“নির্বাচন হতে হবে ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ: সেনাপ্রধান”
: সেনাপ্রধান"
দূর্বার নিউজ ডেস্কঃ আজকে একটা বেদনাবিধূর দিবস। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আমারা এই ৫৭ জন চৌকশ সেনা অফিসার, এবং শুধু তাই নয় উনাদের কিছু পরিবারবর্গের সদস্যদের আমরা হারিয়েছি। এখানে আসার সময় এই ছবিগুলো আমি দেখছিলাম। এই ছবিগুলো আপনারা অনেকে ছবিতে দেখেছেন, কিন্তু এগুলো আমার সব চাক্ষুষ দেখা। আমি চাক্ষুষ সাক্ষী এই সমস্ত বর্বরতার।
একটা জিনিস আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, এই বর্বরতা কোনো সেনা সদস্য করেনি। সম্পূর্ণটাই তদানিন্তর বিজিবির সদস্য দ্বারা সংঘটিত। ফুলস্টপ। এখানে কোনো ইফ এবং বাট নাই। এখানে যদি ‘ইফ’ এবং ‘বাট’ আনেন, এই যে বিচারিক কার্যক্রম এত দিন ধরে হয়েছে, ১৬ বছর ধরে, ১৭ বছর ধরে যারা জেলে আছে, যারা কনভিকটেড, সেই বিচারিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। এই জিনিসটা আমাদের খুব পরিষ্কার করে মনে রাখা প্রয়োজন। এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে নষ্ট করবেন না। যে সমস্ত সদস্য শাস্তি পেয়েছে, তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। এখানে কোনো রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এর মধ্যে উপস্থিত ছিল কি না, ইনভলব ছিল কি না, বাইরের কোনো শক্তি এর মধ্যে ইনভলব ছিল কি না, সেটার জন্য কমিশন করা হয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান এখানে আছেন। উনি এটা বের করবেন। এবং আপনাদের জানাবেন। বটমলাইন হচ্ছে যে, এই সমস্ত, আমাদের এই চৌকস সেনাসদস্য যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তারা প্রাণ হারিয়েছেন তদানীন্তন বিডিআর সদস্যদের গুলিতে। আমরা নিজেরা এসব জিনিস নিয়ে অনেক ভিন্নমত পোষণ করছি কেউ কেউ। এই জিনিসটাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছি। সেটা আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।
আজকে আমি আমার কিছু উপদেশ দিয়ে যাব, সেটা যদি আপনারা গ্রহণ করেন আপনারা লাভবান হবেন। আমি এটা আপনাদের নিশ্চিত করছি। আমরা নিজেরা ভেদাভেদ সৃষ্টি না করি। আমরা নিজেরা ইউনাইটেড থাকি। আমাদের মধ্যে যদি কোনো সমস্যা থেকে থাকে, কোনো ব্যাত্যয় থেকে থাকে, কোনো গ্রিভেন্সেস থেকে থাকে- সেটা আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করব। এটার জন্য ডানে-বাঁয়ে দৌড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। নিজের ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হবে না। আমি আপনাদের এই জিনিসটা নিশ্চিত করে দিচ্ছি।
কিছু কিছু সদস্যদের দাবি, তারা ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন শাস্তি পেয়েছেন। কেউ কেউ দাবি করছেন যে, তারা অযাচিতভাবে শাস্তি পেয়েছেন, যেটার জন্য আমি একটা বোর্ড করে দিয়েছি। একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল সেই বোর্ডের সদস্য। প্রথম ফেইজে ৫১ জন সদস্যের ব্যাপারে আমার কাছে রিকমেন্ডেশন নিয়ে এসেছে, তার রিকমেন্ডেশনের অধিকাংশই আমি গ্রহণ করেছি এবং আরও বেশি আমি দিয়েছি। নেভি ও এয়ারফোর্সও তাদের এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আমার স্ট্যান্ড পয়েন্ট হচ্ছে- যদি কেউ অপরাধ করে থাকে সেটার জন্য কোনো ছাড় হবে না। বিন্দুমাত্র ছাড় নাই। আমি আপনাদের পরিষ্কার করে দিচ্ছি। ইট ইজ আ ডিসিপ্লিনড ফোর্স, ডিসিপ্লিনড ফোর্সকে ডিসিপ্লিনড থাকতে দেন।
