বান্দরবান সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয়ের নিকট একটি খোলা চিঠি”
বান্দরবান সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয়ের নিকট একটি খোলা চিঠি"
মোহাম্মদ আকাশ, বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি : একটি আধুনিক ল্যাব। নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি। দক্ষ প্রশিক্ষকের হাতে হাতে গড়ে ওঠা একজন তরুণ কারিগর। রাষ্ট্রের কারিগরি শিক্ষার স্বপ্নের ছবিটা এমনই হওয়ার কথা। কিন্তু সেই স্বপ্নের ভেতর এখন উঠে এসেছে আরেকটি প্রশ্ন—সীমিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ কি নতুন প্রশাসনিক পদ সৃষ্টি ও পদোন্নতিতে ব্যয় হবে, নাকি তা বিনিয়োগ হবে দক্ষ জনশক্তি তৈরির মূল অবকাঠামো নির্মাণে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই দেশের কারিগরি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট একদল সচেতন শিক্ষক ও শুভানুধ্যায়ী মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন। তাঁদের আবেদন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়; বরং কারিগরি শিক্ষার মূল দর্শন, রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়নের স্বার্থে।
চিঠির শুরুতেই শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, দক্ষতানির্ভর ও যুগোপযোগী করার উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়েছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং কর্মমুখী শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে তাঁরা বলেছেন, এই অগ্রযাত্রা আরও ফলপ্রসূ করতে নীতিগত সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণ হলো টেকনিক্যাল শিক্ষা। এখান থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা শিল্পকারখানা, নির্মাণখাত, প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থায় দক্ষ কর্মী হিসেবে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেন। তাই এ শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত দক্ষতা সৃষ্টি।
লেখকেরা উল্লেখ করেন, বর্তমানে নন-টেকনিক্যাল ইনস্ট্রাক্টরদের জন্য ব্যাপক পদোন্নতি, নতুন প্রশাসনিক পদ সৃষ্টি এবং তাঁদের প্রতিষ্ঠানপ্রধান (প্রিন্সিপাল) পর্যন্ত পদোন্নতির সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তাঁদের মতে, বিষয়টি বাস্তব প্রয়োজন ও কারিগরি শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্য বিবেচনায় গভীরভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
চিঠিতে বলা হয়, বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সামাজিক বিজ্ঞানের মতো সাধারণ বিষয়গুলো কারিগরি শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য। কারণ এসব বিষয় তাঁদের সাধারণ শিক্ষা ধারার সমমান অর্জনে সহায়তা করে। তবে এসব বিষয় কারিগরি শিক্ষার সহায়ক অংশ; মূল কারিগরি প্রশিক্ষণের বিকল্প নয়।
তাঁদের যুক্তি, প্রতিটি সাধারণ বিষয়ের জন্য পৃথক বিভাগ, পৃথক চিফ ইনস্ট্রাক্টর এবং আরও উচ্চতর প্রশাসনিক পদ সৃষ্টি রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নাও হতে পারে। একই অর্থ যদি নতুন ট্রেড চালু, আধুনিক ল্যাব স্থাপন, উন্নত যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং অতিরিক্ত টেকনিক্যাল শিক্ষক নিয়োগে ব্যয় করা হয়, তাহলে আরও বেশি শিক্ষার্থী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে। এতে শিল্পখাত প্রয়োজনীয় জনবল পাবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
চিঠিতে প্রশাসনিক নেতৃত্ব নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, একটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রযুক্তি, ল্যাব ব্যবস্থাপনা, শিল্পখাতের চাহিদা, দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন এবং কারিকুলাম বাস্তবায়নের মতো জটিল বিষয়। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে কারিগরি পটভূমিসম্পন্ন কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, নন-টেকনিক্যাল ইনস্ট্রাক্টরদের জন্য ইতোমধ্যে একটি চিফ ইনস্ট্রাক্টর পদ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী নিয়োগবিধিতে ছিল না। ফলে নতুন করে আরও প্রশাসনিক স্তর বা পদোন্নতির সুযোগ তৈরির আগে এর প্রয়োজনীয়তা, যৌক্তিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গভীরভাবে মূল্যায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
চিঠিতে চারটি সুস্পষ্ট দাবি জানানো হয়েছে—নন-টেকনিক্যাল ইনস্ট্রাক্টরদের জন্য অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি ও পদোন্নতির প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা, নতুন কারিগরি বিভাগ, আধুনিক ল্যাব, যন্ত্রপাতি ও টেকনিক্যাল শিক্ষক নিয়োগে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রশাসনিক নেতৃত্বে কারিগরি পটভূমিসম্পন্ন কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির মূল লক্ষ্যকে অক্ষুণ্ন রাখা।
চিঠির শেষাংশে শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি আস্থা রেখে বলা হয়েছে, সিদ্ধান্ত এমন হওয়া উচিত, যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়, বরং দেশের কারিগরি শিক্ষা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং জাতীয় উন্নয়নের বৃহত্তর স্বার্থই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
কারিগরি শিক্ষা শুধু একটি শিক্ষাব্যবস্থা নয়; এটি হাজারো তরুণের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন, দেশের শিল্পায়নের ভিত্তি এবং উন্নত বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম শক্তি। সেই শক্তিকে আরও কার্যকর ও ভবিষ্যতমুখী করে তোলার প্রশ্নেই আজ উচ্চারিত হচ্ছে এই আবেদন—পদোন্নতির চেয়ে বড় হোক দক্ষ জনশক্তি তৈরির অঙ্গীকার।






