কারাবন্দী বোঝা নয়, রাষ্ট্রের সম্পদ, কারাগার হোক পুনর্বাসন ও উৎপাদনের কেন্দ্র

কারাবন্দী বোঝা নয়, রাষ্ট্রের সম্পদ, কারাগার হোক পুনর্বাসন ও উৎপাদনের কেন্দ্র

কারাবন্দী বোঝা নয়, রাষ্ট্রের সম্পদ, কারাগার হোক পুনর্বাসন ও উৎপাদনের কেন্দ্র

কারাগারকে শুধু ব্যয়ের কেন্দ্র না বানিয়ে সংশোধন, দক্ষতা উন্নয়ন, পুনর্বাসন ও উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু করে গড়ে তোলা সম্ভব। কারাগার শব্দটির সঙ্গে আমাদের মনে সাধারণত বন্দিত্ব, শাস্তি ও অপরাধের ধারণাই ভেসে ওঠে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কারাগারের উদ্দেশ্য শুধু একজন অপরাধীকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা নয়; তাকে সংশোধন করা, দক্ষ করে তোলা এবং সাজা শেষে সমাজে পুনর্বাসনের উপযোগী করে তোলাও এর অন্যতম দায়িত্ব। এই জায়গা থেকেই একটি প্রশ্ন সামনে আসতে পারে, কারাবন্দীদের শুধু রাষ্ট্রের ব্যয়ের বোঝা হিসেবে না দেখে তাদের একটি অংশকে কি উৎপাদনশীল জনশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব?

প্রসঙ্গটি নিয়ে এখন গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে। বাংলাদেশের কারাগারগুলোর বর্তমান চিত্র বিষয়টির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুন ২০২৬ তারিখে দেশের কারাগারগুলোতে মোট ৭৭ হাজার ৪০ জন বন্দী ছিলেন। এ হিসাব গত তিন মাসে বেড়েছে কয়েক হাজার। এর মধ্যে নারী বন্দীর সংখ্যা মোট বন্দীর প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক ২ হাজার ৮০ জন। কারাগারে নারী ও পুরুষের পাশাপাশি বয়সভেদে বিভিন্ন শ্রেণির বন্দীও রয়েছেন। কারা অধিদপ্তরের শ্রেণিবিন্যাসে নারী বন্দীর পাশাপাশি ২১ বছরের নিচের পুরুষ বন্দী এবং বয়ঃসন্ধিতে উপনীত না হওয়া বন্দীদের আলাদা শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে কিশোর বন্দীদের বর্তমান নির্ভুল সংখ্যা আলাদাভাবে সরকারি হালনাগাদ পরিসংখ্যানের মাধ্যমে প্রকাশ করা প্রয়োজন। এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি কারাগারে থাকা সবাই দণ্ডপ্রাপ্ত নন। বিচারাধীন হাজতি এবং দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি দুই শ্রেণির মানুষই কারাগারে থাকেন। ফলে কর্মসংস্থান বা উৎপাদনমূলক কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের আইনগত অবস্থান, বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় পৃথক নীতিমালা প্রয়োজন।

একজন বন্দী কারাগারে অবস্থান করার সময় তার খাবার, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, পোশাক, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে রাষ্ট্রের নিয়মিত অর্থ ব্যয় হয়। দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের ক্ষেত্রে এই ব্যয় দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। অন্যদিকে এসব বন্দীর অনেকেই শারীরিকভাবে সক্ষম এবং কাজ শেখার উপযোগী। তাহলে তাদের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রেখে শুধু ব্যয় করার পরিবর্তে কেন তাদের একটি অংশকে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা হবে না? কারাগারে থাকা সময়টিকে যদি সংশোধন, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মদক্ষতা অর্জনের সময়ে পরিণত করা যায়, তাহলে একই সঙ্গে রাষ্ট্র, বন্দী ও সমাজ তিন পক্ষই লাভবান হতে পারে। এ জন্য দেশের কারাগারগুলোতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ‘কারা কর্মসংস্থান’ নামে একটি পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।

