ব্রহ্মপুত্রের তীব্র ভাঙন ‘জন্মভিটা ছাইড়া নয়া জায়গায় ক্যামনে থাকমু’
ব্রহ্মপুত্রের তীব্র ভাঙন 'জন্মভিটা ছাইড়া নয়া জায়গায় ক্যামনে থাকমু’
আরমান হোসেন রাজু, রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার : সূর্য তখন মাত্র উঠেছে। ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে ছোট্ট একটি নৌকা ধীরে ধীরে পাড় ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নৌকায় স্তূপ করে রাখা হয়েছে টিনের চাল, বাঁশের বেড়া, খাট, আলমারি, ধানের বস্তা, রান্নার হাঁড়ি-পাতিল—একটি পরিবারের গোটা জীবনের সঞ্চয়। সেই মালপত্রের ওপর নির্বাক হয়ে বসে আছেন রফিকুল ইসলাম (৪০)। তার চোখ স্থির হয়ে আছে নদীর দিকে, যেখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হারিয়ে যাবে তার জন্মভিটার শেষ চিহ্নটুকুও।
কথা বলতে চাইলে বারবার গলা ধরে আসে। কারণ, এ যাত্রা শুধু বাড়ি বদলের নয়; এটি শেকড় ছিঁড়ে অজানার পথে পাড়ি দেওয়ার যাত্রা।
ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙনে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চর বিশারপাড়া গ্রাম ছেড়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিতে যাচ্ছেন তিনি।
চর বিশারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রফিকুলের পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী স্বর্ণা বেগম (৩৫), ছেলে শফিকুল ইসলাম (১৬), মেয়ে বিউটি আক্তার (১১) এবং বৃদ্ধা মা জোছনা বেওয়া (৬৮)।
মাত্র চার দিন আগেও তিনি ছিলেন ১২ বিঘা আবাদি জমি ও ১০ শতাংশের একটি বসতভিটার মালিক। সেই জমিতে ছিল ধান, ভুট্টা ও নানা ফসল। উঠোনজুড়ে ছিল ফলের গাছ, স্মৃতি আর স্বপ্ন। আজ সবই ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে।
স্থানীয়দের সহযোগিতায় কোনো রকমে তিনটি টিনের ঘর, কিছু আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নিতে পেরেছেন। কিন্তু চর বিশারপাড়ায় নতুন করে ঘর তোলার মতো এক ইঞ্চি জমিও আর অবশিষ্ট নেই। তাই প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের হকের চরে মামার বাড়িতে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
রফিকুল বলেন, এই চরেই তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, সংসার, সন্তানের শৈশব—সবকিছু। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “এই চরে জন্ম নিছি, এই চরে বড় হইছি, এই চরেই সংসার গড়ছি। এখন সব নদীর পেটে। জন্মভিটা ছাইড়বার মন চায় না, কিন্তু আমগোরে থাইকবার জায়গা নাই। ব্রহ্মপুত্র সবকিছুই গিল্যা খাইছে। চোখের পানি থামে না। জন্মভিটা ছাইড়া নয়া জায়গায় ক্যামনে থাকমু?”
রফিকুলের স্ত্রী স্বর্ণা বেগমের চোখেও একই বেদনা। শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, “আংগোরে বেকটি শ্যাষ হয়ই গ্যালো। এ্যাহোন আংগো থাকার জায়গাও নাইকা। আমগোরে লইয়া নয়া জায়গায় যাইতাছেন। নয়া জায়গায় ক্যামনে থাকমু?”
তিনি জানান, নদীতে ভেঙে যাওয়ার আগে বসতভিটার সামান্য অংশ তখনও টিকে ছিল। সেই শেষ উঠোনেই রবিবার সকালে খোলা আকাশের নিচে পরিবারের জন্য শেষবারের মতো রান্না করেছেন। খাওয়া শেষে সবাই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসেছিলেন। কারণ তারা জানতেন, এই উঠোনে আর কোনোদিন চুলা জ্বলবে না। স্বর্ণা বলেন, “বাপের ভিটা ছাইড়া স্বামীর ভিটায় আইছিলাম। এখন স্বামীর ভিটাও নদীতে গেল। এহন আবার অচেনা জায়গায় যাইতাছি। এই উঠোনে আর কোনোদিন রান্না হইবো না, সবাই একসাথে বসে খাওয়াও হইবো না। আমগোর কপালটাই খারাপ।”
রফিকুলের মতোই ঘরবাড়ি গুটিয়ে নিচ্ছেন আফজাল হোসেন (৬০)। তার নৌকাতেও স্তূপ করে রাখা হয়েছে টিনের ঘর, আসবাবপত্র, ফসল আর সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। গত চার দিনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে তার আট বিঘা আবাদি জমি ও বসতভিটা।
আফজাল বলেন, “২০ বছর বয়সে এই গ্রামে বাড়ি করছি। এই গ্রামের প্রতি অনেক মায়া। ব্রহ্মপুত্র সব মায়া কাইটা দিল। এখন প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের দৈখাওয়ার চরে নতুন করে ঘর তুলতে যাইতাছি। জানি না আবার কবে এই ভাঙনের মুখে পড়তে হয়।”
চর বিশারপাড়া গ্রামের কৃষক আবদার আলী জানান, ব্রহ্মপুত্রের বুকের এই চরে প্রায় ২৫০টি পরিবারের বসবাস। প্রায় সবাই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ ভাঙনে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৫টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের বসতভিটা ও কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন এখনও অব্যাহত রয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন জমি ও ঘরবাড়ি নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “৬৫টি পরিবারের মধ্যে ৩০টি পরিবার ইতোমধ্যে অন্য চরে চলে গেছে। বাকি ৩৫টি পরিবার সরকারি খাসজমিতে অস্থায়ীভাবে ঘর তুলে কোনোমতে আশ্রয়ের চেষ্টা করছে। অনেকেই আবার ভাঙনের আতঙ্কে আগেভাগেই বাড়িঘর খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন।”
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, তার ইউনিয়নের চারটি গ্রামে ভাঙন শুরু হলেও সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি চর বিশারপাড়ায়।
তিনি বলেন, “যেভাবে ভাঙন চলছে, তাতে অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো চরটি নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। ভাঙন ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বারবার আবেদন করা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি খাসজমিতে আশ্রয় নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য সরকারি ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অনুরোধ করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, চর বিশারপাড়া ব্রহ্মপুত্রের মাঝচরে অবস্থিত এবং চারদিকে নদ পরিবেষ্টিত।
তিনি বলেন, “চরাঞ্চলে ভাঙন প্রতিরোধে সরকারের নিয়মিত কোনো বরাদ্দ থাকে না। তাই তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। তবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
চর বিশারপাড়ায় এখন প্রায় প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে একই দৃশ্য—কেউ ঘর খুলছেন, কেউ নৌকায় তুলছেন সংসারের শেষ সম্বল, কেউবা নদীর দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছেন। শিশুদের হাসি, উঠোনের কোলাহল, পাখির ডাক—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র।