আজকে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সমস্ত বাহিনী, সমস্ত অরগানাইজেশন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। খালি সেনাবাহিনী টিকে আছে। বিমান বাহিনী টিকে আছে, নৌবাহিনী টিকে আছে। কেন? বিকজ অফ ডিসিপ্লিন। তারপরেও আমি আমার অফিসারকে আদেশ দিয়েছি, যদি সামান্যতম কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে- কারও বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়া হয়েছে, অপরাধী কিনা যদি সামান্য কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে- সেটা তাদের ফেভারে যাবে। এটা হচ্ছে আমার ঢালাও নির্দেশ, সে হিসেবে বিভিন্ন প্রস্তাব আমার কাছে এসেছে। কোনো কোনো প্রস্তাবে আমি আরও আমার নিজের থেকে যোগ করে আরও বেশি আমি দিয়েছি। এভাবে পর্যায়ক্রমে অফিসাররা অ্যাপিয়ার করবে, আসবে এবং তাদের এই জিনিসগুলো আমরা দেখব। দেখে যদি মনে হয় যে, তাদেরকে কিছু করার অবকাশ আছে… অবশ্যই আমরা করব। এটা ন্যায়নীতিতে আমরা প্রতিষ্ঠিত থাকব ইনশাল্লাহ।
আপনারা কিছু মনে করবেন না। আজকে আমি একটু পরিষ্কার করে আমি কথা বলতে চাই। আপনাদের সবার হয়ত ভালো নাও লাগতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস করেন- আমার এটা আপনারা যদি গ্রহণ করেন, আপনারা লাভবান হবেন, কোনো ক্ষতি হবে না দেশের। আমার অন্য কোনো আকাঙ্ক্ষা নাই, আমার একটাই আকাঙ্ক্ষা- দেশ এবং জাতিটাকে একটা সুন্দর জায়গায় রেখে ছুটি করা। আই অ্যাড এনাফ ওয়াজ লাস্ট সেভেন, এইট মান্থস, আই হ্যাড এনাফ। আমি চাই দেশ এবং জাতিকে একটা সুন্দর জায়গায় রেখে আমরা সেনানিবাসে ফেরত আসব।
আরেকটা জরুরি বিষয় যেটা আমি ভাবলাম যে আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করি- দেশের এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপের পেছনে কিছু কারণ আছে। প্রথম কারণটা হচ্ছে যে, আমরা নিজেরা হানাহানির মধ্যে ব্যস্ত। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে বিষোদগারে ব্যস্ত। এটা একটা চমৎকার সুযোগ অপরাধীদের জন্য। যেহেতু আমরা একটা অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে বিরাজ করছি, তারা খুব ভালোভাবেই জানে যে, এই সময়ে যদি এই সমস্ত অপরাধ করা যায়, তাহলে এখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। সেই কারণে এই অপরাধগুলো হচ্ছে। আমরা যদি সংঘটিত থাকি, একত্রিত থাকি তাহলে অবশ্যই সম্মিলিতভাবে এটা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
