দুটি লোহার পাত, এক মাসের ক্ষোভ—শেষ পর্যন্ত রক্ত ঝরল আবারও
দুটি লোহার পাত, এক মাসের ক্ষোভ—শেষ পর্যন্ত রক্ত ঝরল আবারও
বিচার না হওয়ার অভিযোগে শাহরাস্তিতে দুই দফা সংঘর্ষ; মামলা, আতঙ্ক আর শান্তি ফেরানোর দাবি
মোঃ হাবিবুর রহমান ভূইয়া ও মোঃ রুহুল আমিন, শাহরাস্তি (চাঁদপুর) থেকে : একটি গ্রামের শান্ত পরিবেশ ভেঙে দিতে কখনো বড় কোনো কারণের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো দুটি সাধারণ লোহার পাত, কিছু ভুল–বোঝাবুঝি, কয়েকটি উত্তপ্ত বাক্য আর সময়মতো সমাধান না হওয়ার ক্ষোভই যথেষ্ট। চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার মনিপুর গ্রামে ঠিক এমনই একটি ঘটনার পরিণতি হয়েছে দুই দফা সংঘর্ষে। এক মাসের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন একাধিক কিশোর ও যুবক, থানায় হয়েছে মামলা, আর পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বেগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রথম সংঘর্ষের পর যদি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্যভাবে বিরোধের নিষ্পত্তি করা হতো, তাহলে দ্বিতীয় দফার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের প্রয়োজনই পড়ত না।
ঘটনাটি শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মনিপুর গ্রামের।
স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১০ জুন রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে ওয়াছেক বেপারীর বাড়িতে আবদুল ওহাবের ঘরের সামনে প্রথম সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সেদিন গ্রামের একটি বিয়েবাড়িতে গায়েহলুদের অনুষ্ঠান চলছিল। আনন্দ–উৎসবের সেই পরিবেশ মুহূর্তেই উত্তেজনায় রূপ নেয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন কিশোরের সঙ্গে রাকিব, সায়ন ও সিয়াম নামে তিন কিশোরের কথাকাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে তিনটি টাচ মোবাইল ফোন ভেঙে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় আহত হন ওবায়দুল (১৪), ফাহিম (১৯) ও তাফসিক (১৬)। আহতদের স্বজনদের দাবি, ওবায়দুল ও ফাহিমের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং তাঁদের চিকিৎসা নিতে হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক স্থানীয় সূত্র বলছে, পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দুটি স্টিলের (লোহার) পাত। এক পক্ষ সেগুলোকে ধারালো অস্ত্র বলে সন্দেহ করলেও পরে জানা যায়, সেগুলো ছিল সাধারণ লোহার পাত। কিন্তু ততক্ষণে ভুল ধারণা, উত্তেজনা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস সংঘর্ষের রূপ নিয়ে ফেলেছে।
প্রথম সংঘর্ষের পর স্থানীয়ভাবে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বিএনপির নেতা আবদুল ওহাব ও তাঁর ছেলে মানিক উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে বিচার করার আশ্বাস দেন। কিন্তু সময় গড়ালেও সেই বৈঠক আর হয়নি। এক মাস পার হয়ে গেলেও কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান না আসায় আহত পক্ষের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এই দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তাই পরবর্তী সংঘর্ষের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৭ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শিক্ষক মো. জসিম উদ্দিনের বাড়ির সামনে আবাও মুখোমুখি হয় দুই পক্ষ। অভিযোগ রয়েছে, প্রথম ঘটনায় আহত হওয়া কয়েকজন পাল্টা হামলা চালালে রাকিব নামে এক কিশোর আহত হন এবং তাঁর নাক ফেটে যায়। এতে এলাকায় আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনাস্থলের আশপাশের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, এক মাস ধরে বিরোধের কোনো স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সুযোগ পেলেই তা আবার সংঘর্ষে রূপ নেয়।
শিক্ষক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিরোধের জের। এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা কিছু গণমাধ্যমে যেভাবে রাজনৈতিক সংঘর্ষ হিসেবে এঘটনাকে রুপদিয়ে প্রচার করা হয়েছে, সেটি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”
দ্বিতীয় সংঘর্ষের পর বিষয়টি আর স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এঘটনায় শাহরাস্তি মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
শাহরাস্তি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান বলেন, “মারামারির ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। মামলার নম্বর-১৭, তারিখ ৮ জুলাই ২০২৬।”
তবে মামলায় অভিযুক্তদের স্বজনদের অভিযোগ, তাঁরা থানায় গিয়ে মামলার অনুলিপি সংগ্রহের চেষ্টা করলেও তাৎক্ষণিকভাবে সেটি পাননি।
স্থানীয় বিএনপির নেতা আবদুল ওহাব প্রথমে ঘটনার বিষয়ে কিছু জানেন না বলে মন্তব্য করলেও পরে বলেন, “মারামারির পর দুই পক্ষকে নিয়ে বসে স্থানীয়ভাবে বিচার করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু উভয় পক্ষের অসহযোগিতার কারণে বৈঠকটি আর সম্ভব হয়নি।”
সরেজমিনে গিয়ে বাদী ও বিবাদীপক্ষের কাউকে পাওয়া না যাওয়ায় তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটিকে রাজনৈতিক সংঘর্ষ হিসেবে উপস্থাপনেরও চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের দাবি, এটি কোনো রাজনৈতিক বিরোধ নয়; বরং ব্যক্তিগত ভুল–বোঝাবুঝি, ক্ষোভ এবং স্থানীয় দ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা বলছেন, একটি ছোট ভুল–বোঝাবুঝি কীভাবে বড় সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, মনিপুর গ্রামের ঘটনা তার বাস্তব উদাহরণ। তাঁদের মতে, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কিংবা কার্যকর মধ্যস্থতার অভাব অনেক সময় বিরোধকে আরও জটিল করে তোলে। ক্ষোভ জমতে জমতে একসময় তা প্রতিশোধের রূপ নেয়, যার মূল্য দিতে হয় পুরো সমাজকে।
তাঁদের ভাষায়, একটি সংঘর্ষ কখনো কেবল কয়েকজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে পরিবারে, প্রতিবেশী সম্পর্কে, সামাজিক সম্প্রীতিতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিকতায়ও। তাই ছোট বিরোধকে ছোট থাকতেই সমাধান করা জরুরি।
এখন মনিপুর গ্রামের মানুষের প্রত্যাশা একটাই—প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করবে, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে এবং এমন উদ্যোগ গ্রহণ করবে, যাতে আর কোনো তুচ্ছ ভুল–বোঝাবুঝি একটি গ্রামের শান্ত পরিবেশকে রক্তাক্ত করে তুলতে না পারে।






