জরাজীর্ণ ভবন, নেই পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, ওয়াশ ব্লক ও টয়লেট—আধুনিক ভবনের অপেক্ষায় কাজির কামতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
জরাজীর্ণ ভবন, নেই পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, ওয়াশ ব্লক ও টয়লেট—আধুনিক ভবনের অপেক্ষায় কাজির কামতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
নিজস্ব প্রতিনিধি, শাহরাস্তি (চাঁদপুর) থেকেঃ “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড”—এই বহুল উচ্চারিত সত্যের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেবল পাঠদানের স্থান নয়, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সূতিকাগার। অথচ সেই ভবিষ্যৎ গড়ার কারখানাই যদি প্রতিদিন নিরাপত্তাহীনতায় থাকে, তবে তা শুধু উদ্বেগের নয়, গভীর হতাশারও বিষয়।
চাঁদপুরের শাহরাস্তি পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত কাজির কামতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে ঠিক এমনই এক সংকটময় বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে। বিদ্যালয়ের মাঝখান দিয়েই চলে গেছে একটি জনসাধারণের রাস্তা। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই রাস্তা পার হয়ে এক শ্রেণিকক্ষ থেকে অন্য শ্রেণিকক্ষে যেতে হয় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। পাশাপাশি জরাজীর্ণ ভবন, শ্রেণিকক্ষের সংকট, আধুনিক ওয়াশ ব্লক ও টয়লেটের অভাব—সব মিলিয়ে বিদ্যালয়টি এখন অবকাঠামোগত সংকটের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি।
১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে। এখান থেকে শিক্ষালাভ করে অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ২১১ জন শিক্ষার্থী এবং ৮ জন শিক্ষক রয়েছেন। বিদ্যালয়ের নামে রয়েছে ৩৩ শতাংশ নিজস্ব জমি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠার সময় যাতায়াতের সুবিধার্থে বিদ্যালয়ের জমির ওপর দিয়ে তৈরি হওয়া একটি ছোট রাস্তা সময়ের ব্যবধানে এখন বিদ্যালয়ের মাঝ বরাবর স্থায়ী চলাচলের রাস্তায় পরিণত হয়েছে। ফলে বিদ্যালয়টি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। প্রতিদিন ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত এই রাস্তা অতিক্রম করে ক্লাসে যেতে হয়, যা যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়রা।
যদিও স্থানীয়দের উদ্যোগ ও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বিদ্যালয়ের উত্তর পাশে লাগোয়া একটি পুকুরের সমপরিমাণ জায়গা বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে রাস্তা স্থানান্তর করে বিদ্যালয়কে নিরাপদ করা যায়। ইতোমধ্যে গার্ডওয়াল নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। তবে জায়গাটি এখনও সম্পূর্ণ ভরাট না হওয়ায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হামিদা বেগম বলেন,
“আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সন্তোষজনক এবং শিক্ষার মানও ভালো। কিন্তু পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। অনেক অভিভাবক বাধ্য হয়ে সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বিদ্যালয়ের মাঝ দিয়ে চলাচলকারী রাস্তা, যা শিশুদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।”
তিনি আরও জানান, এলাকার ভূমিদাতা ও শিক্ষানুরাগীদের সহযোগিতায় রাস্তার সমস্যা সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন একটি আধুনিক একাডেমিক ভবনের বরাদ্দ, যা বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের সংকট অনেকটাই দূর করবে।
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, বিদ্যালয়ের বর্তমান অফিস ভবনটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই শিক্ষকরা সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। ভবনটি যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে ভবনটিতে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রাখার মৌখিক নির্দেশনা থাকলেও বিকল্প ভবনের অভাবে সেটিকে এখনও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া বিদ্যালয়ে আধুনিক ওয়াশ ব্লক, পর্যাপ্ত টয়লেট, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ এবং পৃথক শিক্ষক কক্ষেরও অভাব রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে রাস্তার দক্ষিণ পাশে বাউন্ডারির বাইরে দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি পুরোনো ভবন এবং বাউন্ডারির ভেতরে একটি ছোট কক্ষে কোনোরকমে পাঠদান চলছে। পাশাপাশি একটি একচালা টিনের ঘর নির্মাণকাজও চলমান রয়েছে।
এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবক ও বিএনপি নেতা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন, যিনি আগামীতে শাহরাস্তি পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তিনি বলেন, “শিক্ষার উন্নয়নই একটি উন্নত সমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি। আমি চাই কাজির কামতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আধুনিক ও নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠুক।”
তিনি জানান, চাঁদপুর-৫ (শাহরাস্তি-হাজীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য লায়ন ইঞ্জিনিয়ার মো. মমিনুল হক ইতোমধ্যে বিদ্যালয়ের জন্য একটি আধুনিক ভবন নির্মাণের বরাদ্দ চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার পাঠিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংসদ সদস্যের আন্তরিক প্রচেষ্টায় খুব শিগগিরই নতুন ভবনের অনুমোদন মিলবে এবং বিদ্যালয়ের অন্যান্য সমস্যারও পর্যায়ক্রমে সমাধান হবে।
এ বিষয়ে শাহরাস্তি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ের সার্বিক সমস্যাগুলো জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের নজরে আনা হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণ করা হবে।
দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়টির শিক্ষার মান প্রশংসনীয় হলেও অবকাঠামোগত সংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত আধুনিক ভবন নির্মাণ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, নিরাপদ ক্যাম্পাস, আধুনিক ওয়াশ ব্লক, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ, মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কারণ, একটি নিরাপদ বিদ্যালয়ই পারে একটি নিরাপদ, শিক্ষিত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করতে।