প্রাথমিকভাবে বড় কোনো শিল্পকারখানা স্থাপনের প্রয়োজন নেই। কম মূলধন ও সহজ প্রযুক্তিনির্ভর ছোট ছোট প্রকল্প দিয়ে কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে। যেমন: বাঁশ ও বেতের হস্তশিল্প; কাঠের আসবাবপত্র ও ব্যবহার্য সামগ্রী; মোমবাতি উৎপাদন; আগরবাতি উৎপাদন; মশার কয়েল; কাগজ ও কাগজজাত পণ্য; পোশাক ও সেলাই; ব্যাগ ও হস্তশিল্প; প্যাকেজিং সামগ্রী; কৃষি ও নার্সারি; বিভিন্ন ক্ষুদ্র কারিগরি পণ্য; স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক অন্যান্য উৎপাদন। প্রতিটি কারাগারের অবস্থান, স্থানীয় কাঁচামাল, বাজারের চাহিদা এবং বন্দীদের দক্ষতা বিবেচনা করে আলাদা আলাদা উৎপাদন ইউনিট গড়ে তোলা যেতে পারে। বর্তমান সময়ে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন পণ্য মিনারেল ওয়াটার ও কোমলপানি যা বাজারে চাহিদা প্রচুর। এগুলোও যুক্ত করা যেতে পারে।

বন্দী শ্রম নয়, হয়ে উঠুক দক্ষতা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার থাকা দরকার ‘কারা কর্মসংস্থান’ কোনোভাবেই বন্দীদের ওপর জোরপূর্বক শ্রম চাপিয়ে দেওয়ার প্রকল্প হওয়া উচিত নয়। মানবাধিকার, শ্রমের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং প্রচলিত আইন মেনেই কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে। যারা আইনগতভাবে ও শারীরিকভাবে উপযুক্ত এবং কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে আগ্রহী, তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বেচ্ছাভিত্তিকভাবে কাজে যুক্ত করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কাজের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত পারিশ্রমিক, সঞ্চয় বা পুনর্বাসন সুবিধার ব্যবস্থা থাকতে পারে। উৎপাদন থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বন্দীর নামে সঞ্চয় করে রাখা যেতে পারে, যা সাজা শেষে মুক্তির পর তার পুনর্বাসন, পরিবারকে সহায়তা কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

কারা কর্মসংস্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হচ্ছে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। কারাগারে উৎপাদিত মানসম্মত পণ্য সরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি আইনসম্মত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় এসব পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব। দেশের বিভিন্ন কারাগারে কয়েক হাজার বন্দী পর্যায়ক্রমে উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত হলে সম্মিলিত উৎপাদনের পরিমাণ ছোট থাকবে না। সঠিক ব্যবস্থাপনা, বাজারজাতকরণ ও হিসাবরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এখান থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ কারাগারকে শুধু ‘ব্যয়ের খাত’ হিসেবে না দেখে ধীরে ধীরে ‘সংশোধন ও উৎপাদন কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

তবে এখান থেকে কত টাকা আয় হবে এ বিষয়ে অনুমাননির্ভর কোনো অঙ্ক বলা ঠিক হবে না। প্রথমে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সমীক্ষা প্রয়োজন। কতজন বন্দী কর্মক্ষম, কতজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে, উৎপাদন ব্যয় কত, বাজারমূল্য কত এবং প্রকৃত লাভ কত এসব হিসাবের ভিত্তিতেই সম্ভাব্য রাজস্ব নির্ধারণ করা যেতে পারে।

