ইসলামি ভাবধারা থেকে যেভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়েছিলেন বদরুদ্দীন উমর

ইসলামি ভাবধারা থেকে যেভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়েছিলেন বদরুদ্দীন উমর

ইসলামি ভাবধারা থেকে যেভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়েছিলেন বদরুদ্দীন উমর

(২০ ডিসেম্বর ১৯৩১ – ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫)

লেখক, গবেষক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর মারা গেছেন। রবিবার সকালে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় আক্রান্ত ছিলেন বদরুদ্দীন উমর।
গত দুই মাসে দুই দফায় শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে তাকে হাসাপতালে ভর্তি করা হয়েছিলো বলে তার ঘনিষ্টজনেরা জানিয়েছেন।

জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ফয়জুল হাকিম বিবিসিকে বাংলাকে বলেন, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেয়া হয়েছিলো। সুস্থ হওয়ার পর তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।

অগাস্ট মাসের শেষদিকে তিনি আবারও অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে আরেক দফা হাসপাতালে নেয়া হয়।

বদরুদ্দীন মোহাম্মদ উমর (২০ ডিসেম্বর ১৯৩১ – ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫) ছিলেন একজন বাংলাদেশি লেখক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিবিদ। তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) -এর নেতা। ২০২৫ সালে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন কিন্তু তিনি তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।

ব্যক্তিগত বিবরণ :-

জন্ম বদরুদ্দীন উমর এর জন্ম ২০ ডিসেম্বর ১৯৩১ সালে
বর্ধমান, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত তিনি ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ (বয়স ৯৩ বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী ছিলেন। তার ২ মেয়ে ও ২ ছেলে রয়েছে। তার পিতার নাম আবুল হাশিম।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, অধ্যাপক, লেখক, ইতিহাসবিদ। এবছর তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার স্বাধীনতা পদকে (২০২৫ সালে) ভূষিত হন।

তিনি ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বর্ধমান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ভারতীয় উপমহাদেশের একজন মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ আবুল হাশিম ও মাতার নাম মাহমুদা আখতার মেহেরবানু বেগম। যদিও তার পিতা আবুল হাশিম একজন সাম্যবাদী পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধী ছিলেন, তথাপি তিনি পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৯৫০ সাল থেকে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। উমর ১৯৪৮ সালে বর্ধমান টাউন স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৫০ সালে তিনি বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৩ সালে স্নাতক সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন। দর্শন বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৫৫ সালে। ১৯৬১ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিলোসফি, পলিটিক্স অ্যান্ড ইকোনমিক্স (পিপিই) ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবন:-

প্রথমে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে। বদরুদ্দীন উমর ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের যাত্রা শুরু হয় তারই হাত ধরে এবং ১৯৬৮ সালে পদত্যাগ করেন।

তিনি বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী ছিলেন। তিনি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ‘সংস্কৃতি’ নামে একটি রাজনৈতিক সাময়িকী সম্পাদনা করেছেন। তিনি ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন। তাকে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ১৯৭৬ সালের মাঝামঝি অনুষ্ঠেয় বিশেষ কংগ্রেসের প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন এবং সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

