কালের সাক্ষী সাড়ে আট দশকের ‘কাদরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের’ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার আকুতি
কালের সাক্ষী সাড়ে আট দশকের ‘কাদরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের’ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার আকুতি
শিক্ষক সংকট,অবকাঠামো ও প্রয়োজনের তুলনায় শ্রেণিকক্ষের কম হওয়ায় ব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রম; ঐতিহ্য রক্ষায় জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি
বিশেষ প্রতিনিধিঃ একটি বিদ্যালয় শুধু চার দেয়াল আর ইট-পাথরের সমষ্টি নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রথম পাঠশালা। এখানেই শিশুরা স্বপ্ন দেখতে শেখে, মানুষ হওয়ার শিক্ষা পায়, আলোকিত জীবনের পথে প্রথম পা রাখে। কিন্তু সময়ের নির্মম বাস্তবতায় চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কাদরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আজ যেন নিজেই অতীত আলো হারানোর পথে।
প্রায় ৮৫ বছরের ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিদ্যাপীঠটি একসময় ছিল এই এলাকার শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে হাজারো শিক্ষার্থীর জীবন গড়ে তুলেছে। এখানকার সাবেক শিক্ষার্থীরা আজ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ যে প্রতিষ্ঠান তাদের স্বপ্নের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানই আজ শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুরবস্থা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে ধুঁকছে।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৯৮ জন। সাতটি অনুমোদিত শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র পাঁচজন শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে প্রধান শিক্ষক এবং একজন সহকারী শিক্ষকের পদ। ফলে প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পাঠদান একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে কর্মরত শিক্ষকদের ওপর সৃষ্টি হয়েছে অতিরিক্ত চাপ। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পাঠদানের মান ও শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশে।
একজন অভিভাবক আবেগভরা কণ্ঠে বলেন,
“যে বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে আমাদের সন্তানরা স্বপ্ন দেখতে শিখেছে, যে বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে অনেকেই আজ দেশের গর্ব, সেই বিদ্যালয়কে এভাবে অবহেলায় হারিয়ে যেতে দেখতে চাই না। আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”
বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত অবস্থাও অপ্রতুল। একটি পুরোনো একতলা ভবন ও একটি টিনশেড কক্ষে চলছে পাঠদান। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজন একটি নিরাপদ, প্রশস্ত ও প্রযুক্তিবান্ধব বহুতল একাডেমিক ভবন।
বিদ্যালয়ের ওয়াশ ব্লকটি স্কুল ভবনের বাইরে অবস্থিত এবং অযত্নে ও অপরিষ্কার হয়ে পড়ে আছে। এতে প্রতিদিন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের রয়েছে একটি বিস্তীর্ণ খেলার মাঠ। কিন্তু সেখানে নেই পর্যাপ্ত ক্রীড়া সরঞ্জাম কিংবা আধুনিক খেলাধুলার পরিবেশ। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চ, ডেস্ক ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের সংকটও দীর্ঘদিনের। ফলে শিক্ষার্থীরা একটি পরিপূর্ণ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। তাদের জন্য যদি একটি নিরাপদ, আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা না যায়, তবে সেই দায় এড়ানোর সুযোগ কারও নেই। একটি জাতির ভবিষ্যৎ কখনো অবহেলার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠতে পারে না।
স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষানুরাগী, সাবেক শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকদের প্রাণের দাবি—অবিলম্বে শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ, একটি আধুনিক বহুতল একাডেমিক ভবন নির্মাণ, স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশ ব্লক স্থাপন, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ ও ক্রীড়া সামগ্রী সরবরাহের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠকে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
সাড়ে আট দশকের ইতিহাস শুধু স্মৃতির অংশ নয়—এটি একটি জনপদের আত্মপরিচয়, গর্ব ও শিক্ষার আলোকবর্তিকা। সেই আলো যেন অবহেলার অন্ধকারে নিভে না যায়। এখনই সময় দায়িত্বশীলদের এগিয়ে আসার। কারণ একটি বিদ্যালয়কে রক্ষা করা মানেই একটি প্রজন্মের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা।