উৎপাদন থেকে অর্জিত অর্থ কীভাবে ব্যবহার হবে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ নীতিমালা থাকতে হবে। সম্ভাব্যভাবে আয়ের একটি অংশ ১. উৎপাদনের কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয়ে ২. বন্দীর পারিশ্রমিক বা সঞ্চয়ে ৩. তার পরিবারের সহায়তায় ৪. কারা কল্যাণ ও পুনর্বাসন তহবিলে এবং ৫. রাষ্ট্রীয় রাজস্বে ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রতিটি উৎপাদন ইউনিটের আয়-ব্যয়, পণ্য উৎপাদন, বিক্রয় ও লাভের হিসাব ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ এবং নিয়মিত অডিটের আওতায় আনতে হবে। এতে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ কমবে। নারী বন্দীদের জন্য তাদের সক্ষমতা, নিরাপত্তা ও প্রয়োজন বিবেচনায় আলাদা কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেওয়া যেতে পারে। সেলাই, পোশাক, হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন নিরাপদ ও বাজারমুখী কাজ তাদের জন্য উপযোগী হতে পারে।

অন্যদিকে কিশোর বন্দীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। তাদের ক্ষেত্রে উৎপাদনের চেয়ে শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, মানসিক বিকাশ, কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাদের যেন কোনোভাবেই শোষণমূলক শ্রমে যুক্ত করা না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারা কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় সুফল হতে পারে বন্দীদের ভবিষ্যৎ পুনর্বাসন। সাজা শেষে সমাজে ফিরে এসে অনেকেই কর্মসংস্থানের অভাবে নতুন করে অপরাধের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। কারাগারে থাকতেই যদি তারা কোনো পেশায় দক্ষতা অর্জন করেন, তাহলে মুক্তির পর বৈধভাবে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরি হবে।

একজন বন্দী যদি কারাগারে থেকে কাঠের কাজ শেখেন, বাঁশ-বেতের পণ্য তৈরি শেখেন, পোশাক তৈরি শেখেন কিংবা কোনো কারিগরি দক্ষতা অর্জন করেন, তাহলে সমাজে ফেরার সময় তিনি অন্তত একটি পেশাগত পরিচয় নিয়ে ফিরতে পারবেন। এভাবে কারা কর্মসংস্থান হতে পারে অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসনের কার্যকর হাতিয়ার।

আর এ সকল উদ্যোগে প্রথমে পাইলট প্রকল্প গ্রহন করতে পারে সরকার। একদিনে দেশের সব কারাগারে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব নয়। প্রথমে কয়েকটি কারাগারে পরীক্ষামূলকভাবে ‘কারা কর্মসংস্থান’ প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। সেখানে যাচাই করা হবে—কতজন বন্দী কাজে অংশ নিতে আগ্রহী; কতজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব; কোন ধরনের পণ্যের বাজার রয়েছে; উৎপাদন ব্যয় কত; বিক্রয়মূল্য ও সম্ভাব্য আয় কত; বন্দীদের পারিশ্রমিক কীভাবে নির্ধারিত হবে; এবং প্রকল্পের মাধ্যমে পুনর্বাসনের কী ফল পাওয়া যাচ্ছে।

পরীক্ষামূলক প্রকল্প সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য কারাগারে তা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
প্রয়োজন নির্ভুল জাতীয় ডাটাবেস এ ধরনের উদ্যোগের আগে দেশের কারাগারগুলোর বন্দীদের নিয়ে একটি হালনাগাদ জাতীয় ডাটাবেস তৈরি করা জরুরি।
বয়স, লিঙ্গ, বিচারাধীন বা দণ্ডপ্রাপ্ত, সাজার মেয়াদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পূর্বের পেশা, শারীরিক সক্ষমতা, কারিগরি দক্ষতা এবং কোন ধরনের কাজে আগ্রহ, এসব তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে প্রত্যেক বন্দীর জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হবে। তখন বোঝা যাবে, ৭৭ হাজারের বেশি বন্দীর মধ্যে কতজন বাস্তবে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার উপযুক্ত।