তার প্রকাশিত প্রবন্ধ-গবেষণা সমূহ :-

সাম্প্রদায়িকতা (১৯৬৬)
সংস্কৃতির সংকট (১৯৬৭)
সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা (১৯৬৮)
পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি (১ম খণ্ড ১৯৭০, ২য় খণ্ড ১৯৭৬ ও ৩য় খণ্ড ১৯৮১)
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক (১৯৭২)
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালী সমাজ (১৯৭৩)
বাঙলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা (১৯৭৪)
যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ (১৯৭৪)
যুদ্ধ পূর্ব বাঙলাদেশ (১৯৭৬)
ভাষা আন্দোলন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (১৯৮০)
বাঙলাদেশে মার্কসবাদ (১৯৮১)
আমাদের ভাষার লড়াই, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ (১৯৮১)
বাঙলাদেশে বুর্জোয়া রাজনীতির চালচিত্র (১৯৮২)
ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন (১৯৮৪)
মার্কসীয় দর্শন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (১৯৮৬)
বাঙলাদেশের কৃষক ও কৃষক আন্দোলন (১৯৮৬)
বাঙলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কয়েকটি দিক (১৯৮৭)
বাঙলাদেশে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের ধারা (১৯৮৭)
বাঙলাদেশে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার (১৯৮৯)
বাঙলাদেশের মধ্যবিত্ত ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি (১৯৮৯)
সামরিক শাসন ও বাঙলাদেশের রাজনীতি (১৯৮৯)
পশ্চাৎপদ দেশে গণতন্ত্রের সমস্যা (১৯৯০)
বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লব (১৯৯০)
বামপন্থী মহলে অনৈক্য ও গণতান্ত্রিক ঐক্য প্রসঙ্গে (১৯৯১)
নববই-এর নাগরিক বুর্জোয়া অভ্যুত্থান ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (১৯৯২)
প্রতিবিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ (১৯৯২)
গণআদালত-একাত্তরের অসমাপ্ত মুক্তি সংগ্রামের জের (১৯৯২)
নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ (১৯৯৩)
ধর্ম, রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতা (কলকাতা, ১৯৯৩)
ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে (১৯৯৪)
মুক্তি কোন পথে? (১৯৯৪)
বাঙলাদেশে গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র (১৯৯৪)
বাঙলাদেশের আর্থ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি (১৯৯৪)
বাঙলাদেশে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য (১৯৯৪)
সাম্রাজ্যবাদের নতুন বিশ্বব্যবস্থা (১৯৯৫)
জনগণের হাতে ক্ষমতা-নির্বাচন না অভ্যুত্থান? (১৯৯৬)
আমাদের সময়কার জীবন (১৯৯৬)
নির্বাচিত বক্ততা (১৯৯৬)
বাঙলাদেশে বুর্জোয়া রাজনীতির দুইরূপ (১৯৯৭)
বাঙলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি (১৯৯৭)
বিবিধ প্রসঙ্গ (১৯৯৮)
সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্ব পরিস্থিতি (১৯৯৮)
দ্বিতীয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাঙলাদেশ (১৯৯৯)
বাঙলাদেশের বামপন্থীরা; একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধে কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক ভুমিকা (২০০০)
নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০০০)
একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের পথে (২০০০)
সাক্ষাৎকার (২০০১)
বাঙলাদেশে ফ্যাসীবাদ (২০০১)
শিক্ষা ও শিক্ষা আন্দোলন (২০০১)
জনগণের সংগ্রামের পথ (২০০২)
বাঙলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র (২০০৩)
সংসদীয় রাজনীতি, জাতীয় সংসদ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (২০০৩)
আমার জীবন (২০০৪)
প্যালেস্টাইন, আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ (২০০৪)
আমার পিতা (২০০৫)
বাঙলাদেশে ইতিহাস চর্চা (২০০৬)
শতাব্দীর শুরুতে বাঙলাদেশের চিত্র (২০০৬)
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধের জয়-পরাজয় (২০০৬)
দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ (২০০৬)
বাঙলাদেশের অভ্যুদয় (১ম খন্ড ২০০৬)
কার দিন বদল হলো (২০১০)[৭]

ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থ

Politics and Society in East Pakistan and Bangladesh [পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ] (১৯৭৩)
Society and Politics in Pakistan [পাকিস্তানের সমাজ ও রাজনীতি] (কলকাতা, ১৯৮০)
Politics and Society in Bangladesh [বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ] (১৯৮৭)
Towards the Emergency in Bangladesh [বাংলাদেশে জরুরি অবস্থার দিকে] (১৯৮০)
Imperialism and General Crisis of the Bourgeoise in Bangladesh [বাংলাদেশে বুর্জোয়াদের সাম্রাজ্যবাদ ও সাধারণ সংকট] (১৯৮৬)
Language Movement in East Bengal [পূর্ব বাংলায় ভাষা আন্দোলন] (২০০১)
Emergence of Bangladesh: Class Struggles in East Pakistan (1947-1958) [বাংলাদেশের উত্থান], অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান (২০০৪)।‌ উল্লেখ্য, এটির প্রথম মুদ্রণ দ্রুতই নিঃশেষিত হলে দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়।[৮]কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, নয়া দিল্লি (২০১৭); বাঙ্গালা গবেষণা (২০২০)।
Emergence of Bangladesh: Rise of Bengali Nationalism (1958-1971), অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান (২০০৬)[৪]। পাকিস্তান সরকার ও সামরিক মহলের চাপে পড়ে গ্রন্থটির প্রকাশনা প্রকাশক অবিরত রাখতে পারে নি।[৮] বাঙ্গালা গবেষণা (২০২০)।

