শিশুর শৈশব ফিরিয়ে দিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা জরুরি
শিশুর শৈশব ফিরিয়ে দিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা জরুরি
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিশুদের হাতে। আর সেই ভবিষ্যতের ভিত গড়ে ওঠে প্রাথমিক শিক্ষায়। তাই প্রাথমিক শিক্ষা কেমন হবে, কতক্ষণ হবে এবং কীভাবে হবে—এসব প্রশ্ন কেবল শিক্ষানীতির বিষয় নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রশ্ন।
বর্তমানে দেশের সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত—প্রায় সাত ঘণ্টার বিদ্যালয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু যেসব শিশু এই বিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করে, তাদের বয়স মাত্র সাড়ে চার থেকে দশ বছর। প্রশ্ন হলো, এত অল্প বয়সী একটি শিশুর জন্য সাত ঘণ্টার বিদ্যালয়জীবন কতটা যুক্তিযুক্ত?
শিশুর বিকাশ কেবল বই পড়ার মাধ্যমে হয় না। খেলা, বিশ্রাম, পরিবার, প্রকৃতি ও অবাধ কৌতূহল—এসবই শিশুর শেখার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আন্তর্জাতিকভাবে শিশুর বিকাশ নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, খেলাধুলা ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম শিশুর মানসিক সক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং শেখার আগ্রহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ দীর্ঘ বিদ্যালয় সময়সূচির কারণে আমাদের অনেক শিশুই সেই স্বাভাবিক শৈশব থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
আমরা প্রায়ই শিক্ষার মান উন্নয়নের কথা বলি। কিন্তু শিক্ষার মান কি শুধু বিদ্যালয়ে কাটানো সময়ের ওপর নির্ভর করে? নাকি নির্ভর করে সেই সময়ের কার্যকারিতা, শিক্ষণপদ্ধতি এবং শিশুর শেখার আনন্দের ওপর? বাস্তবতা হলো, ক্লান্ত ও অবসন্ন একটি শিশু শ্রেণিকক্ষে বসে থাকলেও কার্যকরভাবে শেখে না। বরং স্বল্প সময়ের পরিকল্পিত, অংশগ্রহণমূলক ও আনন্দময় পাঠদান অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।
তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি পুনর্বিবেচনার দাবি অযৌক্তিক নয়। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত পাঠদান পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করবে, তেমনি খেলাধুলা, বিশ্রাম ও পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠারও পর্যাপ্ত সুযোগ পাবে। একটি শিশুর সুস্থ শৈশব নিশ্চিত করা মানেই তার ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করা।
তবে এই আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে—প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। শিশুদের শিক্ষা দেওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল, সংবেদনশীল ও দায়িত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি। একটি শিশু কেবল পাঠ্যবই শেখে না; সে একজন শিক্ষকের আচরণ, মূল্যবোধ, ভাষা ও মানবিকতা থেকেও শিক্ষা নেয়। ফলে একজন শিক্ষককে প্রতিদিন নতুনভাবে প্রস্তুত হতে হয়, পাঠ পরিকল্পনা করতে হয়, নতুন শিক্ষণপদ্ধতি জানতে হয় এবং নিজের জ্ঞানকে নিয়মিত সমৃদ্ধ করতে হয়।
কিন্তু দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে অনেক শিক্ষক সেই প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় সময় পান না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তুলনামূলক কম বেতন-ভাতা, যা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও সরকার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিষয়ে ইতিবাচক উদ্যোগের কথা জানিয়েছে, বাস্তবায়নের গতি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
একটি পুরোনো প্রবাদ আছে—”পেটে থাকলে পিঠে সয়।” একজন শিক্ষক যদি ন্যায্য মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ পান, তবে তিনি আরও আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারবেন। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকের কল্যাণকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে আমাদের ভাবনায় তাই একটি ভারসাম্য প্রয়োজন। একদিকে শিশুর শৈশব, খেলাধুলা ও বিশ্রামের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে; অন্যদিকে শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময়, গবেষণার সুযোগ এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষার লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়; একজন সুস্থ, সৃজনশীল, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলা।
শৈশবকে দীর্ঘ শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে বন্দি না রেখে, তাকে শেখার আনন্দে, খেলার উচ্ছ্বাসে এবং মানবিক বিকাশের স্বাধীনতায় ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। কারণ একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া শৈশব কোনো জাতির জন্য কখনোই অগ্রগতির প্রতীক হতে পারে না।






