সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ক: ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ক: ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ড. শেখ আকরাম আলী

১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার বহু শতাব্দী আগে থেকেই বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক বিদ্যমান। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সতর্ক কূটনৈতিক স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ক পরবর্তীতে শ্রমিক অভিবাসন, ধর্মীয় সদ্ভাব এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছে।

দুই দেশের বর্তমান সম্পর্কের গভীরে যাওয়ার আগে চলুন ইতিহাসের পাতাগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। মধ্যযুগীয় আমলে বাংলার সালতানাতের শাসকেরা হিজাজ অঞ্চলে (বর্তমান সৌদি আরব) ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ মক্কা ও মদিনায় ‘বাঙালিয়া মাদ্রাসা’ নামে পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের অর্থায়ন করেছিলেন। সুলতান জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ মক্কার শরীফের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন এবং পবিত্র দুই নগরীর অধিবাসীদের জন্য প্রচুর উপহার ও সম্মানসূচক পোশাক পাঠাতেন। এই সময়ে বাংলা তার ধন-সম্পদের জন্য সুখ্যাত ছিল।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের পর, আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হয় ১৯৭৫ সালে সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর—যা ওআইসি (OIC)-র আলোচনার মাধ্যমে আরও সুদৃঢ় হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ সৌদি আরবের সাথে একটি বিশেষ গুরুত্ব সংযুক্ত করে, যা ইসলামের জন্মভূমি। যৌথ ইসলামিক মূল্যবোধ এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সহজতর করেছে, যার মূলে রয়েছে বার্ষিক হজ পালন এবং ধর্মীয় পণ্ডিতদের শিক্ষাসংক্রান্ত আদান-প্রদান।

১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে জিয়াউর রহমানের সফরের মাধ্যমে সৌদি আরবের সাথে সম্পর্কের ভীত আরও মজবুত হতে শুরু করে এবং তা দ্রুত এশিয়ার দুই মুসলিম দেশের মধ্যে এক অর্থপূর্ণ বন্ধুত্বে পরিণত হয়। বর্তমানে ২৫ লক্ষেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি বছরে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন; যার মাধ্যমে সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সুসংগঠিত করতে সৌদি আরব বিশাল বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। রিয়াদ বিগত দশকগুলোতে অবকাঠামো, কৃষি ও রেলওয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অর্থায়ন, অনুদান ও ঋণ প্রদান করেছে। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলিম দেশও বাংলাদেশকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করে।

সৌদি আরবের নেতৃত্বে পুরো মুসলিম বিশ্বের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। দেশটি বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নেওয়া শুরু করে এবং তা বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের একমাত্র বড় উৎসে পরিণত হয়। জিয়াউর রহমানের নানামুখী উদ্যোগে এই খাতে দ্রুত অগ্রগতি সাধিত হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মুসলিম দেশ বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নিয়োগে এগিয়ে আসে।

সৌদি-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব একটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং সময়ের সাথে সাথে তা দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়েছে। বর্তমানে ত্রিশ লক্ষেরও বেশি মানুষ সৌদি আরবে কর্মরত আছেন এবং এই শ্রমিকেরা বাংলাদেশের জন্য রেমিট্যান্সের একটি বিরাট উৎস। বাংলাদেশের মানুষ সৌদি আরবের সাথে এই ক্রমবর্ধমান সম্পর্ককে অত্যন্ত আনন্দের সাথে স্বাগত জানায়। শুরু থেকে আজ অবধি তারা বাংলাদেশের একজন প্রকৃত বন্ধু হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে।

দ্বিপাক্ষিক এই সম্পর্ক এখন আর কেবল প্রথাগত জনশক্তি রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সৌদি নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশ হিসেবে বিবেচনা করছে। সৌদি প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনগুলো বাংলাদেশের জ্বালানি অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য শক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগে ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে।

অতীতের প্রতিটি সরকারই সৌদি আরবের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, বিশেষ করে এরশাদ এবং খালেদা জিয়ার শাসননামলে। এরশাদ এবং খালেদা জিয়া দুজনকেই সৌদি সরকার যথাযথ সম্মানে ভূষিত করেছিল। তাঁরা উভয়ই একাধিকবার দেশটিতে সফর করেন এবং এই দুই ভ্রাতৃপ্রতীম মুসলিম দেশের সম্পর্ককে সর্বোচ্চ চূড়ায় উন্নীত করেন। এরশাদের আমন্ত্রণে যুবরাজ মোহাম্মদ সুলতান বিন আব্দুল আজিজ বাংলাদেশ সফর করেছিলেন এবং সেই সফরকালে তিনি বিএমএ (বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি) পরিদর্শন করেন। লেখক সৌভাগ্যবশত সে সময় বিএমএ-তে অবস্থান করায় যুবরাজের সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পেয়েছিলেন।