সম্পাদনা :-

সুকান্ত সমগ্র (১৯৭০)
ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ : কতিপয় দলিল (১ম খন্ড ১৯৮৪ এবং ২য় খন্ড ১৯৮৫)
স্ট্যালিন প্রসঙ্গ (১৯৯০)
পার্বত্য চট্টগ্রাম : নিপীড়ন ও সংগ্রাম (১৯৯৭)
নারী প্রশ্ন প্রসঙ্গে (২০০৩)

১৯৭২ সালে বদরুদ্দীন উমর বাংলা একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন, তবে তিনি তা সাথে সাথেই প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার পান এবং প্রত্যাখ্যান করেন। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ সরকার বদরুদ্দীন উমরকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে।[৯] কিন্তু বদরুদ্দীন উমর তা প্রত্যাখান করেন। এ নিয়ে তিনি বলেন-“১৯৭৩ সাল থেকে আমাকে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা থেকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। আমি সেগুলোর কোনোটি গ্রহণ করিনি। এখন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমাকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করেছে। এ জন্য তাদের ধন্যবাদ। কিন্তু তাদের দেওয়া এই পুরস্কারও গ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এই প্রেস বিবৃতির মাধ্যমে আমি এটা জানিয়ে দিচ্ছি।”

ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি :-

বদরুদ্দীন ওমর ২০২১ সালে বাংলাদেশের ‘দেশ টিভি’তে আসাদুজ্জামান নূর উপস্থাপিত একটি সাক্ষাৎকারে বলেন তিনি আল্লাহর উপর আস্থা হারিয়েছেন। ঐ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মানুষের এত যে দুঃখ দুর্দশা… এই যে বলা হচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া একটা গাছের পাতাও নড়ে না ইত্যাদি। তা এখন আল্লাহর গুণ হিসেবে যা বলা হয় তিনি অত্যন্ত দয়ালু, সবজান্তা, সর্বক্ষমতাময়… এইরকম গুণসম্পন্ন অস্তিত্ব দিয়ে দুনিয়ার বিষয়টা ব্যাখ্যা করা যায় না। মানুষ যে এত দুঃখ দুর্দশার মধ্যে আছে… অনেকে বলেন আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন। আল্লাহর এই পরীক্ষা করার তো কোন দরকার ছিল না! তিনি মজা করার জন্য মানুষকে এই দুর্দশার মাঝে ফেলছেন? এটার কি কারণ? একজন মা হাসপাতালে ঢুকেছেন বাচ্চাকে বাইরে রেখে, এসে দেখলেন বাচ্চা মারা গিয়েছে। এখানে বাচ্চাটাকে মেরে কী পরীক্ষা করলেন, কী খেলা করলেন? … পরীক্ষা যত হচ্ছে গরীবের উপর দিয়েই হচ্ছে। আমি ওখানে বলেছি আল্লাহ বড়লোকদের যা দেয়ার তা ইহলোকেই দেন, আর গরীবদের যা দেয়ার তা বাকির খাতায় রেখে দেন…

মৃত্যু :-

দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানান জটিলতায় আক্রান্ত বদরুদ্দীন উমর ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে মৃত্যুবরণ করেন।

