পেশাগত পরিচয়, পরিবারের জীবিকা, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশেষ করে দীর্ঘদিন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর হঠাৎ চাকরি হারানো একজন সাংবাদিকের জন্য শুধু কর্মহীন হয়ে পড়া নয়; এটি অনেক সময় তার সমগ্র জীবনব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। গতকাল পুলক চ্যাটার্জীর মৃত্যুর পর থেকে বরিশাল সহ সারাদেশের সাংবাদিকদের মাঝে চাপা ক্ষোভ এবং উত্তেজনা লক্ষ্য করা গেছে।

তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে- কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান নিয়মনীতি উপেক্ষা করে একজন সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করার আগে কি একবারও ভাবেন, এই সিদ্ধান্তের পর তার পরিবার কীভাবে চলবে? তার সন্তানদের পড়াশোনা কীভাবে হবে? বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, ঋণ কিংবা নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা কী? চাকরি দেওয়া এবং চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার স্বাভাবিক এখতিয়ার হতে পারে। কিন্তু সেই এখতিয়ারের সঙ্গে কি কোনো মানবিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থাকবে না? একজন হোটেল কর্মচারী মুদি দোকানের সেলসম্যানের বা গার্মেন্টসের শ্রমিকদের চাকরিটি কিন্তু তাৎক্ষণিক হারানোর সম্ভাবনা নেই। অথচ সাংবাদিকদের চাকরি হারানো সহজ যেন কচুপাতার পানি। এখানে নেই কোনও মানবতা বা দরদ। আছে শুধু স্টিমরোলার।

আমাদের দেশের সাংবাদিকরা সবচেয়ে অরক্ষিত যোদ্ধা। যেমন মিডিয়া অঙ্গনে নিরাপত্তা নেই ; তেমনি নেই বাইরের নিরাপত্তা। যেনো উভয় সঙ্কটাপন্ন। দেশের গণমাধ্যমের বড় একটি অংশের সংবাদ সংগ্রহ হয় মফস্বল থেকে। মফস্বলে কর্মরত সাংবাদিকদের একটি বড় অংশই সবচেয়ে বেশি আর্থিক ও পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করেন। এদের ৯০ ভাগ সাংবাদিকের নেই বেতন, ভাতা, রেশন, পেনশন শুধুই টেনশন। অথচ, ওয়েজবোর্ড নামের সোনার হরিনের সাথে দেখা মেলেনা-কারোরই।

একজন সাংবাদিক প্রতিদিন সংবাদ সংগ্রহে বের হন নিজের খরচে। তার মোবাইল বিল আছে, ইন্টারনেট বিল আছে, যাতায়াতের খরচ আছে। কখনো ইউনিয়ন পরিষদ, কখনো উপজেলা, কখনো জেলা শহর, কখনো আদালত, হাসপাতাল কিংবা দুর্গম কোনো এলাকায় ছুটতে হয় তাকে। তার নিজের সংসার আছে। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ আছে। চিকিৎসা, বাড়িভাড়া, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সাংবাদিকের আয় কোথা থেকে আসবে? অনেক ক্ষেত্রেই মফস্বল সাংবাদিকরা নিয়মিত ন্যূনতম সম্মানী পর্যন্ত পান না। অথচ প্রত্যাশার যেন শেষ নেই নিউজ দাও, বিজ্ঞাপন দাও, প্রচার বাড়াও।

একজন সাংবাদিকের শ্রমের মূল্য কত? তার মাসিক আয় কত? তার কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা কী? অসুস্থ হলে কী হবে? চাকরি চলে গেলে কী হবে? দীর্ঘদিন কাজ করার পর অব্যাহতি পেলে তার পাওনা কীভাবে পরিশোধ হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কি গণমাধ্যম ব্যবস্থার কাছে আছে? পত্রিকার ব্যবসা থাকবে, সাংবাদিকের অধিকারও থাকতে হবে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করবে, বিনিয়োগ করবে, লাভ করবে এটি স্বাভাবিক। সংবাদপত্র ও মিডিয়া প্রতিষ্ঠানকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং মানবিক হওয়াও জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাংবাদিক ও কর্মীদের অধিকার কেন অনিশ্চিত থাকবে?

