টিম টিম করে জ্বলছে পাথৈর ইসলামীয়া দাখিল মাদরাসার শিক্ষা কার্যক্রম

টিম টিম করে জ্বলছে পাথৈর ইসলামীয়া দাখিল মাদরাসার শিক্ষা কার্যক্রম

টিম টিম করে জ্বলছে পাথৈর ইসলামীয়া দাখিল মাদরাসার শিক্ষা কার্যক্রম

মোঃ রুহুল আমিন, বিশেষ প্রতিনিধি : ভাদ্রের আকাশে মেঘের আনাগোনা। চারিদিকে আলো আন্ধারের খেলা। প্রকৃতি যেন কাঁদছে। যেন কোন করুণ গল্প বলতে চায় প্রকৃতি তার আপনজনকে। এমনই অবস্থায় একটি দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গল্পের মাঝে আমরা যেন হাবুডুবু খাচ্ছি। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গল্প শুনে যেকারো চোখ ছানাবড়া হবে নিশ্চয়ই। দেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক পরের বছর ১৯৭২ সালের পহেলা জানুয়ারি এই প্রতিষ্ঠানটির জন্ম। স্বাধীনতার ৫৩ বছর শেষে যেন প্রতিষ্ঠানটি তার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে অভিশাপ দিচ্ছে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদেরকে!

১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পশ্চিম ইউনিয়নের(তৎকালীন হাজীগঞ্জ থানার এবং কুমিল্লা জেলার অন্তর্গত) পাথৈর গ্ৰামের মাঝামাঝি উপজেলার মধ্যদিয়ে বহমান একমাত্র নদী ডাকাতিয়ার দক্ষিণ পাড়ের ৩০০ গজের মধ্যে ৩ একর ৭২ শতক জায়গায় স্থাপিত হয় ‘পাথৈর ইসলামীয়া দাখিল মাদরাসা’। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা হিসেবে তৎকালীন সময়ে অনেকের মধ্যে অন্যতম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, মাওলানা আলী আকবর এবং প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নির্বাহ করেন, মাওলানা এমদাদুল হক।

এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এলাকায় একটি মহল উক্ত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির জায়গা নিজেদের দখলে নিতে উঠে পড়ে লাগেন। তৎকালীন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায়‌ উদ্যক্তাগন প্রতিষ্ঠানটি ভালোভাবে পরিচালনায় মাদ্রাসার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। শুরু থেকে তাদের শক্ত অবস্থানের কারণে কায়েমী স্বার্থবাদীদের অভিলাষ ভেস্তে যায়। দীর্ঘ বছর নিম্ন আদালত উচ্চ আদালতে মামলা চলে। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালত থেকে মাদ্রাসার পক্ষে রায় আসে। বলা যায় একের পর এক মামলার ঘানি টানতে টানতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির পাঠদানে আশাতীত সাফল্যে বিঘ্ন ঘটে।

মাদ্রাসার বর্তমান সুপার মোঃ আব্দুর রহিম বলেন, ১৯৭২ সালে গোড়ার দিকে অত্র এলাকার কতিপয় শিক্ষানুরাগী বিদগ্ধ ব্যক্তিবর্গ এলাকার ছেলে-মেয়েদের শিক্ষাগ্ৰহনের সুবিধার্থে পাথৈর ইসলামীয়া দাখিল মাদরাসাটি স্থাপন করেন। শুরুতেই মাদ্রাসাটির জায়গার উপর কুনজর নজর পড়ে একটি মহলের। তারা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বহু ষড়যন্ত্র করেন। তারা মাদ্রাসাটির জায়গার মালিকানা দাবি করে একের পর এক মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলা দায়ের করেন। বহু বছর মামলাগুলো কঠোর হস্তে মোকাবিলা করেন এলাকার বিদুৎসাহী বিশিষ্ট জনেরা। শেষ পর্যন্ত সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নিম্ন আদালত ও হাইকোর্ট মাদ্রাসার পক্ষে রায় দেন ২০২৫ সালের গোড়ার দিকে। এসময়ে মামলা মোকদ্দমার পিছনে সময় দিতে গিয়ে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় প্রভাব পড়ে। যার ফলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে অনেকটাই ব্যর্থ হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এসময় অত্র প্রতিষ্ঠানের নামে নতুন ভবন নির্মাণে অর্থ মঞ্জুর হলেও মিথ্যা মামলা মোকদ্দমা থাকায় মঞ্জুর হওয়া অর্থ ভবন নির্মাণ না করে ফেরৎ যায়। তবে এখন আর মাদ্রাসার বিরুদ্ধে কোন মামলা মোকদ্দমা নেই। এখন সময় এসেছে শুধু সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার।