তথ্যসূত্র :-

“বড় পটভূমির মধ্যে ভাষা আন্দোলনকে ধরতে চেয়েছিলাম”। প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯।
“সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি”। ১০ আগস্ট ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২১ জানুয়ারি ২০১১।
প্রতিবেদক, বিশেষ (৬ মার্চ ২০২৫)। “স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করবেন না বদরুদ্দীন উমর”। দৈনিক প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ১ আগস্ট ২০২৫।
“সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি”। ২৪ আগস্ট ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২১ জানুয়ারি ২০১১।
জয়নাল আবেদীন, উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদী ও বামধারার রাজনীতি প্রেক্ষিত বাংলাদেশ; বাংলাপ্রকাশ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০১৩, পৃষ্ঠা-৩৯৪।
হক, মনজুরুল (ফেব্রুয়ারি ২০১৮)। “প্রথম অধ্যায়”। পূর্ব বাংলার সাত দশকের কমিউনিস্ট রাজনীতি (১ সংস্করণ)। ঢাকা: ঐতিহ্য। পৃ. ১০৭। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৮৪৭৭৬৪১৮৭। {{বই উদ্ধৃতি}}: |আইএসবিন= মান: চেকসাম পরীক্ষা করুন (সাহায্য); |সংগ্রহের-তারিখ= এর জন্য |ইউআরএল= প্রয়োজন (সাহায্য)
“সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি”। ৬ মার্চ ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২১ জানুয়ারি ২০১১।
উমর, বদরুদ্দীন (ডিসেম্বর ২০১৪)। “১৯৭১ সালের যুদ্ধ শুরুর মুহূর্তে: সামরিক অভিযান- অপারেশন সার্চলাইট”। সংস্কৃতি।
“এবার স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন ৮ জন”। দৈনিক প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ৭ মার্চ ২০২৫।
“স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করবেন না বদরুদ্দীন উমর”। দৈনিক প্রথম আলো। ৬ মার্চ ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ৭ মার্চ ২০২৫।
“বেলা অবেলা সারাবেলা / বদরুদ্দীন উমর এবং আসাদুজ্জামান নূর। DeshTv (29:40 minutes)”। YouTube। ১৯ নভেম্বর ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ৭ এপ্রিল ২০২৪।
bdnews24.com। “বদরুদ্দীন উমরের চিরবিদায়”। বদরুদ্দীন উমরের চিরবিদায় (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫।

বহিঃসংযোগ :-

উইকিমিডিয়া কমন্সে বদরুদ্দীন উমর সংক্রান্ত মিডিয়া রয়েছে।
উইকিউক্তিতে বদরুদ্দীন উমর সম্পর্কিত উক্তির সংকলন রয়েছে।

উক্তি সমূহ :-

মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা স্টুপিডিটি ছাড়া আর কিছু না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে অস্বীকার করা সম্ভব? যা ঘটে গেছে তাকে কোনোভাবে অস্বীকার করা সম্ভব না।
৯৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ভিউজ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নেওয়া সাক্ষাৎকারে।
যুক্ত বাংলার পক্ষে আন্দোলন হলে, সেটা সফল হতো। কিন্তু সেই সময়টা ইংরেজরা দেয়নি। ১৯৪৭-এর ফেব্রুয়ারি মাসে এলেন মাউন্টব্যাটেন। আর ৩ জুনের মধ্যে সবকিছু ঠিক হয়ে গেল। কাউকে তো চিন্তা করার সময় দেওয়া হলো না। হুড়মুড় করে সব হয়ে গেল। মিছিল–আন্দোলনের সুযোগ থাকলে দেশভাগ হতো না।
৯০তম জন্মবার্ষিকীতে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে।

ভারত ভাগ জিন্নাহ করেননি। ভারত ভাগ করেছে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা। ভারতের সব গ্রহণযোগ্য ইতিহাস এটা এখন স্বীকার করে। দ্বিজাতিতত্ত্ব এসেছে উনিশ শতকে, হিন্দু মেলার মাধ্যমে। নবকুমার মিত্র, রাজ নারায়ণ রায় এর প্রবক্তা। মুসলমানরা পিছিয়ে, এখন তাঁরা যদি হিন্দুদের ধরে ফেলে—সেই চিন্তা থেকেই এই দ্বিজাতিতত্ত্ব। আমি সম্প্রতি একটা লেখায় লিখেছি, হিন্দুদের দ্বিজাতিতত্ত্ব ছিল অফেনসিভ। আর মুসলমানদের যে দ্বিজাতিতত্ত্ব, সেটা ডিফেন্সিভ। গান্ধী, নেহরু, প্যাটেল দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারক। সে কারণেই ভারত ভাগের পর মাউন্টব্যাটেনকে ভারতের গভর্নর জেনারেল করা হয়েছিল। এর থেকে বড় কেলেঙ্কারি কি হতে পারে।
৯০তম জন্মবার্ষিকীতে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে।