১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে যে সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল, তাতে সৌদি আরব কেবল বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সর্ববৃহৎ বৈশ্বিক গন্তব্যেই পরিণত হয়নি, বরং বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, সৌদি সরকারও দেশের প্রতিটি প্রশাসনের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সামঞ্জস্যের অংশ হিসেবে লোহিত সাগরের বাণিজ্য সুরক্ষায় সৌদি নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যোগদান একটি গভীরতর নিরাপত্তা সংলাপ এবং সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন অংশীদারিত্বের ইঙ্গিত দেয়।

উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা, যেমন বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রী এবং সৌদি পররাষ্ট্র নেতৃত্বের মধ্যকার বৈঠকগুলো উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফর এবং বর্ধিত বাণিজ্য চুক্তির পথ সুগম করে চলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগত নির্ভরতা কমানোর উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের উদ্যোগে সম্প্রতি ২০২৬ সালের ৭ই আগস্ট স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’ তাদের কৌশলগত স্বার্থকে আরও উঁচুতে তুলে ধরেছে। সেই সাথে এটি বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যা বিগত কয়েক দশকে ওআইসি (OIC) করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

বাংলাদেশকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে ‘মক্কা চুক্তি’ (Makkah Pact) এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ভারতের মতো প্রতিবেশীরা এটিকে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী বলে মনে করছে। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই নতুন গঠিত এই জোটে বাংলাদেশ যোগদান করুক—এমনটা সৌদি আরব আশা করবে। তবে ভারতীয় গণমাধ্যম এবং কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মক্কা চুক্তির বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং বাংলাদেশকে এতে যোগ না দেওয়ার জন্য নিরুৎসাহিত করছে। তারা চায় বাংলাদেশ যেন এই চুক্তি থেকে দূরে থাকে, কারণ তারা ভবিষ্যতে এর দূরপ্রসারী ও ইতিবাচক পরিণতির কথা ভালোভাবেই জানে।

বাংলাদেশ আজ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে প্রতিবেশীর আধিপত্যবাদী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, আর অন্যদিকে মক্কা চুক্তিতে যোগ দিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা—যার কারণে ভারতের মতো প্রতিবেশী তারেক রহমানের বর্তমান সরকারকে নানাভাবে কোণঠাসা বা হেনস্তা করার চেষ্টা করতে পারে।

ভারতের পক্ষ থেকে আসা যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। তবে এই সুযোগ আমাদের হাতছাড়া করা উচিত নয়; কারণ এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে। সৌদি আরবভিত্তিক এই প্রতিরক্ষা চুক্তির পাশে দাঁড়াতে এবং যত দ্রুত সম্ভব এতে যোগ দিতে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারের প্রতি সমর্থন জানাতে হবে।

আমাদের যখনই সহায়তা ও সমর্থনের প্রয়োজন হয়েছিল, তখন সৌদি আরবের নেতৃত্বে বিশ্বের মুসলিম দেশগুলো এগিয়ে এসেছিল এবং একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এটি জিয়াউর রহমানের সরকারের জন্য বড় সাফল্য এনে দিয়েছিল, যা ভারতের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যেই দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেছিল।

বাংলাদেশ এখন সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করে গড়ে ওঠা এই বৃহৎ নিরাপত্তা কাঠামোতে নিজের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করছে। মধ্যপ্রাচ্য ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সাথে এই ধরণের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা ভারতের মতো প্রতিবেশী শক্তির সাথে কূটনৈতিক ভারসাম্যের এক বড় পরীক্ষা। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে সরকারের আসন্ন সিদ্ধান্ত এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের জন্য তাঁর দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এখন সময় এসেছে তারেক রহমানের—সাহস ও দূরদর্শিতা প্রদর্শন করে মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে বিষয়টিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার। এখন ঘোষণা দেওয়ার উপযুক্ত সময় যে, *“আমরা কোনো দেশ বা পরাশক্তির বিরুদ্ধে নই; বরং মুসলিম ভ্রাতৃপ্রতীম দেশগুলোর সাথে হাত মিলিয়ে কেবল দেশের মানুষ ও জাতীয় স্বার্থের রক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর।”

এটি নিশ্চিতভাবেই আমাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করবে, পাশাপাশি ভবিষ্যতে আমাদের অর্থ ও জ্বালানি খাতের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাবে।

লেখক পরিচিতি : ড. শেখ আকরাম আলী, অধ্যাপক (আইন বিভাগ) ও সম্পাদক, মিলিটারি হিস্ট্রি জার্নাল

