অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সহজ-সরল, কৃষক-শ্রমিক, মজলুম মানুষের মুক্তির কণ্ঠস্বর ও আলোকবর্তিকা_এমএ আলীম সরকার

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক  সহজ-সরল, কৃষক-শ্রমিক, মজলুম মানুষের মুক্তির কণ্ঠস্বর ও আলোকবর্তিকা_এমএ আলীম সরকার

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সহজ-সরল, কৃষক-শ্রমিক, মজলুম মানুষের মুক্তির কণ্ঠস্বর ও আলোকবর্তিকা_এমএ আলীম সরকার

দূর্বার নিউজ ডেস্কঃ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন একজন সহজ-সরল সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত, বিনয়ী এবং মানবপ্রেমী মানুষ।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত পন্ডিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মুহাম্মদ আবদুল হাকিম, মা জাহানারা খাতুন এবং তাঁর স্ত্রী ফরিদা প্রধান। তাঁর দুই সন্তানের নাম যথাক্রমে শুচিতা শরমিন ও ফয়সল আরেফিন দীপন। তাঁর মেয়ে শুচিতা শরমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক (সাবেক বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন । ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ছিলেন। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর দীপনকে দুবৃত্তরা হত্যা করে। যেদিন দীপন ভাইকে হত্যা করে সেদিন আমি স্যারকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বাসায় গিয়েছিলাম। স্যার আমাকে দেখেই বলে যে “আলীম’ দেশতো অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে তুমি আলোর মুখ দেখাবে কিভাবে?” তখন আমি বললাম স্যার আজকের দিনে এসব কথা থাক। সেদিনও দেখেছি তিনি সন্তানের কথা বলেননি, দেশের কথা, জনগণের কথা বলেছেন। তিনি ছেলে হত্যার বিচার চাননি বলেছিলেন “রাষ্ট্রের শুভবুদ্ধির উদয় হোক”। আসলে স্যার ছিলেন সাম্প্রতিক সময়ের মহামানব। তাঁর মতো মহৎ হৃদয়ের মানুষ
বর্তমান বিশ্বে বিরল।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিজ্ঞানে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে তিনি স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৬ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেন। শিক্ষাজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তিনি মুনির চৌধুরী, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ, নীলিমা ইব্রাহিমের সংস্পর্শে আসেন এবং প্রগতিশীল ভাবধারায় নিজেকে যুক্ত করেন।

