আজ সমাজ সেবক ও সাবেক সিএসপি অফিসার ড. এম.এ. সাত্তারের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী (জন্ম: ১ জুন ১৯৩২ মৃত্যু : ২৬ মে ১৯৯২)
আজ সমাজ সেবক ও সাবেক সিএসপি অফিসার ড. এম.এ. সাত্তারের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী (জন্ম: ১ জুন ১৯৩২ মৃত্যু : ২৬ মে ১৯৯২)
মোঃ রুহুল আমিনঃ বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৃতি সন্তানদের মধ্যে একজন ছিলেন ড. এম.এ. সাত্তার। তিনি ছিলেন, বাংলাদেশ গনশিক্ষা সমিতির প্রতিষ্ঠাতা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব(সিএসপি), বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, বাংলাদেশ নারী শিক্ষার অগ্রদূত, নারী শিক্ষা বিস্তারে বর্তমানে যে উপবৃত্তি চালু আছে তার প্রবর্তক, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম সংগঠক, মসজিদভিত্তিক শিক্ষার রুপকার এবং সারা দেশে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। আজ তাঁর ৯৪তম জন্মবার্ষিকী।
ড. এম.এ. সাত্তার ১৯৩২ সালের ১ জুন তৎকালীন বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার বর্তমান চাঁদপুর(পরে মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত) জেলাধীন শাহারাস্তি উপজেলার নাওড়া গ্রামের ঐতিহাসিক পাটওয়ারী বাড়িতে (এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম আজিজুর রহমান পাটওয়ারী (আজিজ খলিফা) ও মায়ের নাম করফুলেন্নেছা। তাঁর মা ছিলেন একজন বিদ্যোৎসাহী মহীয়সী নারী। শিক্ষার প্রতি তাঁর মায়ের ছিল অনেক অনুরাগ।
ড.এম.এ. সাত্তার শাহারাস্তির নিউ স্কিম হাই মাদ্রাসায় (বর্তমানে শাহারাস্তি সরকারি বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয়) অধ্যয়ন করেন এবং জুনিয়র বৃত্তি লাভ করেন। তারপর তিনি চট্টগ্রামে হাই মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং ঐ মাদ্রাসা হতে ১৯৫১ সালে প্রথম স্থান অধিকার করে মেট্রিক পাস করেন।
অতঃপর তিনি ১৯৫৩ সালে ঢাকা কলেজ থেকে বোর্ডের মেধা তালিকায় সপ্তম স্থান অধিকার করে আইএ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন । ১৯৫৬ সালে তিনি অর্থনীতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় স্থান লাভ করেন।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি লোক প্রশাসনে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন এবং একই সাথে সিএসপি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সারা পাকিস্তানে প্রথম স্থান অধিকার করে লাহোর সিভিল সার্ভিস ট্রেনিং একাডেমিতে যোগদান করেন। দীর্ঘ এক বছর ট্রেনিং শেষে তিনি যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোক প্রশাসনে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন ।
১৯৬০ সালে সিএসপি অফিসার হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁর প্রথম কর্মস্থল ছিল বৃহত্তর সিলেট জেলার মৌলভীবাজার মহকুমা প্রশাসক হিসেবে। অতঃপর তিনি রংপুর নারায়ণগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারের হয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬২ সালে ব্রিটিশ নাগরিক ড. এলেন মেরি হেরিংটনের সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পূর্বে তিনি বিলেতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহনকালে মেরির সাথে পরিচিত হন, পরিচয় থেকে পরবর্তীতে বেশ কয়েক বছর মেরির সাথে প্রেম করেন। অতঃপর তিনি নারায়নগঞ্জ মহাকুমা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মেরিকে বিয়ে করেন। তাঁর বিয়ে পড়ান জ্ঞান তাপস ড. মো: শহীদ উল্লাহ। তার বিয়ে হয় ইসলামী রীতিনীতি মেনে কিন্তু আংটি বদল হয় খ্রিস্টান ধর্মীয় রীতিতে।
ড. সাত্তার ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়াম কলেজ থেকে ডেভলপমেন্ট ইকনমিক্সে এম এ ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করায় পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি হন তিনি।
ডঃ সাত্তার ১৯৯২ সালের মে মাসের চতুর্থ সপ্তাহে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত পরিবার পরিকল্পনা সহ বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা আইকমের মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরস্থ কার্যালয়ের প্রধান হিসেবে যোগদান করতে যান এবং মে মাসের ২৬ তারিখে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারনে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুটি অনেকে রহস্যবৃত মনে করেন।
ড. সাত্তার ব্যক্তি জীবনে চার জন পুত্র সন্তানের জনক ।
তারা সবাই সুশিক্ষিত এবং বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তারা কেউ বাংলাদেশে বসবাস করেন না। তাঁর স্ত্রী ডঃ এলেন মেরি হেরিংটন মরণঘাতী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০০৫ সালে লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন।
এবছর বিগত ২৬ মে ড.এম.এ সাত্তারের ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী তার নিজ গ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়।
ড. সাত্তারের অবদানের ফলশ্রুতিতে চাঁদপুরের শাহারাস্তি উপজেলার শিক্ষার হার ৯৬% ভাগে উন্নীত হয়েছে। তাঁর নাম চাঁদপুরের শাহরাস্তি তথা সারা দেশবাসীর হৃদয়ে চিরদিন অমলিন হয়ে থাকবে।
আমরা জাতির এই সূর্য সন্তানকে তাঁর ৯৪তম জন্মবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে স্বরণ করি। দোয়া করি মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চ মাকাম দান করুন।