মাদ্রাসাটিতে বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩১৫ জন। কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা ১১ জন আর শিক্ষকের শূন্য পদের সংখ্যা ৯টি, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংখ্যা ৫ জন।

অত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠাকালে এলাকার জনসংখ্যা ছিল অনেক কম। ঐ সময় মাদ্রাসাটির মাঠের মাঝামাঝি দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে মাদ্রাসার সীমানা ঘেঁষে উত্তর পাশে নির্ধারিত রাস্তা থাকা সত্ত্বেও মাঝমাঠ দিয়ে এলাকার মানুষ যাতায়াত করতো। সময়ের ব্যবধানে দীর্ঘ ৫৩ বছর শেষে আজ এলাকার জনসংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। এখনও এই প্রতিষ্ঠানটির মাঝখান দিয়ে এলাকার মানুষ পূর্বের ন্যায় যাতায়াত করে। যার ফলে শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের খেলাধুলায় অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। তাই মাদ্রাসার উত্তর পাশদিয়ে যাতায়াতের রাস্তাটি এলাকার মানুষের চলাচলের জন্য সংস্কার করা সহ অনতিবিলম্বে মাদ্রাসার বাউন্ডারি ওয়ালটি নির্মাণ করা জরুরি প্রয়োজন।

এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠার পর মাদ্রাসা ক্যাম্পাসের উত্তর প্রান্তে শ্রেণি কক্ষ হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রথমে ২টি টিনের ঘরের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। মাঠের দক্ষিণ প্রান্তে ২টি ছোট পুরানো টিনের ঘরে শিশুদের পাঠদান কার্যক্রম চলছে।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় পুরোনো টিনের শ্রেণিকক্ষে বৃষ্টির পানি পড়ে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ভিজে সয়লাব। মাদ্রাসার সুপার জানান, শ্রেণিকক্ষের উপরের টিনের চালা অপেক্ষাকৃত অনেক নীচু হওয়ায় গ্ৰীম্মকালে প্রচন্ড রোদের তাপে পাঠদান কার্যক্রমে‌ শিক্ষার্থীদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থায় পড়তে হয়। এদিকে ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে মাদ্রাসার নামে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর চাঁদপুর থেকে একটি টিনশেড ভবন নির্মাণের জন্য ১৯ লাখ টাকার বরাদ্দ পাওয়া যায়।

উক্ত বরাদ্দে যেন তেনভাবে একটি টিনশেড ভবনের নির্মাণ কাজ শেষে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে ৫৩.৬২”×২৬” সাইজের ভবন হস্তান্তর করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিল উত্তোলন করে চলে যায়।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অফিস বা শ্রেণিকক্ষের যে পরিমাণ প্রশস্ত বারান্দা হওয়া প্রয়োজন নব-নির্মিত উক্ত টিনশেড ভবনে তার ছিটেফোটাও বিবেচনায় নেয়া হয়নি যা দেখতে অনেক দৃষ্টিকটু। তাছাড়া উক্ত টিনশেড ভবনের পূর্ব অংশে দুইটি টয়লেট আকৃতির কিছু একটা নির্মাণের কাজ শুরু করে শেষ না করেই হস্তান্তর করা হয়েছে। এবিষয়ে শাহরাস্তি উপজেলার দায়িত্ব প্রাপ্ত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর চাঁদপুরের সহকারী প্রকৌশলী রাকিবের মোবাইল ফোনে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, সাময়িক একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বারান্দা এরচেয়ে বেশি প্রশস্ত রাখার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া এই ভবন নির্মাণের ডিজাইন প্রধান কার্যালয় থেকে করা হয়েছে। জানতে চাইলাম সরকারের ১৯ লাখ টাকা বরাদ্দে সাময়িক ভবন নির্মাণ করা হবে কেন? এই প্রশ্নের তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

