আজ সমাজ সেবক ড. এম.এ. সাত্তারের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী (জন্ম: ১ জুন ১৯৩২ মৃত্যু : ২৬ মে ১৯৯২)
বিশেষ প্রতিনিধি : বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৃতি সন্তানদের মধ্যে একজন ছিলেন ড. এম.এ. সাত্তার। তিনি ছিলেন, বাংলাদেশ গনশিক্ষা সমিতি, বেসরকারি সংস্থা বেইস এর প্রতিষ্ঠাতা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব(সিএসপি), বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, বাংলাদেশে নারী শিক্ষার অগ্রদূত, বর্তমানে নারী শিক্ষা বিস্তারে চলমান উপবৃত্তি প্রকল্পের প্রবক্তা, মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষার রুপকার এবং বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক।
তিনি ১৯৯২ সালের মে মাসের চতুর্থ সপ্তাহে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত পরিবার পরিকল্পনা সহ বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা আইকমের মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরস্থ আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান হিসেবে যোগদান করতে যান এবং মে মাসের ২৬ তারিখে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারনে মৃত্যুবরণ করেন । তাঁর মৃত্যুটি অনেকে রহস্যবৃত মনে করেন।
ড. এম.এ. সাত্তার ১৯৩২ সালের ১ জুন তৎকালীন বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার বর্তমান চাঁদপুর(পরে মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত) জেলাধীন শাহারাস্তি পৌরসভা ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নাওড়া গ্রামের ঐতিহাসিক পাটওয়ারী বাড়িতে (এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম আজিজুর রহমান পাটওয়ারী (আজিজ খলিফা) ও মায়ের নাম করফুলেন্নেছা। বাবা আজিজুর রহমান পাটওয়ারী ছিলেন দিব্য জ্ঞানে সমৃদ্ধ এবং মা ছিলেন একজন বিদ্যুৎসাহী মহিলা।
ড.এম.এ. সাত্তার শাহারাস্তির নিউ স্কিম হাই মাদ্রাসায় (বর্তমানে শাহারাস্তি সরকারি বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয়) অধ্যয়ন করেন এবং জুনিয়র বৃত্তি লাভ করেন। তারপর তিনি চট্টগ্রামে হাই মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং ঐ মাদ্রাসা হতে ১৯৫১ সালে প্রথম স্থান অধিকার করে মেট্রিক পাস করেন।
তিনি ১৯৫৩ সালে ঢাকা কলেজ থেকে বোর্ডের মেধা তালিকায় সপ্তম স্থান অধিকার করে আইএ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৬ সালে তিনি অর্থনীতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি লোক প্রশাসনে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন এবং একই সাথে সিএসপি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সারা পাকিস্তানে প্রথম স্থান অধিকার করে লাহোর সিভিল সার্ভিস ট্রেনিং একাডেমিতে যোগদান করেন।
দীর্ঘ এক বছর ট্রেনিং শেষে তিনি যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোক প্রশাসনে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন ।
১৯৬০ সালে সিএসপি অফিসার হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁর প্রথম কর্মস্থল ছিল বৃহত্তর সিলেট জেলার মৌলভীবাজার মহকুমা প্রশাসক হিসেবে। অতঃপর তিনি রংপুর নারায়ণগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারের হয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬২ সালে ব্রিটিশ নাগরিক ড. এলেন মেরি হেরিংটনের সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন । বিয়ের পূর্বে তিনি বিলেতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহনকালে মেরির সাথে পরিচিত হন, পরিচয় থেকে পরবর্তীতে বেশ কয়েক বছর মেরির সাথে প্রেম করেন। অতঃপর তিনি নারায়নগঞ্জ মহাকুমা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি মেরিকে বিয়ে করেন। তাঁর বিয়ে পড়ান জ্ঞান তাপস ড. মোঃ শহীদ উল্লাহ। তার বিয়ে হয় ইসলামী রীতিনীতি মেনে কিন্তু আংটি বদল হয় খ্রিস্টান ধর্মীয় রীতিতে।
ড. সাত্তার ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়াম কলেজ থেকে ডেভলপমেন্ট ইকনমিক্সে এম এ ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন ।
১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করায় পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি হন তিনি।
ড. সাত্তার ব্যক্তি জীবনে চার জন পুত্র সন্তানের জনক ।
তারা সবাই সুশিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত, বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তার ৪ ছেলেই বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তারা কেউ বাংলাদেশে বসবাস করেন না।
আজ ২৬ মে ড.এম.এ সাত্তারের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় তার নিজ গ্রামে ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হবে। তন্মধ্যে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান বেইস এর প্রধান কার্যালয়ে বেলা ৩ ঘটিকায় কোরআন খতম, মিলাদ ও দোয়া এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেইস -এর বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার শাখা সমূহে, গনবিদ্যালয় গুলোতে কোরআন খতম, মিলাদ ও দোয়া এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। মরহুমের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের শাহরাস্তি পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের নাওড়া গ্রামে তাঁর সমাধীস্থলে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে অন্যান্য কর্মসূচির পাশাপাশি কবর জিয়ারত ও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করবেন তার মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত করফুল্লেরনেছা মহিলা কলেজ,বেইস এবং গনবিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে।
ড. সাত্তারের অবদানের ফলশ্রুতিতে চাঁদপুরের শাহারাস্তি উপজেলার শিক্ষার হার ৯৬% ভাগে উন্নীত হয়েছে । তাঁর নাম চাঁদপুরের শাহরাস্তি তথা সারা দেশবাসীর হৃদয়ে চিরদিন অমলিন হয়ে থাকবে।
আমরা জাতির এই সূর্যসন্তানকে তাঁর ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে স্বরণ করি।