কোনো কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের ব্যবসা ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। গণমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা বা ঋণও পেয়ে থাকে এমন অভিযোগ ও আলোচনা সমাজে রয়েছে। এসব বিষয়ে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আলোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু বিপরীত চিত্রটি আরও বেদনাদায়ক। একদিকে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকার আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে, অন্যদিকে সেই প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের একজন সাংবাদিক তার মাসিক মোবাইল বিল কিংবা যাতায়াত খরচ মেটাতে হিমশিম খান। এই বৈপরীত্য কি আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে না? সাংবাদিকতা কি শুধু দায়িত্ব, নাকি পেশাও? সাংবাদিকের কাছে সাংবাদিকতা একটি দায়িত্ব এ কথা সত্য। কিন্তু সাংবাদিকতা একই সঙ্গে একটি পেশাও। আর কোনো পেশাজীবীকে তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য ছাড়া দীর্ঘদিন কাজ করিয়ে নেওয়া হলে সেখানে পেশাগত ন্যায়বিচারের প্রশ্ন উঠবেই।

আমাদের দেশে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত মানুষের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু কতজনের হাতে বৈধ নিয়োগপত্র আছে? কতজন নিয়মিত বেতন পান? কতজনের চাকরির সুনির্দিষ্ট শর্ত আছে? কতজন চাকরি হারালে ন্যায্য পাওনা পান? কতজন অবসরের পর কোনো নিরাপত্তা পান? এসব প্রশ্নের একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও সর্বজনগ্রাহ্য কাঠামো এখনই প্রয়োজন। এজন্য দরকার একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন। তবে তা আদৌ কি হবে? এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়োগ, পদায়ন, চাকরিচ্যুতি ও পেশাগত মূল্যায়নে স্বচ্ছতার প্রশ্ন। কখনো রাজনৈতিক বিবেচনা, কখনো মালিকানা পরিবর্তন, কখনো ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত, আবার কখনো কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই সাংবাদিক চাকরি হারাতে পারেন এমন অভিযোগ রয়েছে। গণমাধ্যম স্বাধীন হবে এটি যেমন জরুরি, তেমনি গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকও যেন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে পারেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন সাংবাদিক সুরক্ষার জাতীয় নীতিমালা রাষ্ট্র সাংবাদিকের হয়ে সংবাদ লিখবে না। সম্পাদকীয় নীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে না। কিন্তু রাষ্ট্র এমন একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি করতে পারে, যেখানে সাংবাদিকের শ্রমের মূল্য, চাকরির ন্যায্যতা, পাওনা পরিশোধ, বৈষম্যহীনতা এবং ন্যূনতম পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। একজন সাংবাদিককে অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হলে তার প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। দীর্ঘদিন কাজ করা একজন সাংবাদিক হঠাৎ চাকরিচ্যুত হলে তার পাওনা, নোটিশ, ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে পারে। পুলক চ্যাটার্জিকে চাকুরীচ্যুতি করার পর সমকাল কেন তার বেতন ভাতা পরিশোধ করলেন না এটি কি একজন সাংবাদিকের সাথে অন্যায় এবং দণ্ডনীয় অপরাধ নয়? প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মানবসম্পদ নীতিও শক্তিশালী হওয়া দরকার। নিয়োগপত্র, নির্ধারিত বেতন-ভাতা, ছুটি, কর্মঘণ্টা, চাকরিচ্যুতির স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, ন্যায্য পাওনা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও বৈষম্য প্রতিরোধ এবং সংকটকালে সহায়তার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যকে আর অবহেলার বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না।

চাকরি হারানো, দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়া, আর্থিক সংকট, কর্মস্থলের চাপ কিংবা পেশাগত অপমান একজন মানুষের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং ও সংকটকালীন সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা উচিত। পুলকের মৃত্যু যেন শুধু শোকের খবর হয়ে না থাকে
পুলক চ্যাটার্জির চলে যাওয়া নিয়ে আবেগ থাকবে, শোক থাকবে, সহকর্মীদের চোখে পানি থাকবে। কয়েকদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে লেখা হবে। তারপর হয়তো আমরা আবার আগের মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ব। তবে পুলক চ্যাটার্জীর মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে গণমাধ্যম অঙ্গনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