বর্তমানে এই দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি পরিচালনা পরিষদ রয়েছে বলে অধ্যক্ষ জানান। মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, মোঃ আবদুল মতিন।

সরজমিনে গিয়ে সাক্ষাৎ মিলে কমিটির বিদ্যুৎসাহী সদস্য মোঃ হাবিব এর সাথে। তিনি অত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও বর্তমানে বিরাজমান সমস্যাসমূহ তুলে ধরে বলেন, শুরু থেকে মাদ্রাসাটির নিজস্ব জায়গা ৭৪ শতাংশ জায়গার উপর একটি জলাশয় রয়েছে। উক্ত জলাশয়টিতে মাছ চাষ করলে যে আর হতো তা যথাযথভাবে পাওয়া গেলে ঐ আয়দিয়ে মাদ্রাসার দৈনন্দিন খরচ অনায়াসে মিটানো সম্ভব ছিল। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, উক্ত জলাশয়ে বর্ষা মৌসুমে মাছ ছাড়লে জলাশয়ের পূর্ব ও দক্ষিণ পাড়ে বসবাসরত ব্যক্তিবর্গ অবাধে উক্ত জলাশয় থেকে মাছ ধরে নিয়ে যায়। এতে মাদ্রাসাটি আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয় দীর্ঘ বছর যাবৎ এই অবস্থা চলে আসছে। তাছাড়া এই জলাশয়ের সাথেই আরও ৭৬ শতাংশ উঁচুনীচু জায়গা দক্ষিণ অংশে আছে যা এখনও কিছু মানুষ দখলে রেখে ভোগদখল করছে। তিনি দ্বীনি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠের মাঝখানে এলাকার মানুষের যাতায়াতের পথটি বন্ধ করে দিয়ে মাদ্রাসার উত্তর পাশের নির্ধারিত রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী সংস্কার করে দেয়া, মাদ্রাসাটির বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ওয়াশ রুম নির্মাণ এবং ছাত্রীদের জন্য নামাজের ঘর নির্মাণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের বিনীত আবেদন জানান। তিনি এই মহতী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি শাহরাস্তি উপজেলা প্রশাসনের সহ চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করেন। সেই সাথে তিনি শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজিয়া হোসেনকে সরজমিনে মাদ্রাসাটি পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানান।

এলাকাবাসীর বক্তব্য, অত্র দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাতায়াতের রাস্তাগুলো বৃষ্টি বাদলের সময় পানিতে ডুবে যাতায়াতের অনুপযোগী হয়ে যায়। যার ফলে বর্ষা মৌসুমে ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতে অনেক অসুবিধায় পড়তে হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ফ্যাসিলিটিস ডিপার্টমেন্টের দায়িত্বে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, এলজিইডি এবং শাহরাস্তি উপজেলা প্রশাসন সহ চাঁদপুর জেলা প্রশাসক তাদের সন্তানদের শিক্ষা গ্ৰহনের সুবিধার্থে অনতিবিলম্বে সমস্যাসমূহ সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলে আশা করেন।

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

টিম টিম করে জ্বলছে পাথৈর ইসলামীয়া দাখিল মাদরাসার শিক্ষা কার্যক্রম

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল থেকে স্বীকৃতির মঞ্চে; ২০১৩ সাল থেকে শিক্ষকতা, আনন্দঘন পাঠদান ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থা

নিজস্ব প্রতিনিধি : একটি গান, একটি রিল ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও ট্রল। ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল ভার্চুয়াল জগতে। নানা মন্তব্য আর সমালোচনার মধ্যে একসময় ভিডিওটি সরিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই বিতর্কের কয়েক মাস পরই সামনে এলো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের আরেকটি পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাকে পেছনে ফেলে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিউটি রানী পাল।

তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে চারজনকে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁদের একজন বিউটি রানী পাল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর স্বাক্ষর করা একটি স্মারকের মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষকদের নাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও সেখানে বিউটি রানী পালের নাম ছিল না।

যে রিল ঘিরে আলোচনাঃ

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ‘ডিফরেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় একটি গানের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি রানী পাল। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’—গানের এই অংশ ব্যবহারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটির সঙ্গে নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে তা প্রচার করা হলে তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও ট্রল। সাইবার বুলিংয়ের মুখে একপর্যায়ে ভিডিওটি সরিয়ে নেন তিনি।

