শাহরাস্তি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লোকবল সংকট, আয়ার হাতে ইসিজি করার অভিযোগ
শাহরাস্তি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লোকবল সংকট, আয়ার হাতে ইসিজি করার অভিযোগ
শাহরাস্তি প্রতিনিধি: প্রয়োজনীয় জনবল ও কারিগরি কর্মী সংকটে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পরীক্ষা ইসিজি (ECG) দীর্ঘদিন ধরে একজন আয়া করছেন—এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে হাসপাতালের সেবার মান, জনবল ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বিউটি রানী দাস নামে একজন অফিস সহায়ক/আয়া দীর্ঘ প্রায় ছয়-সাত বছর ধরে রোগীদের ইসিজি করে আসছেন। এ বিষয়ে বিউটি রানী দাস নিজেও বলেন, “৬/৭ বছর যাবত আমি রোগীদের ইসিজি করে থাকি।”
ইসিজি একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা-নিরীক্ষা, যার মাধ্যমে হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। ফলে এ ধরনের পরীক্ষা প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কারিগরি কর্মীর মাধ্যমে হওয়া উচিত কি না—সেটিই এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন আয়া বা অফিস সহায়ককে দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এমন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করানোর অভিযোগ থাকলে, এর প্রশাসনিক ও কারিগরি বৈধতা কী—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
হাসপাতালে ইসিজি-সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা বিমল ভট্টাচার্য বর্তমানে তিন দিনের ছুটিতে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি ২২ আগস্ট কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে তাঁর পদবিও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
এদিকে, রোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সেবার বিপরীতে অর্থ আদায় এবং সেই অর্থের যথাযথ ভাউচার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। সেবার বিপরীতে অর্থ আদায় হলে তার প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ ও নথিভুক্ত থাকা জরুরি। এ বিষয়ে অভিযোগ বা অস্পষ্টতা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বেলা দেয়টার দিকে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য হাসপাতালে গিয়ে কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। হাসপাতালের নবযোগদান করা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাও (টিএসও) ছুটিতে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকটের বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য সহায়ক জনবলের ঘাটতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশ ও আলোচনা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি ও বিষয়টি তুলে ধরার পরও যদি প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ বা পদায়নের কার্যকর সমাধান না হয়, তাহলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে রোগীদের ওপর।
স্থানীয় বাসিন্দা ও রোগীদের কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসপাতালের পরিবেশ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, টিকিট কাউন্টার, শৌচাগারসহ বিভিন্ন সেবা নিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন। তবে এসব মন্তব্যকে অভিযোগ হিসেবে যাচাই না করে সত্য ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
হাসপাতালের মতো একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রোগী সেবা কোনো ব্যক্তিনির্ভর বা সাময়িক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে ইসিজির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর মাধ্যমে করানো হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় পদে দ্রুত জনবল নিয়োগ বা পদায়ন করাও জরুরি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যদি প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য জনবল না থাকে, তাহলে বছরের পর বছর রোগীরা নির্ভরযোগ্য সেবা পাবেন কীভাবে? আর একজন আয়া যদি দীর্ঘদিন ধরে ইসিজির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করেন, তাহলে তাঁর প্রশিক্ষণ, দায়িত্বপ্রাপ্তির আদেশ ও প্রশাসনিক অনুমোদন কী—তা কি কখনো যাচাই করা হয়েছে?
শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে তাই শুধু সাময়িক সমাধান নয়, প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন, আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকি। বহুবার আলোচনায় আসা জনবল সংকটের স্থায়ী সমাধান না হলে চিকিৎসাসেবার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে প্রকাশ করা হবে।