আমি যে ধর্মের উপর আস্থা হারালাম, ঈশ্বরের উপর, আল্লাহর উপর যে বিশ্বাসটা হারালাম এটা কোনো তত্ত্বগত চিন্তা থেকে না। এই যে মানুষের এত দুঃখ দুর্দশা… এদিকে আবার বলা হচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া একটা গাছের পাতাও নড়ে না ইত্যাদি। তা এখন আল্লাহর গুণ হিসেবে যা বলা হয় তিনি অত্যন্ত দয়ালু, সবজান্তা, সর্বক্ষমতাময়… এই তিনটি গুণ যদি একজনের থাকে তাহলে দুনিয়ার এই জিনিসটা ব্যাখ্যা করা যায় না। মানুষ যে এত দুঃখ দুর্দশার মধ্যে আছে… অনেকে বলেন আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন। আল্লাহর এই পরীক্ষা করার তো কোন দরকার ছিল না! তিনি মজা করার জন্য মানুষকে এই দুর্দশার মাঝে ফেলছেন এটার কী কারণ থাকতে পারে? ধরেন একজন মা তার বাচ্চাকে বাইরে রেখে হাসপাতালে গেছেন চিকিৎসা করার জন্য, এসে দেখলেন তার বাচ্চা মারা গিয়েছে। আল্লাহর যদি এই তিনটা গুণ থাকে তাহলে তিনি বাচ্চাটাকে মেরে কী পরীক্ষা করলেন, কী খেলা করলেন? আর পরীক্ষা যত হচ্ছে গরীবের উপর দিয়েই হচ্ছে। আল্লাহ বড়লোকদের যা দেয়ার তা ইহলোকেই দেন, আর গরীবদের যা দেয়ার তা বাকির খাতায় রেখে দেন। আমার এই চিন্তা থেকেই ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছি।
২০২১ সালে দেশ টিভি এন্টারটেইনমেন্ট এ আসাদুজ্জামান নূর উপস্থাপিত একটি সাক্ষাৎকারে বদরুদ্দীন উমর এই কথা বলেন।

তথ্য সূত্র : উইকিপিডিয়া

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

ইসলামি ভাবধারা থেকে যেভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়েছিলেন বদরুদ্দীন উমর

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল থেকে স্বীকৃতির মঞ্চে; ২০১৩ সাল থেকে শিক্ষকতা, আনন্দঘন পাঠদান ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থা

নিজস্ব প্রতিনিধি : একটি গান, একটি রিল ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও ট্রল। ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল ভার্চুয়াল জগতে। নানা মন্তব্য আর সমালোচনার মধ্যে একসময় ভিডিওটি সরিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই বিতর্কের কয়েক মাস পরই সামনে এলো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের আরেকটি পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাকে পেছনে ফেলে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিউটি রানী পাল।

তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে চারজনকে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁদের একজন বিউটি রানী পাল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর স্বাক্ষর করা একটি স্মারকের মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষকদের নাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও সেখানে বিউটি রানী পালের নাম ছিল না।

যে রিল ঘিরে আলোচনাঃ

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ‘ডিফরেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় একটি গানের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি রানী পাল। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’—গানের এই অংশ ব্যবহারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটির সঙ্গে নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে তা প্রচার করা হলে তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও ট্রল। সাইবার বুলিংয়ের মুখে একপর্যায়ে ভিডিওটি সরিয়ে নেন তিনি।

তবে ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল একজন শিক্ষককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকার শত শত নারী শিক্ষক একই গানের সঙ্গে নিজেদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। শিক্ষক সমাজের এমন অভিনব প্রতিবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সংহতি প্রকাশ করেন।