শৈশব থেকেই তিনি দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে ভাবতেন। চতুর্থ শ্রেণিতে থাকাকালীন ভাষা আন্দোলনের সময় অন্যদের সাথে তিনিও “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই , নুরুল আমিনের কল্লা চাই” এই স্লোগান দেন। তখন থেকেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন এবং পরবর্তীতে মাও সেতুঙের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন।
আবুল কাসেম ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘ চার দশক শিক্ষকতা করেছেন। তিনি তাঁর লেখা ও কথায় কৃষক-শ্রমিক, মজলুম ও মেহনতির মানুষের মুক্তির কথা লিখেছেন । তিনি মানুষের মধ্যে শুভবোধের জাগরণ কামনা করেছেন। তিনি জনগণকে শ্রদ্ধা করেছেন এবং কাউকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেননি। তিনি সবাইকে আপন মনে করে নিতেন নিজের সন্তানের মতো। তাঁর বাসায় থেকে কেউ না খেয়ে আসতে পারতো না। তাঁর অতিথিপরায়ণতা ছিল অতুলনীয়। দীপন ভাই মারা যাওয়ার পর থেকে আমাকে সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। আমি আমার বাবা-মার চেয়ে বেশি ভালোবাসা পেয়েছি। স্যার আমার পিতৃসমতুল্য ছিল। স্যারের চিন্তা-চেতনায় ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি ২০০৬ সাল থেকে স্যারের সান্নিধ্য পেয়েছি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। স্যার আমাকে লেখার জন্য সবসময় উৎসাহ দিতেন।
তিনি ‘ লোকায়ত নামক একটি মননশীল পত্রিকা ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সম্পাদনা করছেন। একুশটিরও অধিক গ্রন্থের প্রণেতা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। নজরুল রচনাবলীর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পত্র-পত্রিকায় তিনি নিয়মিত কলাম লিখেছেন। তিনি ২০০০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত স্বদেশ চিন্তা সংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সংগঠনটিকে সৃষ্টি করেছিলেন বাংলাদেশের প্রধান মুক্তচিন্তক আহমদ শরীফ। এছাড়াও এ সংগঠনটি ‘বাংলাদেশের মুক্তি ও উন্নতির কর্মনীতি আটাশ দফা’ ১ জানুয়ারি, ২০০৫ থেকে প্রচার করে যেটির রচয়িতা ছিলেন তিনি। তাঁর স্বপ্ন ছিল ২৮ দফার পর ওপর একটি নতুন রাজনৈতিক দল গড়ে উঠবে এবং নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে। তাঁর আটাশ দফার ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি) নামে একটি রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করে ২০২৩ সালের ২৫ আগস্ট। তিনি নিজেই এ পার্টি ঘোষণা করেন এবং তাত্ত্বিক ও প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন। ২০২৩ সালের ৬ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টির এক আলোচনা সভায় ২৮ দফার রূপরেখাকে সর্বজনীন গণতন্ত্র হিসেবে রূপদান করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে।
তার সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে মুক্তিসংগ্রাম (১৯৭২); কালের যাত্রার ধ্বনি (১৯৭৩); একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন (১৯৭৬); উনিশশতকের মধ্যশ্রেণি ও বাঙলা সাহিত্য (১৯৭৯); নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি (১৯৮১) ; যুগসংক্রান্তি ও নীতিজিজ্ঞাসা (১৯৮৪); মাও সেতুঙের জ্ঞানতত্ত্ব (১৯৮৭); মানুষ ও তার পরিবেশ (১৯৮৮); রাজনীতি ও দর্শন (১৯৮৯); বাঙলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্য (১৯৮৯); আশা-আকাক্সক্ষার সমর্থনে (১৯৯৩); সাহিত্যচিন্তা (১৯৯৫); বাঙলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা (১৯৯৭); অবক্ষয় ও উত্তরণ (১৯৯৮); রাজনীতি ও সংস্কৃতি : সম্ভাবনার নবদিগণ্ত (২০০২); সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে (২০০২); সংস্কৃতির সহজ কথা (২০০২); আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা (২০০৪); মানুষের স্বরূপ (২০০৭); রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ (২০০৮);
প্রাচুর্যে রিক্ততা (২০১০); শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ (২০১১)। তার অনুদিত গ্রন্থ বার্ন্ট্রান্ড রাসেল প্রণীত : রাজনৈতিক আদর্শ (১৯৭২); বার্ন্ট্রান্ড রাসেল প্রণীত : নবযুগের প্রত্যাশায় (১৯৮৯)। তার সম্পাদিত গ্রন্থ ইতিহাসের আলোকে বাঙলাদেশের সংস্কৃতি (১৯৭৮); স্বদেশচিন্তা (১৯৮৫); বঙ্কিমচন্দ্র : সার্ধশত জন্মবর্শে (১৯৮৯); বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রণীত : সাম্য (২০০০); মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী : মানবমুকুট (২০০০); এস ওয়াজেদ আলি প্রণীত: ভবিষ্যতের বাঙালি (২০০০); আকবরের রাষ্ট্রসাধনা (২০০২)। তার সম্পাদিত সাময়িকপত্র সুন্দরম (১৯৬২-৬৩); লোকায়ত (১৯৮২ থেকে চলছে)।

তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার পদ-পদবিতে নয়, বরং মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, সততা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতায়। তাই তিনি জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে কৃষক-শ্রমিক, মজলুম ও মেহনতি মানুষের সুখ-দুঃখের বিপ্লবী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন।
সমাজের অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তাঁর চিন্তা, আদর্শ ও কর্মে প্রতিফলিত হয়েছে ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং সাম্যের মূল্যবোধ। তিনি মনে করতেন, একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে, যখন তার কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণি সম্মান, অধিকার এবং ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করতে পারে।

অধ্যাপক ফজলুল হক শিক্ষা ক্ষেত্রেও ছিলেন একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেননি, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। তার শ্রেণিকক্ষ ও বাসা ছিল জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল পাঠশালা।

তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সহজ-সরল। ব্যক্তিগত স্বার্থ বা বিলাসিতার প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণ ছিল না। তিনি ছিলেন নির্লোভ-নির্মোহ একজন সাদামনের মানুষ। তাঁর ক্ষমতা ও অর্থের মোহ ছিল না। জিয়া,এরশাদ, খালেদা ও হাসিনা তাঁকে ক্ষমতা দিতে চেয়েছেন, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। তিনি সব সময় মানবমুক্তির কথা চিন্তা করেছেন।
তিনি বলেছেন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে জনগণের কল্যাণে একটি রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নেই। প্রয়োজন নতুন রাজনীতি ও নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তিনি প্রতিহিংসামুক্ত সম্প্রীতিময় রাজনীতির কথা বলেছেন। বাম ও ডানপন্থী সবাই ভুল পথে চলছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সহ বিশ্বে যে গণতন্ত্র চলছে, সে গণতন্ত্রে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের উদার গণতন্ত্র পাঁচ শতাংশ লোকের জন্য প্রযোজ্য, আর এই পাঁচ শতাংশ লোক সমাজের, রাষ্ট্রের ৯৫ শতাংশ লোকের রক্ত শোষণ করছে গোটাবিশ্বে । তিনি জাতিসংঘকে অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যায়িত করে জাতিসংঘকে পুনর্গঠন করে রাষ্ট্রসংঘ করার কথা বলেছেন এবং কোনো দেশের অধীনে সেনাবাহিনী না রাখারও প্রস্তাব দিয়েছেন। সেনাবাহিনী থাকবে শুধু রাষ্ট্রসংঘের অধীনে। তিনি যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী দেখতে চেয়েছেন। সম্প্রীতিময় বিশ্বশান্তির কথা বলেছেন। সারা জীবন কর্তৃত্ববাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লিখেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানবজাতির শত্রু এবং কারো বন্ধু হতে পারেনা। তাঁর চিন্তা-চেতনাই ছিল মানুষের সর্বজনীন কল্যাণ। তিনি শুধু বাংলাদেশের জনগণের কথা ভাবেননি, বিশ্ব মানব মুক্তির কথা ভেবেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব।
তিনি সমাজ ও রাষ্ট্র সংস্কার এবং কৃষক-শ্রমিক, মজলুম ও মেহনতি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য প্রায় দীর্ঘ ৭০ বছর সংগ্রাম করেছেন তাঁর লেখার মাধ্যমে। তিনি বলেছেন দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মুক্তি হয়নি। মুক্তি হয়েছে কিছু রাজনীতিক, আমলা ও অসাধু ব্যবসায়ীর এবং এদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনটি নির্বাচন সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন ২০১৪ সালে বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে ভুল করেছে। আর ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ভুল করেছে এবং ২০২৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কাছে শেখ হাসিনা মাথা নতো না করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করবেন ঠিকই , কিন্তু ছয় মাসের বেশি শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না বলেছিলেন। তিনি তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে বলে মনে করতেন।
তিনি সব দলের সর্বজনীন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলতেন। তিনি বলেছেন কেবল নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে। জুলাই আন্দোলনকে বিপ্লবী আন্দোলন মনে করেননি, এটা ছিল কোটা সংস্কারের আন্দোলন। শেখ হাসিনা যদি ছাত্রদেরকে ডেকে কাছে নিতেন তাহলে এই আন্দোলন বেগমান হতো না। তাঁর আত্ম-অহংকারী একগুয়েমি মনোভাবের কারণে এটা হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রমহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকার ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোনীত এনজিও সিভিল সোসাইটি সরকার।