তবে ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল একজন শিক্ষককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকার শত শত নারী শিক্ষক একই গানের সঙ্গে নিজেদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। শিক্ষক সমাজের এমন অভিনব প্রতিবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সংহতি প্রকাশ করেন।

ফলে একটি ব্যক্তিগত রিল ভিডিওকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনা পরিণত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী শিক্ষকদের প্রতি আচরণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অনলাইন হয়রানি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায়।

বিতর্কের বাইরে অন্য এক পরিচয়ঃ

তবে বিউটি রানী পালের শিক্ষকতা জীবনের গল্প শুরু হয়নি ওই রিল ভিডিও দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত তিনি। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সৃজনশীল নানা কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন তিনি। আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শরীরচর্চা এবং নাচের ছন্দে পড়াশোনাকে সহজ করে তোলার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এসব উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এর আগেও তিনি একবার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো জেলা পর্যায়ের এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বনাম শ্রেণিকক্ষঃ

বিউটি রানী পালের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। অনলাইনে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও যেমন দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তেমনি সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মন্তব্য বা প্রচারণাও মুহূর্তে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে একজন শিক্ষকের প্রকৃত কাজের পরিধি অনেক দীর্ঘ। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, তাদের আগ্রহ তৈরি করা, শেখার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার মূল্যায়ন একটি রিল ভিডিওর কয়েক মিনিটের দৃশ্য দিয়ে করা সম্ভব নয়।

বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা তাঁকে আলোচনায় এনেছিল। কিন্তু জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের কাজ ও অবদানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্বীকৃতি কি বদলে দেয় আলোচনার ভাষা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ দ্রুত মতামত দেয়। সেখানে প্রেক্ষাপট, দীর্ঘমেয়াদি কাজ কিংবা একজন ব্যক্তির সামগ্রিক পরিচয় অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। বিউটি রানী পালের ঘটনাতেও প্রথমে সামনে এসেছিল একটি রিল ভিডিও। পরে সামনে এসেছে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পাঠদানের বিষয়টি।

জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার তথ্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই ব্যক্তিকে ঘিরে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর পেশাগত কাজের স্বীকৃতিও রয়েছে—দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে।

শিক্ষকের পরিচয় শ্রেণিকক্ষেইঃ

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর শ্রেণিকক্ষের কাজ—শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বাইরে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের এই দিকটিই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার।

একটি রিল তাঁকে পরিচিত করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; আর শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ তাঁকে এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিউটি রানী পালের গল্পটি যেন মনে করিয়ে দেয়—ভার্চুয়াল জগতের কয়েক মুহূর্তের আলোচনার চেয়ে একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের কাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

টিম টিম করে জ্বলছে পাথৈর ইসলামীয়া দাখিল মাদরাসার শিক্ষা কার্যক্রম

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ অনুদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা এবং অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এ অনুদান দেওয়া হবে।

এবার অনলাইনের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির মাধ্যমে সুপারিশকৃত আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে পৌঁছাতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিচালন বাজেটের আওতায় বিশেষ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থ বিতরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাইগভ প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত, দুর্গম, উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকার অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যে খাতে দেওয়া হবে অনুদান:

বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মেরামত ও সংস্কার, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা, প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা এবং পাঠাগার উন্নয়নে বিশেষ অনুদান দেওয়া হবে।

এ ছাড়া বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনাজনিত কারণে আর্থিক সহায়তার জন্যও আবেদন করা যাবে।

অগ্রাধিকার পাবেন যেসব শিক্ষার্থীঃ

সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনায় আক্রান্ত, দুস্থ, মেধাবী, এতিম, অদম্য মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অসহায় ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন।

দেশের উপকূলীয়, চরাঞ্চল, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদেরও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যেভাবে করতে হবে আবেদনঃ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। আর স্নাতক বা সমমান এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে জমা দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রার আবেদনগুলো গ্রহণ করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে একত্র করবেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।

অনলাইন ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাতে দ্বৈতভাবে সুপারিশ না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ জন্য জেলা কমিটি আগে অনলাইনে সুপারিশ করা তালিকার সঙ্গে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাওয়া আবেদনসমূহ সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে।

নির্ধারিত আবেদন ফরম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট www.shed.gov.bd-এ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