পুলক চ্যাটার্জীর শোক আর শেষকৃত্য কিন্তু এখানেই শেষ হওয়া উচিত নয়। তার মৃত্যু আমাদের গণমাধ্যমের
জন্য একটি সতর্কবার্তা। মিডিয়ায় কাজ করা এমন হাজারো ‘পুলক’ হয়তো আজ নীরবে-নিভৃতে দগ্ধ হচ্ছেন। কেউ চাকরি হারানোর আতঙ্কে, কেউ বেতন-সম্মানীর অনিশ্চয়তায়, কেউ পারিবারিক সংকটে, কেউ পেশাগত অবমূল্যায়নে, আবার কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। আমরা তাদের কতজনের খবর রাখি বা রাখছেন? প্রতিনিয়ত আমার কাছে সারাদেশের বিভিন্ন সাংবাদিকের নানা কষ্ট গাঁথা বেদনাদায়ক গল্প শোনতে হয়, শুনছি। কিন্তু কিছু করতে পারছিনা, সংকট চারিদিকে। কারো বেতন নেই, কারো চাকরি নেই কাউকে ডেক্স থেকে চাকরিচ্যুতির ভয় দেখানো হচ্ছে, কত কি? গণমাধ্যমের মালিক পক্ষ তৃণমূলের সাংবাদিকদের বেতন ভাতা না দিতে সেন্ট্রাল ডেস্কে অপ্রয়োজনীয় লোকজন-ক্যাডার নিয়োগ দিয়ে হয়রানি করছেন, এমন মিডিয়ার সংখ্যাও কম নেই।
একজন সাংবাদিককে শুধু সংবাদ সংগ্রহের সময় প্রয়োজন হয় না। তার প্রয়োজন হয় নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য পারিশ্রমিক, সম্মান, চাকরির নিশ্চয়তা এবং বিপদের সময়ে সহায়তার হাত।

আমরা কি এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যেখানে সাংবাদিক প্রয়োজনের সময় গুরুত্বপূর্ণ, আর প্রয়োজন শেষ হলে পরিত্যক্ত? নাকি এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যেখানে মালিক ও সাংবাদিকের মধ্যে পেশাগত সম্পর্কের পাশাপাশি মানবিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতাও থাকবে? সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। এতটুকুও জানি যে, আমার এ লেখাটি অনেক মিডিয়ার কাছে খারাপ লাগবে, গাত্রদাহ হবে তাই ছাপাবেন না, তবুও না বলা কথা গুলো লিখতে বাধ্য হলাম এবং লিখবো। তবে পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তে বেরিয়ে আসুক। সত্য যা-ই হোক, তা জাতির সামনে স্বচ্ছভাবে প্রকাশিত হোক। কিন্তু একই সঙ্গে তার মৃত্যু যে প্রশ্নগুলো সামনে এনেছে, সেগুলোও জাতীয় আলোচনার বিষয় হোক। কীভাবে আমাদের অরক্ষিত গণমাধ্যম অঙ্গনকে সুরক্ষিত করা যায়? কীভাবে সাংবাদিকতার কর্ম এবং এই পেশাটিকে রক্ষা করা যায়? এখনই সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। রাষ্ট্রকে নীতিমালা করতে হবে, গণমাধ্যম মালিকদের দায়িত্বশীল হতে হবে, সম্পাদকদের মানবিক হতে হবে এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে শুধু প্রতিবাদ-বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সাংবাদিকদের জন্য কার্যকর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলতে হবে, সাংবাদিক সংগঠনের নামে দোকানদারি করলে চলবেনা। কারণ আর কোনো সাংবাদিক যেন পেশাগত অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট, চাকরি হারানোর ভয় কিংবা একাকিত্বের অন্ধকারে হারিয়ে না যান। আর কোনো পুলক চ্যাটার্জিকে আমরা হারাতে চাই না।

মনে রাখা উচিত, সাংবাদিক বাঁচলে সাংবাদিকতা বাঁচবে। সাংবাদিকতা বাঁচলে গণমাধ্যম বাঁচবে। আর গণমাধ্যম বাঁচলে মানুষের কথা বলার শক্তিটুকুও বেঁচে থাকবে, গণতন্ত্র রক্ষা পাবে।

লেখক পরিচিতি : আহমেদ আবু জাফর, চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রী: ০১৭১২৩০৬৫০১।

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

এভাবে আর কোনো পুলককে গণমাধ্যম অঙ্গন থেকে হারাতে চাই না

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল থেকে স্বীকৃতির মঞ্চে; ২০১৩ সাল থেকে শিক্ষকতা, আনন্দঘন পাঠদান ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থা

নিজস্ব প্রতিনিধি : একটি গান, একটি রিল ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও ট্রল। ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল ভার্চুয়াল জগতে। নানা মন্তব্য আর সমালোচনার মধ্যে একসময় ভিডিওটি সরিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই বিতর্কের কয়েক মাস পরই সামনে এলো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের আরেকটি পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাকে পেছনে ফেলে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিউটি রানী পাল।

তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে চারজনকে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁদের একজন বিউটি রানী পাল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর স্বাক্ষর করা একটি স্মারকের মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষকদের নাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও সেখানে বিউটি রানী পালের নাম ছিল না।

যে রিল ঘিরে আলোচনাঃ

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ‘ডিফরেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় একটি গানের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি রানী পাল। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’—গানের এই অংশ ব্যবহারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটির সঙ্গে নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে তা প্রচার করা হলে তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও ট্রল। সাইবার বুলিংয়ের মুখে একপর্যায়ে ভিডিওটি সরিয়ে নেন তিনি।

তবে ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল একজন শিক্ষককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকার শত শত নারী শিক্ষক একই গানের সঙ্গে নিজেদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। শিক্ষক সমাজের এমন অভিনব প্রতিবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সংহতি প্রকাশ করেন।

ফলে একটি ব্যক্তিগত রিল ভিডিওকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনা পরিণত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী শিক্ষকদের প্রতি আচরণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অনলাইন হয়রানি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায়।

বিতর্কের বাইরে অন্য এক পরিচয়ঃ

তবে বিউটি রানী পালের শিক্ষকতা জীবনের গল্প শুরু হয়নি ওই রিল ভিডিও দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত তিনি। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সৃজনশীল নানা কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন তিনি। আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শরীরচর্চা এবং নাচের ছন্দে পড়াশোনাকে সহজ করে তোলার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এসব উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এর আগেও তিনি একবার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো জেলা পর্যায়ের এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বনাম শ্রেণিকক্ষঃ

বিউটি রানী পালের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। অনলাইনে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও যেমন দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তেমনি সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মন্তব্য বা প্রচারণাও মুহূর্তে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে একজন শিক্ষকের প্রকৃত কাজের পরিধি অনেক দীর্ঘ। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, তাদের আগ্রহ তৈরি করা, শেখার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার মূল্যায়ন একটি রিল ভিডিওর কয়েক মিনিটের দৃশ্য দিয়ে করা সম্ভব নয়।

বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা তাঁকে আলোচনায় এনেছিল। কিন্তু জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের কাজ ও অবদানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্বীকৃতি কি বদলে দেয় আলোচনার ভাষা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ দ্রুত মতামত দেয়। সেখানে প্রেক্ষাপট, দীর্ঘমেয়াদি কাজ কিংবা একজন ব্যক্তির সামগ্রিক পরিচয় অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। বিউটি রানী পালের ঘটনাতেও প্রথমে সামনে এসেছিল একটি রিল ভিডিও। পরে সামনে এসেছে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পাঠদানের বিষয়টি।

জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার তথ্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই ব্যক্তিকে ঘিরে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর পেশাগত কাজের স্বীকৃতিও রয়েছে—দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে।

শিক্ষকের পরিচয় শ্রেণিকক্ষেইঃ

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর শ্রেণিকক্ষের কাজ—শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বাইরে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের এই দিকটিই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার।

একটি রিল তাঁকে পরিচিত করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; আর শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ তাঁকে এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিউটি রানী পালের গল্পটি যেন মনে করিয়ে দেয়—ভার্চুয়াল জগতের কয়েক মুহূর্তের আলোচনার চেয়ে একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের কাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

এভাবে আর কোনো পুলককে গণমাধ্যম অঙ্গন থেকে হারাতে চাই না

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ অনুদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা এবং অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এ অনুদান দেওয়া হবে।

এবার অনলাইনের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির মাধ্যমে সুপারিশকৃত আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে পৌঁছাতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিচালন বাজেটের আওতায় বিশেষ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থ বিতরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাইগভ প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত, দুর্গম, উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকার অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যে খাতে দেওয়া হবে অনুদান:

বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মেরামত ও সংস্কার, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা, প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা এবং পাঠাগার উন্নয়নে বিশেষ অনুদান দেওয়া হবে।

এ ছাড়া বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনাজনিত কারণে আর্থিক সহায়তার জন্যও আবেদন করা যাবে।

অগ্রাধিকার পাবেন যেসব শিক্ষার্থীঃ

সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনায় আক্রান্ত, দুস্থ, মেধাবী, এতিম, অদম্য মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অসহায় ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন।

দেশের উপকূলীয়, চরাঞ্চল, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদেরও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যেভাবে করতে হবে আবেদনঃ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। আর স্নাতক বা সমমান এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে জমা দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রার আবেদনগুলো গ্রহণ করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে একত্র করবেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।