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ক: ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল থেকে স্বীকৃতির মঞ্চে; ২০১৩ সাল থেকে শিক্ষকতা, আনন্দঘন পাঠদান ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থা

নিজস্ব প্রতিনিধি : একটি গান, একটি রিল ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও ট্রল। ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল ভার্চুয়াল জগতে। নানা মন্তব্য আর সমালোচনার মধ্যে একসময় ভিডিওটি সরিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই বিতর্কের কয়েক মাস পরই সামনে এলো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের আরেকটি পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাকে পেছনে ফেলে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিউটি রানী পাল।

তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে চারজনকে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁদের একজন বিউটি রানী পাল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর স্বাক্ষর করা একটি স্মারকের মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষকদের নাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও সেখানে বিউটি রানী পালের নাম ছিল না।

যে রিল ঘিরে আলোচনাঃ

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ‘ডিফরেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় একটি গানের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি রানী পাল। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’—গানের এই অংশ ব্যবহারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটির সঙ্গে নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে তা প্রচার করা হলে তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও ট্রল। সাইবার বুলিংয়ের মুখে একপর্যায়ে ভিডিওটি সরিয়ে নেন তিনি।

তবে ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল একজন শিক্ষককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকার শত শত নারী শিক্ষক একই গানের সঙ্গে নিজেদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। শিক্ষক সমাজের এমন অভিনব প্রতিবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সংহতি প্রকাশ করেন।

ফলে একটি ব্যক্তিগত রিল ভিডিওকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনা পরিণত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী শিক্ষকদের প্রতি আচরণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অনলাইন হয়রানি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায়।

বিতর্কের বাইরে অন্য এক পরিচয়ঃ

তবে বিউটি রানী পালের শিক্ষকতা জীবনের গল্প শুরু হয়নি ওই রিল ভিডিও দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত তিনি। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সৃজনশীল নানা কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন তিনি। আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শরীরচর্চা এবং নাচের ছন্দে পড়াশোনাকে সহজ করে তোলার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এসব উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এর আগেও তিনি একবার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো জেলা পর্যায়ের এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বনাম শ্রেণিকক্ষঃ

বিউটি রানী পালের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। অনলাইনে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও যেমন দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তেমনি সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মন্তব্য বা প্রচারণাও মুহূর্তে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে একজন শিক্ষকের প্রকৃত কাজের পরিধি অনেক দীর্ঘ। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, তাদের আগ্রহ তৈরি করা, শেখার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার মূল্যায়ন একটি রিল ভিডিওর কয়েক মিনিটের দৃশ্য দিয়ে করা সম্ভব নয়।

বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা তাঁকে আলোচনায় এনেছিল। কিন্তু জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের কাজ ও অবদানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্বীকৃতি কি বদলে দেয় আলোচনার ভাষা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ দ্রুত মতামত দেয়। সেখানে প্রেক্ষাপট, দীর্ঘমেয়াদি কাজ কিংবা একজন ব্যক্তির সামগ্রিক পরিচয় অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। বিউটি রানী পালের ঘটনাতেও প্রথমে সামনে এসেছিল একটি রিল ভিডিও। পরে সামনে এসেছে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পাঠদানের বিষয়টি।

জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার তথ্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই ব্যক্তিকে ঘিরে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর পেশাগত কাজের স্বীকৃতিও রয়েছে—দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে।

শিক্ষকের পরিচয় শ্রেণিকক্ষেইঃ

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর শ্রেণিকক্ষের কাজ—শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বাইরে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের এই দিকটিই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার।

একটি রিল তাঁকে পরিচিত করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; আর শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ তাঁকে এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিউটি রানী পালের গল্পটি যেন মনে করিয়ে দেয়—ভার্চুয়াল জগতের কয়েক মুহূর্তের আলোচনার চেয়ে একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের কাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ক: ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ অনুদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা এবং অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এ অনুদান দেওয়া হবে।

এবার অনলাইনের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির মাধ্যমে সুপারিশকৃত আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে পৌঁছাতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিচালন বাজেটের আওতায় বিশেষ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থ বিতরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাইগভ প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত, দুর্গম, উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকার অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যে খাতে দেওয়া হবে অনুদান:

বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মেরামত ও সংস্কার, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা, প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা এবং পাঠাগার উন্নয়নে বিশেষ অনুদান দেওয়া হবে।

এ ছাড়া বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনাজনিত কারণে আর্থিক সহায়তার জন্যও আবেদন করা যাবে।

অগ্রাধিকার পাবেন যেসব শিক্ষার্থীঃ

সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনায় আক্রান্ত, দুস্থ, মেধাবী, এতিম, অদম্য মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অসহায় ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন।

