কিশোরদের বিরুদ্ধে তকমা নয়, চাই দায়িত্বশীলতা
কিশোরদের বিরুদ্ধে তকমা নয়, চাই দায়িত্বশীলতা
পুলিশের অভিযান প্রয়োজন, কিন্তু অভিযানে আটক হওয়া মানেই অপরাধী নয়। কিশোরদের সুরক্ষা ও সংশোধনের পাশাপাশি সংবাদ প্রকাশেও চাই তথ্যনির্ভরতা, সংযম ও মানবিকতা।
শাহরাস্তিতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৪৫ জন কিশোরকে আটক করা হয়েছে। পরে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখা এবং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের উদ্যোগকে স্বাগত জানানো যায়। একই সঙ্গে এ ঘটনা অভিভাবকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা—সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কীভাবে সময় কাটায়, সে বিষয়ে নজর রাখা জরুরি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আটক হওয়া ৪৫ জন কিশোরই কি ‘কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য’?
কোনো স্থানে আড্ডা দেওয়া, সন্দেহের ভিত্তিতে আটক হওয়া কিংবা পুলিশের অভিযানে উপস্থিত থাকার সঙ্গে ‘কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য’ হওয়ার বিষয়টি এক নয়। কারও বিরুদ্ধে অপরাধের নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেটি তদন্ত ও প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়। সেই প্রক্রিয়ার আগেই একজন কিশোরের পরিচয়ের সঙ্গে অপরাধের তকমা জুড়ে দেওয়া কতটা দায়িত্বশীল—সেটিই ভাবার বিষয়।
এখানে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিকতার মূল শক্তি তথ্য, যাচাই ও সত্যনিষ্ঠতা। একটি সংবাদ মানুষকে সচেতন করতে পারে, অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে, প্রশাসনকে দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু একটি ভুল শব্দ একই সঙ্গে একটি কিশোর ও তার পরিবারের জন্য সামাজিক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে কিশোরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। কৈশোর ভুল-শোধরানোর বয়স। এই বয়সে কারও বিরুদ্ধে প্রকাশিত একটি অপবাদ পরবর্তী জীবনে তার শিক্ষা, সামাজিক সম্পর্ক, আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে। ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ আবার মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘদিন অনলাইনে থেকে যায়। ফলে সংবাদ প্রকাশের সময় সাংবাদিককে শুধু ‘খবরটি কতটা আকর্ষণীয়’—তা নয়, ‘এর সামাজিক পরিণতি কী হতে পারে’—সেটিও বিবেচনায় রাখতে হয়।
অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই লিখতে হবে। সন্দেহভাজনকে সন্দেহভাজন হিসেবেই উল্লেখ করতে হবে। তদন্তাধীন বিষয়কে তদন্তাধীন হিসেবেই উপস্থাপন করতে হবে। আর অপরাধ প্রমাণিত না হলে কাউকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা থেকে বিরত থাকা সংবাদমাধ্যমের নৈতিক দায়িত্ব।
একই সঙ্গে কিশোরদের পরিবারকেও দায়িত্ব নিতে হবে। সন্তানকে শুধু শাসন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার কথা শুনতে হবে, বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, তার বন্ধু ও চলাফেরা সম্পর্কে জানতে হবে। কোথাও বিচ্যুতির লক্ষণ দেখা দিলে শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর অপেক্ষা না করে শুরুতেই পাশে দাঁড়াতে হবে।
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও সংবাদমাধ্যম—সবারই নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে। পুলিশের অভিযান অপরাধ ঠেকাবে, পরিবার সন্তানকে আগলে রাখবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মূল্যবোধ গড়ে তুলবে এবং সংবাদমাধ্যম সত্য ও দায়িত্বশীল তথ্য তুলে ধরবে—এই সমন্বিত উদ্যোগই পারে একটি প্রজন্মকে ভুল পথে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে।
শাহরাস্তি থানা পুলিশের অভিযান তাই হোক অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি কিশোরদের সংশোধনের সুযোগ তৈরির একটি উদ্যোগ। আর সংবাদমাধ্যমের প্রতি প্রত্যাশা একটাই—খবর প্রকাশ হোক কঠোরভাবে সত্যের পক্ষে, কিন্তু কোনো নিরপরাধ কিশোরের ভবিষ্যৎ যেন অসতর্ক একটি শব্দে বিপন্ন না হয়।
কারণ, কলমের দায়িত্ব শুধু অপরাধের খবর দেওয়া নয়; মানুষের মর্যাদাও রক্ষা করা।