আজকের সমাজে যখন মানবিক মূল্যবোধ নানা সংকটের মুখোমুখি, তখন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের জীবনাদর্শ আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর কর্ম, চিন্তা ও ত্যাগ নতুন প্রজন্মকে মানবসেবায় উদ্বুদ্ধ করবে। একজন শিক্ষক, সমাজচিন্তক, রাষ্ট্রচিন্তক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং মানবপ্রেমিক মানব হিসেবে তিনি মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো মানুষ বারবার জন্ম নেন না। তিনি ছিলেন মেহনতি মানুষের বন্ধু, ন্যায়ের পক্ষে একজন দৃঢ় কণ্ঠস্বর এবং মানবতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তার আদর্শ ও অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথচলায় আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।

লেখক পরিচিতি : এমএ আলীম সরকার : প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তির পার্টি (বিজিপি)।

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক  সহজ-সরল, কৃষক-শ্রমিক, মজলুম মানুষের মুক্তির কণ্ঠস্বর ও আলোকবর্তিকা_এমএ আলীম সরকার

ভাইরাল রিলের বিতর্ক পেরিয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পাল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল থেকে স্বীকৃতির মঞ্চে; ২০১৩ সাল থেকে শিক্ষকতা, আনন্দঘন পাঠদান ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থা

নিজস্ব প্রতিনিধি : একটি গান, একটি রিল ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও ট্রল। ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল ভার্চুয়াল জগতে। নানা মন্তব্য আর সমালোচনার মধ্যে একসময় ভিডিওটি সরিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই বিতর্কের কয়েক মাস পরই সামনে এলো তাঁর শিক্ষকতা জীবনের আরেকটি পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাকে পেছনে ফেলে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিউটি রানী পাল।

তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে চারজনকে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁদের একজন বিউটি রানী পাল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর স্বাক্ষর করা একটি স্মারকের মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষকদের নাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও সেখানে বিউটি রানী পালের নাম ছিল না।

যে রিল ঘিরে আলোচনাঃ

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ‘ডিফরেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় একটি গানের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি রানী পাল। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’—গানের এই অংশ ব্যবহারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটির সঙ্গে নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে তা প্রচার করা হলে তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও ট্রল। সাইবার বুলিংয়ের মুখে একপর্যায়ে ভিডিওটি সরিয়ে নেন তিনি।

তবে ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল একজন শিক্ষককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকার শত শত নারী শিক্ষক একই গানের সঙ্গে নিজেদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। শিক্ষক সমাজের এমন অভিনব প্রতিবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সংহতি প্রকাশ করেন।

ফলে একটি ব্যক্তিগত রিল ভিডিওকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনা পরিণত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী শিক্ষকদের প্রতি আচরণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অনলাইন হয়রানি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায়।

বিতর্কের বাইরে অন্য এক পরিচয়ঃ

তবে বিউটি রানী পালের শিক্ষকতা জীবনের গল্প শুরু হয়নি ওই রিল ভিডিও দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত তিনি। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সৃজনশীল নানা কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন তিনি। আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শরীরচর্চা এবং নাচের ছন্দে পড়াশোনাকে সহজ করে তোলার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এসব উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এর আগেও তিনি একবার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো জেলা পর্যায়ের এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বনাম শ্রেণিকক্ষঃ