ফলে একটি ব্যক্তিগত রিল ভিডিওকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনা পরিণত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী শিক্ষকদের প্রতি আচরণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অনলাইন হয়রানি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায়।

বিতর্কের বাইরে অন্য এক পরিচয়ঃ

তবে বিউটি রানী পালের শিক্ষকতা জীবনের গল্প শুরু হয়নি ওই রিল ভিডিও দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত তিনি। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সৃজনশীল নানা কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন তিনি। আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শরীরচর্চা এবং নাচের ছন্দে পড়াশোনাকে সহজ করে তোলার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এসব উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এর আগেও তিনি একবার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো জেলা পর্যায়ের এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বনাম শ্রেণিকক্ষঃ

বিউটি রানী পালের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। অনলাইনে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও যেমন দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তেমনি সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মন্তব্য বা প্রচারণাও মুহূর্তে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে একজন শিক্ষকের প্রকৃত কাজের পরিধি অনেক দীর্ঘ। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, তাদের আগ্রহ তৈরি করা, শেখার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার মূল্যায়ন একটি রিল ভিডিওর কয়েক মিনিটের দৃশ্য দিয়ে করা সম্ভব নয়।

বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা তাঁকে আলোচনায় এনেছিল। কিন্তু জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের কাজ ও অবদানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্বীকৃতি কি বদলে দেয় আলোচনার ভাষা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ দ্রুত মতামত দেয়। সেখানে প্রেক্ষাপট, দীর্ঘমেয়াদি কাজ কিংবা একজন ব্যক্তির সামগ্রিক পরিচয় অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। বিউটি রানী পালের ঘটনাতেও প্রথমে সামনে এসেছিল একটি রিল ভিডিও। পরে সামনে এসেছে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পাঠদানের বিষয়টি।

জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার তথ্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই ব্যক্তিকে ঘিরে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর পেশাগত কাজের স্বীকৃতিও রয়েছে—দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে।

শিক্ষকের পরিচয় শ্রেণিকক্ষেইঃ

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর শ্রেণিকক্ষের কাজ—শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বাইরে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের এই দিকটিই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার।

একটি রিল তাঁকে পরিচিত করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; আর শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ তাঁকে এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিউটি রানী পালের গল্পটি যেন মনে করিয়ে দেয়—ভার্চুয়াল জগতের কয়েক মুহূর্তের আলোচনার চেয়ে একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের কাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

ইসলামি ভাবধারা থেকে যেভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়েছিলেন বদরুদ্দীন উমর

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ অনুদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা এবং অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এ অনুদান দেওয়া হবে।

এবার অনলাইনের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির মাধ্যমে সুপারিশকৃত আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে পৌঁছাতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিচালন বাজেটের আওতায় বিশেষ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থ বিতরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাইগভ প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত, দুর্গম, উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকার অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যে খাতে দেওয়া হবে অনুদান:

বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মেরামত ও সংস্কার, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা, প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা এবং পাঠাগার উন্নয়নে বিশেষ অনুদান দেওয়া হবে।

এ ছাড়া বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনাজনিত কারণে আর্থিক সহায়তার জন্যও আবেদন করা যাবে।

অগ্রাধিকার পাবেন যেসব শিক্ষার্থীঃ

সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনায় আক্রান্ত, দুস্থ, মেধাবী, এতিম, অদম্য মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অসহায় ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন।

দেশের উপকূলীয়, চরাঞ্চল, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদেরও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যেভাবে করতে হবে আবেদনঃ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। আর স্নাতক বা সমমান এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে জমা দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রার আবেদনগুলো গ্রহণ করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে একত্র করবেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।

অনলাইন ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাতে দ্বৈতভাবে সুপারিশ না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ জন্য জেলা কমিটি আগে অনলাইনে সুপারিশ করা তালিকার সঙ্গে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাওয়া আবেদনসমূহ সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে।

নির্ধারিত আবেদন ফরম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট www.shed.gov.bd-এ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