সময়সীমা ১৫ অক্টোবরঃ

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাওয়া আবেদন জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবে। সুপারিশকৃত তালিকা আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর পৌঁছাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া কোনো আবেদন বিবেচনা করা হবে না।

শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা যেন কেবল শহর কিংবা সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে সরকারি সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

টিম টিম করে জ্বলছে পাথৈর ইসলামীয়া দাখিল মাদরাসার শিক্ষা কার্যক্রম

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

—— মানিক লাল ঘোষ ——
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে কজন বিপ্লবীর নাম সাহস, আত্মত্যাগ ও দুর্জয় প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নারী ছিলেন না; ছিলেন এমন এক সময়ের অদম্য কণ্ঠ, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নারীর জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ ছিল নানা বাধায় পরিপূর্ণ। মাত্র ২১ বছরের জীবনে প্রীতিলতা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয়।
২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর শহীদ হওয়ার দিন। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে—যিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভায় চাকরি করতেন এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন গৃহিণী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও মননশীল।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই অসাধারণ সাফল্য প্রমাণ করে, প্রীতিলতা কেবল সাহসী বিপ্লবীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গভীর মননশীল ও মেধাবী নারীও।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। নন্দনকানন অপরনাচরণ স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন এবং পরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বও পালন করেন। একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশাজীবন তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দেশের পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং বৈষম্যের বাস্তবতা তাঁকে অন্য এক পথে টেনে নেয়।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রীতিলতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় পড়াশোনার সময় তিনি দীপালি সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন—যে সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের শারীরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান সংগঠক মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ তখন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু প্রীতিলতা ধীরে ধীরে সংগঠনের আস্থা অর্জন করেন। গোপন যোগাযোগ, বিপ্লবীদের সহায়তা, সংবাদ ও প্রচারপত্র পৌঁছে দেওয়া, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তিনি অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন সহযোগী নন, গুরুত্বপূর্ণ একজন সংগঠক ও নেতৃত্বদানের যোগ্য বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩২ সালে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলন তখন চট্টগ্রামে তীব্রতর। এরই মধ্যে পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থায় ক্লাবটি ছিল ইউরোপীয়দের সামাজিক আধিপত্য ও বর্ণবৈষম্যের একটি প্রতীক। ক্লাবটির প্রবেশপথে থাকা ‘Dogs and Indians not allowed’ ধরনের বর্ণবাদী বার্তা ভারতীয়দের প্রতি ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার নির্মম প্রকাশ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এই ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতার ওপর অর্পিত হয়। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে, যা ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহর পর্যন্ত গড়ায়, তিনি বিপ্লবীদের একটি দল নিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করেন। পুরুষের ছদ্মবেশে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবীরা ক্লাবে হামলা চালায় এবং ভবনের অংশবিশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন এবং একপর্যায়ে তিনি বিচ্ছিন্ন ও ঘেরাও হয়ে পড়েন।
প্রীতিলতা জানতেন, ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে। বিপ্লবীদের মধ্যে বন্দিত্ব এড়ানোর জন্য সায়ানাইড বহনের পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তী ময়নাতদন্তে জানা যায়, গুলির আঘাতটি প্রাণঘাতী ছিল না; সায়ানাইড বিষক্রিয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।
প্রীতিলতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি জীবন থেমে গেলেও তাঁর আদর্শ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস থেমে যায়নি। তিনি হয়ে উঠলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক। সমকালীন ও পরবর্তী ইতিহাসচর্চায় তাঁকে বাংলার প্রথম নারী শহীদদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
প্রীতিলতার জীবনকে শুধু তাঁর মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে বিচার করলে তাঁর সংগ্রামের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। একজন মেধাবী ছাত্রী থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে বিপ্লবী সংগঠক এবং শেষ পর্যন্ত একটি সশস্ত্র অভিযানের নেত্রী—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাই তাঁর জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য।
আজকের দিনে প্রীতিলতাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই মূল্যবোধগুলো একজন মানুষকে ইতিহাসের অংশ করে তুলতে পারে। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর তাঁর স্মৃতি অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন অগ্নিঝরা এক জীবন, যার দীপ্তি মাত্র ২১ বছরের আয়ুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে।
শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)