বিউটি রানী পালের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। অনলাইনে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও যেমন দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তেমনি সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মন্তব্য বা প্রচারণাও মুহূর্তে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে একজন শিক্ষকের প্রকৃত কাজের পরিধি অনেক দীর্ঘ। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, তাদের আগ্রহ তৈরি করা, শেখার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার মূল্যায়ন একটি রিল ভিডিওর কয়েক মিনিটের দৃশ্য দিয়ে করা সম্ভব নয়।

বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা তাঁকে আলোচনায় এনেছিল। কিন্তু জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের কাজ ও অবদানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্বীকৃতি কি বদলে দেয় আলোচনার ভাষা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ দ্রুত মতামত দেয়। সেখানে প্রেক্ষাপট, দীর্ঘমেয়াদি কাজ কিংবা একজন ব্যক্তির সামগ্রিক পরিচয় অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। বিউটি রানী পালের ঘটনাতেও প্রথমে সামনে এসেছিল একটি রিল ভিডিও। পরে সামনে এসেছে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পাঠদানের বিষয়টি।

জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার তথ্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই ব্যক্তিকে ঘিরে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তাঁর পেশাগত কাজের স্বীকৃতিও রয়েছে—দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে।

শিক্ষকের পরিচয় শ্রেণিকক্ষেইঃ

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর শ্রেণিকক্ষের কাজ—শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বাইরে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের এই দিকটিই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার।

একটি রিল তাঁকে পরিচিত করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; আর শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ তাঁকে এনে দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিউটি রানী পালের গল্পটি যেন মনে করিয়ে দেয়—ভার্চুয়াল জগতের কয়েক মুহূর্তের আলোচনার চেয়ে একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের কাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক  সহজ-সরল, কৃষক-শ্রমিক, মজলুম মানুষের মুক্তির কণ্ঠস্বর ও আলোকবর্তিকা_এমএ আলীম সরকার

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের বিশেষ অনুদান দেবে সরকার; ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন, শেষ সময় ১৫ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ অনুদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা এবং অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এ অনুদান দেওয়া হবে।

এবার অনলাইনের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির মাধ্যমে সুপারিশকৃত আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে পৌঁছাতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিচালন বাজেটের আওতায় বিশেষ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থ বিতরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাইগভ প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত, দুর্গম, উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকার অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যে খাতে দেওয়া হবে অনুদান:

বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মেরামত ও সংস্কার, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা, প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা এবং পাঠাগার উন্নয়নে বিশেষ অনুদান দেওয়া হবে।

এ ছাড়া বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনাজনিত কারণে আর্থিক সহায়তার জন্যও আবেদন করা যাবে।

অগ্রাধিকার পাবেন যেসব শিক্ষার্থীঃ

সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

দুরারোগ্য ব্যাধি ও দৈব দুর্ঘটনায় আক্রান্ত, দুস্থ, মেধাবী, এতিম, অদম্য মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অসহায় ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন।

দেশের উপকূলীয়, চরাঞ্চল, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদেরও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যেভাবে করতে হবে আবেদনঃ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। আর স্নাতক বা সমমান এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে জমা দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রার আবেদনগুলো গ্রহণ করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে একত্র করবেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।

অনলাইন ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাতে দ্বৈতভাবে সুপারিশ না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ জন্য জেলা কমিটি আগে অনলাইনে সুপারিশ করা তালিকার সঙ্গে নতুন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাওয়া আবেদনসমূহ সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে।

নির্ধারিত আবেদন ফরম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট www.shed.gov.bd-এ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

সময়সীমা ১৫ অক্টোবরঃ

প্রতিষ্ঠান প্রধান, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাওয়া আবেদন জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবে। সুপারিশকৃত তালিকা আগামী ১৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার মধ্যে সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর পৌঁছাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া কোনো আবেদন বিবেচনা করা হবে না।

শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা যেন কেবল শহর কিংবা সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে সরকারি সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক  সহজ-সরল, কৃষক-শ্রমিক, মজলুম মানুষের মুক্তির কণ্ঠস্বর ও আলোকবর্তিকা_এমএ আলীম সরকার

