সময়ের নদীতে আরেকটি আলোর প্রদীপ,কত মানুষের অন্ধকারে একটি প্রদীপ হতে পেরেছি? __রুহুল আমিন তরুন
সময়ের নদীতে আরেকটি আলোর প্রদীপ,কত মানুষের অন্ধকারে একটি প্রদীপ হতে পেরেছি? __রুহুল আমিন তরুন
জন্মদিন: বয়স নয়, আত্মার কাছে ফিরে যাওয়ার এক নীরব উৎসব
সময় কখনো পায়ের শব্দ তোলে না। সে নিঃশব্দে হেঁটে যায়—নদীর মতো, বাতাসের মতো, কিংবা গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরের মতো। আমরা ব্যস্ত থাকি জীবন নামের অসংখ্য অনুচ্চারিত বাক্যে; আর সময় অদৃশ্য এক শিল্পীর মতো আমাদের দিনগুলোকে রঙ বদলে দেয়। হঠাৎ এক সকালে ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ এসে দরজায় কড়া নাড়ে। তখন মনে হয়, জীবনের বৃক্ষ থেকে আরেকটি পাতা নিঃশব্দে ঝরে পড়েছে। সেই দিনটির নাম—জন্মদিন।
আজ ১০ জুলাই। পৃথিবীর কাছে হয়তো এ কেবল একটি সাধারণ দিন। কিন্তু আমার কাছে এটি প্রথম আলো ছুঁয়ে দেখার দিন, প্রথম নিঃশ্বাসের বিস্ময়, প্রথম কান্নায় পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয়ের দিন। মানুষ তার জন্মদিনে বয়স বাড়ায় না; বরং সময় তাকে আরেকবার নিজের ভেতরে ফিরে তাকাতে শেখায়।
আমরা প্রায়ই বছর গুনি, অথচ জীবন গুনি না। ক্যালেন্ডারের পাতায় সংখ্যার সারি দীর্ঘ হয়, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর আলো কতটা বাড়ল, সেই হিসাব খুব কমই রাখা হয়। অথচ জীবন আসলে বছরের নয়, অনুভূতির। জীবন কেবল পথচলার নয়, পথের মানুষের। কত দিন বেঁচেছি, তার চেয়ে অনেক বড় প্রশ্ন—কত মানুষের অন্ধকারে একটি প্রদীপ হতে পেরেছি?
জীবনের পথে যাদের সঙ্গে দেখা হয়, তারা সবাই সমান সময় থাকে না। কেউ আসে বর্ষার প্রথম বৃষ্টির মতো, হৃদয় ভিজিয়ে চলে যায়। কেউ শরতের সাদা মেঘের মতো দূরে ভেসে যায়। আবার কেউ থাকে শিকড়ের মতো—দেখা যায় না, কিন্তু তার নীরব শক্তিতেই দাঁড়িয়ে থাকে জীবনের বৃক্ষ। মানুষ বড় হতে হতে একসময় বুঝে যায়, সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়; মানুষের ভালোবাসা। সবচেয়ে বড় পরিচয় পদ নয়; বিনয়। সবচেয়ে বড় অর্জন ক্ষমতা নয়; একটি বিশ্বাসযোগ্য হৃদয়।
সময় বড় বিচিত্র কারিগর। সে কান্নাকে একদিন প্রার্থনায় রূপ দেয়, ব্যর্থতাকে অভিজ্ঞতার শস্যক্ষেত বানায়, আর ভাঙা স্বপ্নের ধুলোর মধ্যেই নতুন ভোরের বীজ লুকিয়ে রাখে। তাই যে মানুষ সময়ের ভাষা পড়তে শেখে, সে জানে—প্রতিটি অন্ধকার রাতের বুকেই সূর্যোদয়ের গোপন প্রতিশ্রুতি লেখা থাকে।
জন্মদিন তাই কেবল শুভেচ্ছার বন্যায় ভেসে যাওয়ার দিন নয়; এটি কৃতজ্ঞতার দিন। মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, যিনি অকারণ অনুগ্রহে জীবনকে আরেকটি ভোর উপহার দিয়েছেন। বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা, যাদের ভালোবাসা ছাড়া পৃথিবীতে আমাদের কোনো নামই থাকত না। আর কৃতজ্ঞতা সেইসব মানুষের প্রতিও, যারা কখনো উচ্চস্বরে নয়, নীরবে পাশে থেকে ক্লান্ত পথিকের কাঁধে সাহসের হাত রেখেছেন।
মানুষের জীবন একটি প্রদীপের মতো। প্রদীপ নিজের জন্য জ্বলে না; সে আলো দেয় অন্যকে। তার শিখা যত ভাগ হয়, ততই অন্ধকার কমে। জন্মদিনের সবচেয়ে বড় প্রতিজ্ঞা তাই হতে পারে—নিজেকে বড় করা নয়, নিজের আলোকে বড় করা। এমন কিছু রেখে যাওয়া, যা সময় মুছে ফেলতে পারে না; এমন কিছু ভালোবাসা, যা মৃত্যুর পরও মানুষের স্মৃতিতে উষ্ণ হয়ে থাকে।
এই ১০ জুলাইয়ের প্রভাতে আমার কোনো আড়ম্বরের প্রার্থনা নেই। আমি শুধু চাই, অহংকারের জায়গায় বিনয় জন্ম নিক, অস্থিরতার জায়গায় প্রশান্তি, প্রাপ্তির লোভের জায়গায় কৃতজ্ঞতা, আর নিজের জন্য বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার বদলে মানুষের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার সাহস।
কারণ জন্মদিন শেষ পর্যন্ত কেকের মোমবাতি নেভানোর অনুষ্ঠান নয়; এটি আত্মার ভেতরে একটি নতুন প্রদীপ জ্বালানোর দিন। এটি নতুন করে স্বপ্ন দেখার দিন, নতুন করে বিশ্বাস করার দিন, নতুন করে একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠার নীরব অঙ্গীকারের দিন।
একদিন সময়ের নদী আমাদের সবার পদচিহ্ন ধুয়ে নিয়ে যাবে। বয়সের সংখ্যা হারিয়ে যাবে বিস্মৃতির ধুলোর নিচে। কিন্তু যদি কোনো হৃদয়ে সামান্য উষ্ণতা রেখে যেতে পারি, যদি কারও অন্ধকারে এক মুহূর্তের জন্যও আলো হয়ে উঠতে পারি, তবে জীবন বৃথা যাবে না।
হয়তো মানুষ তখন মনে রাখবে না, আমার জন্ম হয়েছিল কোন বছরে। তারা শুধু মনে রাখবে—একজন মানুষ এসেছিল; সে ভালোবাসতে জানত, মানুষের কষ্টে থমকে দাঁড়াতে জানত, আর বিদায়ের পরও কিছু আলো রেখে গিয়েছিল পৃথিবীর পথে।
সেই আলোই হোক প্রতিটি জন্মদিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সেই আলোই ছড়িয়ে পড়ুক মানুষ থেকে মানুষে, হৃদয় থেকে হৃদয়ে, সময়ের নদী পেরিয়ে অনন্তের পথে।