দেশের উপকূলীয়, চরাঞ্চল, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদেরও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যেভাবে করতে হবে আবেদনঃ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। আর স্নাতক বা সমমান এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে জমা দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রার আবেদনগুলো গ্রহণ করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে একত্র করবেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।

অনলাইন ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাতে দ্বৈতভাবে সুপারিশ না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ জন্য জেলা কমিটি আগে অনলাইনে সুপারিশ করা তালিকার সঙ্গে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাওয়া আবেদনসমূহ সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে।

নির্ধারিত আবেদন ফরম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট www.shed.gov.bd-এ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

সময়সীমা ১৫ অক্টোবরঃ

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাওয়া আবেদন জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবে। সুপারিশকৃত তালিকা আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর পৌঁছাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া কোনো আবেদন বিবেচনা করা হবে না।

শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা যেন কেবল শহর কিংবা সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে সরকারি সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ক: ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

—— মানিক লাল ঘোষ ——
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে কজন বিপ্লবীর নাম সাহস, আত্মত্যাগ ও দুর্জয় প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নারী ছিলেন না; ছিলেন এমন এক সময়ের অদম্য কণ্ঠ, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নারীর জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ ছিল নানা বাধায় পরিপূর্ণ। মাত্র ২১ বছরের জীবনে প্রীতিলতা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয়।
২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর শহীদ হওয়ার দিন। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে—যিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভায় চাকরি করতেন এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন গৃহিণী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও মননশীল।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই অসাধারণ সাফল্য প্রমাণ করে, প্রীতিলতা কেবল সাহসী বিপ্লবীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গভীর মননশীল ও মেধাবী নারীও।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। নন্দনকানন অপরনাচরণ স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন এবং পরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বও পালন করেন। একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশাজীবন তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দেশের পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং বৈষম্যের বাস্তবতা তাঁকে অন্য এক পথে টেনে নেয়।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রীতিলতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় পড়াশোনার সময় তিনি দীপালি সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন—যে সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের শারীরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান সংগঠক মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ তখন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু প্রীতিলতা ধীরে ধীরে সংগঠনের আস্থা অর্জন করেন। গোপন যোগাযোগ, বিপ্লবীদের সহায়তা, সংবাদ ও প্রচারপত্র পৌঁছে দেওয়া, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তিনি অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন সহযোগী নন, গুরুত্বপূর্ণ একজন সংগঠক ও নেতৃত্বদানের যোগ্য বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩২ সালে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলন তখন চট্টগ্রামে তীব্রতর। এরই মধ্যে পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থায় ক্লাবটি ছিল ইউরোপীয়দের সামাজিক আধিপত্য ও বর্ণবৈষম্যের একটি প্রতীক। ক্লাবটির প্রবেশপথে থাকা ‘Dogs and Indians not allowed’ ধরনের বর্ণবাদী বার্তা ভারতীয়দের প্রতি ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার নির্মম প্রকাশ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এই ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতার ওপর অর্পিত হয়। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে, যা ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহর পর্যন্ত গড়ায়, তিনি বিপ্লবীদের একটি দল নিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করেন। পুরুষের ছদ্মবেশে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবীরা ক্লাবে হামলা চালায় এবং ভবনের অংশবিশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন এবং একপর্যায়ে তিনি বিচ্ছিন্ন ও ঘেরাও হয়ে পড়েন।
প্রীতিলতা জানতেন, ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে। বিপ্লবীদের মধ্যে বন্দিত্ব এড়ানোর জন্য সায়ানাইড বহনের পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তী ময়নাতদন্তে জানা যায়, গুলির আঘাতটি প্রাণঘাতী ছিল না; সায়ানাইড বিষক্রিয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।
প্রীতিলতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি জীবন থেমে গেলেও তাঁর আদর্শ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস থেমে যায়নি। তিনি হয়ে উঠলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক। সমকালীন ও পরবর্তী ইতিহাসচর্চায় তাঁকে বাংলার প্রথম নারী শহীদদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
প্রীতিলতার জীবনকে শুধু তাঁর মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে বিচার করলে তাঁর সংগ্রামের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। একজন মেধাবী ছাত্রী থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে বিপ্লবী সংগঠক এবং শেষ পর্যন্ত একটি সশস্ত্র অভিযানের নেত্রী—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাই তাঁর জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য।
আজকের দিনে প্রীতিলতাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই মূল্যবোধগুলো একজন মানুষকে ইতিহাসের অংশ করে তুলতে পারে। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর তাঁর স্মৃতি অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন অগ্নিঝরা এক জীবন, যার দীপ্তি মাত্র ২১ বছরের আয়ুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে।
শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)