সময়সীমা ১৫ অক্টোবরঃ

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাওয়া আবেদন জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবে। সুপারিশকৃত তালিকা আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর পৌঁছাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া কোনো আবেদন বিবেচনা করা হবে না।

শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা যেন কেবল শহর কিংবা সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে সরকারি সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

ইসলামি ভাবধারা থেকে যেভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়েছিলেন বদরুদ্দীন উমর

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

—— মানিক লাল ঘোষ ——
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে কজন বিপ্লবীর নাম সাহস, আত্মত্যাগ ও দুর্জয় প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নারী ছিলেন না; ছিলেন এমন এক সময়ের অদম্য কণ্ঠ, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নারীর জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ ছিল নানা বাধায় পরিপূর্ণ। মাত্র ২১ বছরের জীবনে প্রীতিলতা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয়।
২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর শহীদ হওয়ার দিন। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে—যিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভায় চাকরি করতেন এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন গৃহিণী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও মননশীল।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই অসাধারণ সাফল্য প্রমাণ করে, প্রীতিলতা কেবল সাহসী বিপ্লবীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গভীর মননশীল ও মেধাবী নারীও।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। নন্দনকানন অপরনাচরণ স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন এবং পরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বও পালন করেন। একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশাজীবন তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দেশের পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং বৈষম্যের বাস্তবতা তাঁকে অন্য এক পথে টেনে নেয়।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রীতিলতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় পড়াশোনার সময় তিনি দীপালি সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন—যে সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের শারীরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান সংগঠক মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ তখন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু প্রীতিলতা ধীরে ধীরে সংগঠনের আস্থা অর্জন করেন। গোপন যোগাযোগ, বিপ্লবীদের সহায়তা, সংবাদ ও প্রচারপত্র পৌঁছে দেওয়া, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তিনি অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন সহযোগী নন, গুরুত্বপূর্ণ একজন সংগঠক ও নেতৃত্বদানের যোগ্য বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩২ সালে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলন তখন চট্টগ্রামে তীব্রতর। এরই মধ্যে পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থায় ক্লাবটি ছিল ইউরোপীয়দের সামাজিক আধিপত্য ও বর্ণবৈষম্যের একটি প্রতীক। ক্লাবটির প্রবেশপথে থাকা ‘Dogs and Indians not allowed’ ধরনের বর্ণবাদী বার্তা ভারতীয়দের প্রতি ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার নির্মম প্রকাশ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এই ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতার ওপর অর্পিত হয়। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে, যা ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহর পর্যন্ত গড়ায়, তিনি বিপ্লবীদের একটি দল নিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করেন। পুরুষের ছদ্মবেশে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবীরা ক্লাবে হামলা চালায় এবং ভবনের অংশবিশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন এবং একপর্যায়ে তিনি বিচ্ছিন্ন ও ঘেরাও হয়ে পড়েন।
প্রীতিলতা জানতেন, ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে। বিপ্লবীদের মধ্যে বন্দিত্ব এড়ানোর জন্য সায়ানাইড বহনের পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তী ময়নাতদন্তে জানা যায়, গুলির আঘাতটি প্রাণঘাতী ছিল না; সায়ানাইড বিষক্রিয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।
প্রীতিলতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি জীবন থেমে গেলেও তাঁর আদর্শ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস থেমে যায়নি। তিনি হয়ে উঠলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক। সমকালীন ও পরবর্তী ইতিহাসচর্চায় তাঁকে বাংলার প্রথম নারী শহীদদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
প্রীতিলতার জীবনকে শুধু তাঁর মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে বিচার করলে তাঁর সংগ্রামের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। একজন মেধাবী ছাত্রী থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে বিপ্লবী সংগঠক এবং শেষ পর্যন্ত একটি সশস্ত্র অভিযানের নেত্রী—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাই তাঁর জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য।
আজকের দিনে প্রীতিলতাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই মূল্যবোধগুলো একজন মানুষকে ইতিহাসের অংশ করে তুলতে পারে। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর তাঁর স্মৃতি অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন অগ্নিঝরা এক জীবন, যার দীপ্তি মাত্র ২১ বছরের আয়ুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে।
শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)