কারাগার হতে পারে বন্দী সংশোধন ও সম্ভাবনার কেন্দ্র।রাষ্ট্রের খেয়াল রাখতে হবে, একজন বন্দীকে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারাগারে থাকা মানুষগুলোকে শুধু অপরাধের পরিচয়ে দেখলে তাদের সম্ভাবনার একটি বড় অংশ অস্বীকার করা হয়। রাষ্ট্র যদি একজন বন্দীর পেছনে বছরের পর বছর অর্থ ব্যয় করেই থাকে, তাহলে সেই সময়টুকুকে কেন তার শিক্ষা, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা হবে না? কারাগার যেন শুধু তালাবদ্ধ দরজার ওপারে থাকা একটি ব্যয়বহুল প্রতিষ্ঠান না হয়; বরং সেখানে তৈরি হোক দক্ষতা, দায়িত্ববোধ, কর্মসংস্থান ও নতুন জীবনের প্রস্তুতি।

মনে রাখা উচিত আজ যে মানুষটি কারাগারে বন্দী, আগামীকাল সে হয়তো সমাজের একজন কর্মজীবী মানুষ হতে পারে। রাষ্ট্র যদি সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে একজন বন্দী শুধু নিজের জীবনই বদলাবেন না রাষ্ট্রের ব্যয়ের একটি অংশকে উৎপাদনমূলক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করার সুযোগও সৃষ্টি হবে।

সুতরাং সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে আবেগ নয়, বাস্তবতা, মানবাধিকার, অর্থনীতি ও পুনর্বাসনের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের। ‘কারা কর্মসংস্থান’ হতে পারে সেই নতুন ভাবনারই সূচনা যেখানে কারাগার শুধু শাস্তির স্থান নয়, সংশোধন, দক্ষতা অর্জন, পুনর্বাসন এবং সম্ভাব্য উৎপাদনের কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

লেখক পরিচিতি : আহমেদ আবু জাফর, চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশ। ইমেইল [email protected], 01712306501

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

কারাবন্দী বোঝা নয়, রাষ্ট্রের সম্পদ, কারাগার হোক পুনর্বাসন ও উৎপাদনের কেন্দ্র

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল থেকে স্বীকৃতির মঞ্চে; ২০১৩ সাল থেকে শিক্ষকতা, আনন্দঘন পাঠদান ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থা

নিজস্ব প্রতিনিধি : একটি গান, একটি রিল ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও ট্রল। ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল ভার্চুয়াল জগতে। নানা মন্তব্য আর সমালোচনার মধ্যে একসময় ভিডিওটি সরিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই বিতর্কের কয়েক মাস পরই সামনে এলো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের আরেকটি পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাকে পেছনে ফেলে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিউটি রানী পাল।

তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে চারজনকে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁদের একজন বিউটি রানী পাল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর স্বাক্ষর করা একটি স্মারকের মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষকদের নাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও সেখানে বিউটি রানী পালের নাম ছিল না।

যে রিল ঘিরে আলোচনাঃ

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ‘ডিফরেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় একটি গানের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি রানী পাল। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’—গানের এই অংশ ব্যবহারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটির সঙ্গে নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে তা প্রচার করা হলে তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও ট্রল। সাইবার বুলিংয়ের মুখে একপর্যায়ে ভিডিওটি সরিয়ে নেন তিনি।

তবে ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল একজন শিক্ষককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকার শত শত নারী শিক্ষক একই গানের সঙ্গে নিজেদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। শিক্ষক সমাজের এমন অভিনব প্রতিবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সংহতি প্রকাশ করেন।

ফলে একটি ব্যক্তিগত রিল ভিডিওকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনা পরিণত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী শিক্ষকদের প্রতি আচরণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অনলাইন হয়রানি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায়।

বিতর্কের বাইরে অন্য এক পরিচয়ঃ

তবে বিউটি রানী পালের শিক্ষকতা জীবনের গল্প শুরু হয়নি ওই রিল ভিডিও দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত তিনি। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সৃজনশীল নানা কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন তিনি। আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শরীরচর্চা এবং নাচের ছন্দে পড়াশোনাকে সহজ করে তোলার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এসব উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এর আগেও তিনি একবার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো জেলা পর্যায়ের এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বনাম শ্রেণিকক্ষঃ

