তিনবার মেট্রিকে ফেল, পরে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য
তিনবার মেট্রিকে ফেল, পরে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য
নিজের লাগানো চন্দনগাছের কাঠেই হয়েছিল শেষকৃত্য
দিরাই (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : শৈশবে পড়াশোনায় খুব একটা মন বসত না। মেট্রিক পরীক্ষায় তিনবার অকৃতকার্য হওয়ার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নাটক ও যাত্রাপালার প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। মঞ্চে অভিনয় করা সেই দুরন্ত কিশোরই একদিন হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ—সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার আনোয়ারপুর গ্রামের এই সন্তান পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, আইন পেশায় যুক্ত হন এবং রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
রাজনীতির শুরু বামপন্থী ধারায়। পরে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান।
সংসদীয় রাজনীতিতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন স্বতন্ত্র বক্তা। যুক্তি, তীক্ষ্ণ বক্তব্য ও রসবোধের কারণে সংসদে তাঁর বক্তব্য আলাদা করে মনোযোগ আকর্ষণ করত। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং মন্ত্রিসভায়ও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল কেবল সাফল্যের গল্প নয়। রেলমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীর গাড়িতে বিপুল অর্থ পাওয়ার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি রেলমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রশংসার পাশাপাশি বিতর্কও ছিল।
দিরাই-শাল্লার মানুষের কাছে অবশ্য জাতীয় রাজনীতির এই নেতা ছিলেন পরিচিত ‘সেনদা’ বা ‘দুখু সেন’ নামে। হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন, কৃষকের সমস্যা ও এলাকার উন্নয়নসহ নানা স্থানীয় বিষয়ে তাঁর সরব উপস্থিতি ছিল।
ব্যক্তিজীবনের নানা স্মৃতিতেও উঠে আসে তাঁর মানবিকতার কথা। বন্ধু, পরিচিতজন কিংবা বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিভিন্ন ঘটনা তাঁর পরিচিতজনেরা স্মরণ করেছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে এসব স্মৃতিও তাঁকে অনেকের কাছে আপন করে রেখেছিল।
তবে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের একটি ঘটনা আজও বিশেষভাবে আলোচিত।
আনোয়ারপুরে নিজের বাড়ির উঠানে একসময় একটি চন্দনগাছের চারা লাগিয়েছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, বহু বছর পর সেই গাছের কাঠই তাঁর শেষযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হবে।
২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মারা যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। পরে তাঁর মরদেহ নেওয়া হয় জন্মভূমি দিরাইয়ের আনোয়ারপুরে। সেখানেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। জানা যায়, নিজের হাতে লাগানো সেই চন্দনগাছের কাঠের একটি অংশ তাঁর দাহকার্যে ব্যবহার করা হয়েছিল।
জীবনের এই পরিণতি যেন এক অদ্ভুত বৃত্ত সম্পূর্ণ করে—যে উঠানে তিনি গাছ লাগিয়েছিলেন, শেষ বিদায়ের সময় সেই গাছই হয়ে উঠেছিল তাঁর শেষযাত্রার অংশ।
তিনবার পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া এক কিশোর থেকে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য, সাতবারের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী—সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জীবন তাই সাফল্য ও ব্যর্থতা, অর্জন ও বিতর্কের নানা অধ্যায়ে বিস্তৃত।
তাঁর জীবনকে শুধু একটি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। একজন মানুষ কখনো তাঁর একটি ব্যর্থতা, একটি পদ কিংবা একটি বিতর্ক দিয়ে সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেন না। সময়ের সঙ্গে তাঁর জীবন, কর্ম ও রাজনৈতিক ভূমিকার নানা অধ্যায়ই তাঁকে ইতিহাসে স্থান করে দেয়।
আজ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নেই। কিন্তু দিরাইয়ের আনোয়ারপুরে তাঁর স্মৃতি, মানুষের মুখে তাঁর নাম আর নিজের হাতে লাগানো সেই চন্দনগাছের গল্প—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনকথার একটি আবেগঘন অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে।
হাওরের মাটি থেকে উঠে আসা সেই দুরন্ত কিশোর শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন জাতীয় রাজনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চে। আর শেষ বিদায়ও নিয়েছিলেন নিজের জন্মভূমির মাটিতে।