অনলাইন ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাতে দ্বৈতভাবে সুপারিশ না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ জন্য জেলা কমিটি আগে অনলাইনে সুপারিশ করা তালিকার সঙ্গে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাওয়া আবেদনসমূহ সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে।

নির্ধারিত আবেদন ফরম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট www.shed.gov.bd-এ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

সময়সীমা ১৫ অক্টোবরঃ

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাওয়া আবেদন জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবে। সুপারিশকৃত তালিকা আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর পৌঁছাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া কোনো আবেদন বিবেচনা করা হবে না।

শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা যেন কেবল শহর কিংবা সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে সরকারি সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

এভাবে আর কোনো পুলককে গণমাধ্যম অঙ্গন থেকে হারাতে চাই না

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

—— মানিক লাল ঘোষ ——
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে কজন বিপ্লবীর নাম সাহস, আত্মত্যাগ ও দুর্জয় প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নারী ছিলেন না; ছিলেন এমন এক সময়ের অদম্য কণ্ঠ, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নারীর জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ ছিল নানা বাধায় পরিপূর্ণ। মাত্র ২১ বছরের জীবনে প্রীতিলতা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয়।
২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর শহীদ হওয়ার দিন। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে—যিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভায় চাকরি করতেন এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন গৃহিণী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও মননশীল।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই অসাধারণ সাফল্য প্রমাণ করে, প্রীতিলতা কেবল সাহসী বিপ্লবীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গভীর মননশীল ও মেধাবী নারীও।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। নন্দনকানন অপরনাচরণ স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন এবং পরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বও পালন করেন। একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশাজীবন তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দেশের পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং বৈষম্যের বাস্তবতা তাঁকে অন্য এক পথে টেনে নেয়।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রীতিলতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় পড়াশোনার সময় তিনি দীপালি সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন—যে সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের শারীরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান সংগঠক মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ তখন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু প্রীতিলতা ধীরে ধীরে সংগঠনের আস্থা অর্জন করেন। গোপন যোগাযোগ, বিপ্লবীদের সহায়তা, সংবাদ ও প্রচারপত্র পৌঁছে দেওয়া, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তিনি অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন সহযোগী নন, গুরুত্বপূর্ণ একজন সংগঠক ও নেতৃত্বদানের যোগ্য বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩২ সালে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলন তখন চট্টগ্রামে তীব্রতর। এরই মধ্যে পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থায় ক্লাবটি ছিল ইউরোপীয়দের সামাজিক আধিপত্য ও বর্ণবৈষম্যের একটি প্রতীক। ক্লাবটির প্রবেশপথে থাকা ‘Dogs and Indians not allowed’ ধরনের বর্ণবাদী বার্তা ভারতীয়দের প্রতি ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার নির্মম প্রকাশ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এই ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতার ওপর অর্পিত হয়। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে, যা ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহর পর্যন্ত গড়ায়, তিনি বিপ্লবীদের একটি দল নিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করেন। পুরুষের ছদ্মবেশে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবীরা ক্লাবে হামলা চালায় এবং ভবনের অংশবিশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন এবং একপর্যায়ে তিনি বিচ্ছিন্ন ও ঘেরাও হয়ে পড়েন।
প্রীতিলতা জানতেন, ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে। বিপ্লবীদের মধ্যে বন্দিত্ব এড়ানোর জন্য সায়ানাইড বহনের পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তী ময়নাতদন্তে জানা যায়, গুলির আঘাতটি প্রাণঘাতী ছিল না; সায়ানাইড বিষক্রিয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।
প্রীতিলতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি জীবন থেমে গেলেও তাঁর আদর্শ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস থেমে যায়নি। তিনি হয়ে উঠলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক। সমকালীন ও পরবর্তী ইতিহাসচর্চায় তাঁকে বাংলার প্রথম নারী শহীদদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
প্রীতিলতার জীবনকে শুধু তাঁর মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে বিচার করলে তাঁর সংগ্রামের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। একজন মেধাবী ছাত্রী থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে বিপ্লবী সংগঠক এবং শেষ পর্যন্ত একটি সশস্ত্র অভিযানের নেত্রী—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাই তাঁর জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য।
আজকের দিনে প্রীতিলতাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই মূল্যবোধগুলো একজন মানুষকে ইতিহাসের অংশ করে তুলতে পারে। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর তাঁর স্মৃতি অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন অগ্নিঝরা এক জীবন, যার দীপ্তি মাত্র ২১ বছরের আয়ুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে।
শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)