বিউটি রানী পালের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। অনলাইনে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও যেমন দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তেমনি সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মন্তব্য বা প্রচারণাও মুহূর্তে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে একজন শিক্ষকের প্রকৃত কাজের পরিধি অনেক দীর্ঘ। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, তাদের আগ্রহ তৈরি করা, শেখার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার মূল্যায়ন একটি রিল ভিডিওর কয়েক মিনিটের দৃশ্য দিয়ে করা সম্ভব নয়।

বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা তাঁকে আলোচনায় এনেছিল। কিন্তু জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের কাজ ও অবদানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্বীকৃতি কি বদলে দেয় আলোচনার ভাষা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ দ্রুত মতামত দেয়। সেখানে প্রেক্ষাপট, দীর্ঘমেয়াদি কাজ কিংবা একজন ব্যক্তির সামগ্রিক পরিচয় অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। বিউটি রানী পালের ঘটনাতেও প্রথমে সামনে এসেছিল একটি রিল ভিডিও। পরে সামনে এসেছে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পাঠদানের বিষয়টি।

জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার তথ্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই ব্যক্তিকে ঘিরে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর পেশাগত কাজের স্বীকৃতিও রয়েছে—দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে।

শিক্ষকের পরিচয় শ্রেণিকক্ষেইঃ

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর শ্রেণিকক্ষের কাজ—শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বাইরে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের এই দিকটিই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার।

একটি রিল তাঁকে পরিচিত করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; আর শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ তাঁকে এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিউটি রানী পালের গল্পটি যেন মনে করিয়ে দেয়—ভার্চুয়াল জগতের কয়েক মুহূর্তের আলোচনার চেয়ে একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের কাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

কারাবন্দী বোঝা নয়, রাষ্ট্রের সম্পদ, কারাগার হোক পুনর্বাসন ও উৎপাদনের কেন্দ্র

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ অনুদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা এবং অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এ অনুদান দেওয়া হবে।

এবার অনলাইনের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির মাধ্যমে সুপারিশকৃত আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে পৌঁছাতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিচালন বাজেটের আওতায় বিশেষ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থ বিতরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাইগভ প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত, দুর্গম, উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকার অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যে খাতে দেওয়া হবে অনুদান:

বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মেরামত ও সংস্কার, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা, প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা এবং পাঠাগার উন্নয়নে বিশেষ অনুদান দেওয়া হবে।

এ ছাড়া বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনাজনিত কারণে আর্থিক সহায়তার জন্যও আবেদন করা যাবে।

অগ্রাধিকার পাবেন যেসব শিক্ষার্থীঃ

সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনায় আক্রান্ত, দুস্থ, মেধাবী, এতিম, অদম্য মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অসহায় ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন।

দেশের উপকূলীয়, চরাঞ্চল, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদেরও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যেভাবে করতে হবে আবেদনঃ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। আর স্নাতক বা সমমান এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে জমা দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রার আবেদনগুলো গ্রহণ করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে একত্র করবেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।

অনলাইন ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাতে দ্বৈতভাবে সুপারিশ না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ জন্য জেলা কমিটি আগে অনলাইনে সুপারিশ করা তালিকার সঙ্গে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাওয়া আবেদনসমূহ সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে।

নির্ধারিত আবেদন ফরম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট www.shed.gov.bd-এ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

সময়সীমা ১৫ অক্টোবরঃ

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাওয়া আবেদন জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবে। সুপারিশকৃত তালিকা আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর পৌঁছাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া কোনো আবেদন বিবেচনা করা হবে না।

শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা যেন কেবল শহর কিংবা সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে সরকারি সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