পুলিশ, র্যাব বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই- এগুলো দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে অতীতে। খারাপ কাজের সঙ্গে অসংখ্য ভালো কাজ করেছে। আজকে যে দেশের স্থিতিশীলতা, দেশটাকে যে এত বছর স্থিতিশীল রাখা হয়েছে এটার কারণ হচ্ছে- এই সশস্ত্র বাহিনীর বহু সেনা সদস্য, সিভিলিয়ান- সবাই মিলে এই অরগানাইজেশনগুলোকে অসামরিক-সামরিক সবাই মিলে এই অরগানাইজেশনগুলোকে ইফেক্টিভ রেখেছে, সেই জন্য আজকে এতদিন ধরে আমরা একটি সুন্দর পরিবেশ পেয়েছি। এর মধ্যে যারা কাজ করেছে- যদি অপরাধ করে থাকে সেটার শাস্তি হবে। অবশ্যই শাস্তি হতে হবে। না হলে এই জিনিস আবার ঘটবে। আমরা সেটাকে বন্ধ করতে চাই চিরতরে, কিন্তু তার আগে মনে রাখতে হবে- আমরা এমনভাবে কাজটা করব- এই সমস্ত অরগানাইজেশনগুলো যেন আন্ডারমাইন না হয়।
আজকে পুলিশ সদস্য কাজ করছে না, একটা বিশাল বড় কারণ হচ্ছে- অনেকের বিরুদ্ধে মামলা, অনেকে জেলে। র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই প্যানিকড। বিভিন্ন দোষারোপ, গুম, খুন ইত্যাদির তদন্ত চলছে। অবশ্যই তদন্ত হবে, দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে- এমনভাবে কাজটা করতে হবে যেন এই অরগানাইজেশনগুলো আন্ডারমাইন না হয়। এই অরগানাইজেশনগুলো যদি আন্ডারমাইন করে আপনারা মনে করেন যে, দেশে শান্তিশৃঙ্খলা বিরাজ করবে, সবাই শান্তিতে থাকবেন- সেটা হবে না, সেটা সম্ভব না। আমি আপনাদের পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছি। এই দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু সেনাবাহিনীর না। দুই লক্ষ পুলিশ আছে, বিজিবি আছে, র্যাব আছে আনসার-ভিডিপি আছে। আমার আছে হচ্ছে ৩০ হাজার সৈন্য। এদেরকে আমি… এই যে একটা বিরাট ভয়েড, আমি ৩০ হাজার সৈন্য দিয়ে কীভাবে এটা পূরণ করব? ৩০ হাজার থাকে, আবার ৩০ হাজার চলে যায় ক্যান্টনমেন্টে, আরও ৩০ হাজার আসে। এটা দিয়ে আমরা দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছি। এখানে সে সমস্ত উচ্ছৃঙ্খল কাজ হয়েছে, সেটা আমাদের নিজস্ব তৈরি। এটা আমাদের নিজস্ব ম্যানুফ্যাকচার্ড। আমরা নিজেরা এগুলো তৈরি করেছি। এই বিপরীতমুখী কাজ করলে দেশে কখনও শান্তিশৃঙ্খলা আসবে না। এ জিনিসটা আপনাদের মনে রাখতে হবে।
তদন্ত কমিশন হচ্ছে আবার আরেকটা। সর্বদা আমরা চেষ্টা করব তদন্ত কমিশনকে সহায়তা করতে। যে ধরনের সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজন হয় আমরা করব। আমরা দেশে একটা ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ একটা ইলেকশনের দিকে ধাবিত হচ্ছি এবং তার আগে সে সমস্ত সংস্কার করা প্রয়োজন, অবশ্যই সরকার সেদিকে খেয়াল করবে। আমি যতবার এই ড. ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছি, হি কমপ্লিটলি এগ্রিস উইথ মি। দেয়ার শুড বি অ্যান ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশন অ্যান্ড দ্য ইলেকশন শুড বি উইথইন ডিসেম্বর, অর ক্লোজ টু দ্যাট- যেটা আমি প্রথমেই বলেছিলাম যে ১৮ মাসের মধ্যে একটা ইলেকশন। আমার মনে হয় যে, সরকার সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে, ড. ইউনূস যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন, এ দেশটাকে ইউনাইটেড রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন উনি। উনাকে আমাদের সাহায্য করতে হবে। উনি যেন সফল হতে পারেন, সেই দিকে আমরা সবাই চেষ্টা করব। আমরা একসঙ্গে ইনশাল্লাহ কাজ করে যাব।