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

—— মানিক লাল ঘোষ ——
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে কজন বিপ্লবীর নাম সাহস, আত্মত্যাগ ও দুর্জয় প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নারী ছিলেন না; ছিলেন এমন এক সময়ের অদম্য কণ্ঠ, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নারীর জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ ছিল নানা বাধায় পরিপূর্ণ। মাত্র ২১ বছরের জীবনে প্রীতিলতা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয়।
২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর শহীদ হওয়ার দিন। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে—যিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভায় চাকরি করতেন এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন গৃহিণী। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও মননশীল।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই অসাধারণ সাফল্য প্রমাণ করে, প্রীতিলতা কেবল সাহসী বিপ্লবীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গভীর মননশীল ও মেধাবী নারীও।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। নন্দনকানন অপরনাচরণ স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন এবং পরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বও পালন করেন। একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশাজীবন তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু দেশের পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং বৈষম্যের বাস্তবতা তাঁকে অন্য এক পথে টেনে নেয়।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রীতিলতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকে। ঢাকায় পড়াশোনার সময় তিনি দীপালি সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন—যে সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের শারীরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান সংগঠক মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ তখন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু প্রীতিলতা ধীরে ধীরে সংগঠনের আস্থা অর্জন করেন। গোপন যোগাযোগ, বিপ্লবীদের সহায়তা, সংবাদ ও প্রচারপত্র পৌঁছে দেওয়া, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তিনি অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন সহযোগী নন, গুরুত্বপূর্ণ একজন সংগঠক ও নেতৃত্বদানের যোগ্য বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩২ সালে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলন তখন চট্টগ্রামে তীব্রতর। এরই মধ্যে পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থায় ক্লাবটি ছিল ইউরোপীয়দের সামাজিক আধিপত্য ও বর্ণবৈষম্যের একটি প্রতীক। ক্লাবটির প্রবেশপথে থাকা ‘Dogs and Indians not allowed’ ধরনের বর্ণবাদী বার্তা ভারতীয়দের প্রতি ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার নির্মম প্রকাশ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এই ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র আক্রমণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতার ওপর অর্পিত হয়। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে, যা ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহর পর্যন্ত গড়ায়, তিনি বিপ্লবীদের একটি দল নিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করেন। পুরুষের ছদ্মবেশে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবীরা ক্লাবে হামলা চালায় এবং ভবনের অংশবিশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন এবং একপর্যায়ে তিনি বিচ্ছিন্ন ও ঘেরাও হয়ে পড়েন।
প্রীতিলতা জানতেন, ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে। বিপ্লবীদের মধ্যে বন্দিত্ব এড়ানোর জন্য সায়ানাইড বহনের পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তী ময়নাতদন্তে জানা যায়, গুলির আঘাতটি প্রাণঘাতী ছিল না; সায়ানাইড বিষক্রিয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।
প্রীতিলতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি জীবন থেমে গেলেও তাঁর আদর্শ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস থেমে যায়নি। তিনি হয়ে উঠলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক। সমকালীন ও পরবর্তী ইতিহাসচর্চায় তাঁকে বাংলার প্রথম নারী শহীদদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
প্রীতিলতার জীবনকে শুধু তাঁর মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে বিচার করলে তাঁর সংগ্রামের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। একজন মেধাবী ছাত্রী থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে বিপ্লবী সংগঠক এবং শেষ পর্যন্ত একটি সশস্ত্র অভিযানের নেত্রী—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাই তাঁর জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য।
আজকের দিনে প্রীতিলতাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই মূল্যবোধগুলো একজন মানুষকে ইতিহাসের অংশ করে তুলতে পারে। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর তাঁর স্মৃতি অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে।
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন অগ্নিঝরা এক জীবন, যার দীপ্তি মাত্র ২১ বছরের আয়ুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে।
শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)