কারাবন্দী বোঝা নয়, রাষ্ট্রের সম্পদ, কারাগার হোক পুনর্বাসন ও উৎপাদনের কেন্দ্র

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

—— মানিক লাল ঘোষ ——
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে কজন বিপ্লবীর নাম সাহস, আত্মত্যাগ ও দুর্জয় প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নারী ছিলেন না; ছিলেন এমন এক সময়ের অদম্য কণ্ঠ, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নারীর জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ ছিল নানা বাধায় পরিপূর্ণ। মাত্র ২১ বছরের জীবনে প্রীতিলতা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয়।
২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর শহীদ হওয়ার দিন। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে—যিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভায় চাকরি করতেন এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন গৃহিণী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও মননশীল।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই অসাধারণ সাফল্য প্রমাণ করে, প্রীতিলতা কেবল সাহসী বিপ্লবীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গভীর মননশীল ও মেধাবী নারীও।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। নন্দনকানন অপরনাচরণ স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন এবং পরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বও পালন করেন। একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশাজীবন তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দেশের পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং বৈষম্যের বাস্তবতা তাঁকে অন্য এক পথে টেনে নেয়।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রীতিলতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় পড়াশোনার সময় তিনি দীপালি সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন—যে সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের শারীরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান সংগঠক মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ তখন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু প্রীতিলতা ধীরে ধীরে সংগঠনের আস্থা অর্জন করেন। গোপন যোগাযোগ, বিপ্লবীদের সহায়তা, সংবাদ ও প্রচারপত্র পৌঁছে দেওয়া, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তিনি অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন সহযোগী নন, গুরুত্বপূর্ণ একজন সংগঠক ও নেতৃত্বদানের যোগ্য বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩২ সালে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলন তখন চট্টগ্রামে তীব্রতর। এরই মধ্যে পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থায় ক্লাবটি ছিল ইউরোপীয়দের সামাজিক আধিপত্য ও বর্ণবৈষম্যের একটি প্রতীক। ক্লাবটির প্রবেশপথে থাকা ‘Dogs and Indians not allowed’ ধরনের বর্ণবাদী বার্তা ভারতীয়দের প্রতি ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার নির্মম প্রকাশ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এই ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতার ওপর অর্পিত হয়। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে, যা ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহর পর্যন্ত গড়ায়, তিনি বিপ্লবীদের একটি দল নিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করেন। পুরুষের ছদ্মবেশে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবীরা ক্লাবে হামলা চালায় এবং ভবনের অংশবিশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন এবং একপর্যায়ে তিনি বিচ্ছিন্ন ও ঘেরাও হয়ে পড়েন।
প্রীতিলতা জানতেন, ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে। বিপ্লবীদের মধ্যে বন্দিত্ব এড়ানোর জন্য সায়ানাইড বহনের পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তী ময়নাতদন্তে জানা যায়, গুলির আঘাতটি প্রাণঘাতী ছিল না; সায়ানাইড বিষক্রিয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।
প্রীতিলতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি জীবন থেমে গেলেও তাঁর আদর্শ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস থেমে যায়নি। তিনি হয়ে উঠলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক। সমকালীন ও পরবর্তী ইতিহাসচর্চায় তাঁকে বাংলার প্রথম নারী শহীদদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
প্রীতিলতার জীবনকে শুধু তাঁর মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে বিচার করলে তাঁর সংগ্রামের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। একজন মেধাবী ছাত্রী থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে বিপ্লবী সংগঠক এবং শেষ পর্যন্ত একটি সশস্ত্র অভিযানের নেত্রী—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাই তাঁর জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য।
আজকের দিনে প্রীতিলতাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই মূল্যবোধগুলো একজন মানুষকে ইতিহাসের অংশ করে তুলতে পারে। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর তাঁর স্মৃতি অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন অগ্নিঝরা এক জীবন, যার দীপ্তি মাত্র ২১ বছরের আয়ুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে।
শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)