আসেন আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি, কাটাকাটি না করে উই ইউনাইট আওয়ারসেল্ফ। দেশ-জাতি যেন একসঙ্গে থাকতে পারি- সেদিকে আমাদের কাজ করতে হবে। আমাদের মধ্যে মতের বিরোধ থাকতে পারে, চিন্তা চেতনার বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু দিন শেষে যেন আমরা সবাই দেশ এবং জাতির দিকে খেয়াল করে আমরা যেন এক থাকতে পারি। তাহলেই এই দেশটা উন্নত হবে। এই দেশটা সঠিক পথে পরিচালিত হবে। না হলে আমরা আরও সমস্যার মধ্যে পড়তে যাব। বিশ্বাস করেন, উই ডোন্ট ওয়ান্ট টু হেড… ওই দিকে আমরা যেতে চাই না। আমি আপনাদের সতর্ক করে দিচ্ছি, পরে বলবেন যে আমি সতর্ক করিনি। আমি আপনাদের সতর্ক করে দিচ্ছি, আপনারা যদি নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ না করতে পারেন, নিজেরা যদি কাদা ছোড়াছুড়ি করেন, মারামারি-কাটাকাটি করেন, এই দেশ এবং জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে।
আমি আজকে বলে দিলাম, না হলে আপনারা বলবেন যে আমি আপনাদের সতর্ক করিনি। আমি সতর্ক করে দিচ্ছি আপনাদের, এই দেশ আমাদের সবার। আমরা সবাই সুখে-শান্তিতে থাকতে চাই। আমরা চাই না হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি। সে উদ্দেশে আমি কাজ করে যাচ্ছি, আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের সেনাবাহিনীর প্রতি আক্রমণ কোরেন না। একটা কমন জিনিস আমি দেখতে পাচ্ছি, সেনাবাহিনী এবং সেনাপ্রধানের প্রতি বিদ্বেষ কারও, কারও। কী কারণে- আমি আজ পর্যন্ত এটা খুঁজে পাইনি। আমরা হচ্ছি একমাত্র ফোর্স, যেটা আপনাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি, দাঁড়িয়ে আছি প্ল্যাটফর্মে। অফকোর্স নেভি অ্যান্ড এয়ারফোর্স- উই অল- আমাদেরকে সাহায্য করেন, আমাদেরকে আক্রমণ কোরেন না। আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করেন, উপদেশ দেন, আমাদের প্রতি আক্রমণ কোরেন না। উপদেশ দেন, আমরা অবশ্যই ভালো উপদেশ গ্রহণ করব।
আমরা একসঙ্গে থাকতে চাই এবং দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আসুন আমরা একসঙ্গে কাজ করি, দেশ এবং জাতিকে একটা সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাই। একটু মন খুলেই কথা বললাম। এতদিন যে কথা মনের মধ্যে ছিল, সব সময় প্রকাশ করতে পারি না, প্রকাশ করাও যায় না। আজকে প্রকাশ করে ফেললাম। আমি জানি না এখানে অনেক মিডিয়া আছে, মিডিয়া না থাকলেই মনে হয় ভালো হতো। সবার সামনে আমি আমার মনের কথাটা প্রকাশ করে ফেললাম। কাউকে যদি দুঃখ দিয়ে থাকি আমাকে ক্ষমা করবেন। চলেন আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করি। দেশ এবং জাতিকে একটা সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাই। এখানেই আমাদের ছেলে-মেয়েরা বাস করবে। তাদের জন্য এমন কোনো স্থান আমরা যেন রেখে না যাই, যেখানে হানাহানি-কাটাকাটি মারামারি হবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তাহলে এ দেশে থাকতে পারবে না।






