স্কুলের মাঝখানে রাস্তা, নেই মাঠ-ওয়াশ ব্লক; তবু স্বপ্ন বুনছে চাঁদপুরের শাহরাস্তির ১৫ নম্বর ভড়ুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
স্কুলের মাঝখানে রাস্তা, নেই মাঠ-ওয়াশ ব্লক; তবু স্বপ্ন বুনছে চাঁদপুরের শাহরাস্তির ১৫ নম্বর ভড়ুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
বিশেষ প্রতিনিধি, শাহরাস্তি (চাঁদপুর) থেকে : সকালের ঘণ্টা বাজতেই ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ের দিকে ছুটে আসে। কিন্তু বিদ্যালয়ের আঙিনা পেরোনোর আগেই তাদের পথ আটকে দেয় গ্রামের ব্যস্ত চলাচলের রাস্তা। ক্লাস চলার মধ্যেই কখনো মোটরসাইকেল, কখনো অটোরিকশা, আবার কখনো বড় যানবাহনের শব্দে থমকে যায় পাঠদান। তবু সব প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই প্রায় অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে আলোর পথ দেখিয়ে যাচ্ছে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার সূচিপাড়া উত্তর ইউনিয়নের ১৫ নম্বর ভড়ুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি আজও এলাকার শিক্ষার অন্যতম বাতিঘর। বর্তমানে এখানে ১০৯ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। কর্মরত রয়েছেন সাতজন শিক্ষক; কোনো পদ শূন্য নেই। রয়েছেন একজন দপ্তরি-কাম-প্রহরীও। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের সাতজন শিক্ষকই উপস্থিত আছেন। ১০৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে এদিন উপস্থিত ছিল ৯৩ জন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ বিদ্যালয়ের ২৫ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি অর্জন করেছে। এখান থেকে পড়াশোনা শেষ করে অনেকেই প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিবছর শিক্ষার্থীরা শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেও বিদ্যালয়ের সুনাম বাড়াচ্ছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদাউস শুধু প্রতিষ্ঠান পরিচালনাই নয়, বাংলাদেশ স্কাউটস কুমিল্লা অঞ্চলের সহকারী লিডার ট্রেইনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় গিয়ে স্কাউটস প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষক মোহাম্মাদ হাসান জুলহাস ব্রিটিশ কাউন্সিলের Training for Master Trainers in English সম্পন্ন করেছেন এবং আইপিএ বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকার পরও অবকাঠামোগত সংকট বিদ্যালয়টির সম্ভাবনাকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছে।
বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সংকট এর অবস্থান। মূল সড়কের তুলনায় প্রায় পাঁচ ফুট নিচু স্থানে অবস্থিত বিদ্যালয়টি। বর্ষা এলেই কাদা আর জলাবদ্ধতা পেরিয়ে শিশুদের শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাতে হয়। এর চেয়েও বড় সমস্যা, বিদ্যালয়ের মাঝখান দিয়েই চলে গেছে গ্রামের প্রধান চলাচলের রাস্তা। প্রতিদিন শত শত মানুষ এবং বিভিন্ন ধরনের যানবাহন এই পথ ব্যবহার করে। ক্লাস চলাকালেও যানবাহনের শব্দে পাঠদান ব্যাহত হয়। এমনকি বড় যানবাহন বিদ্যালয়ের সীমানার ভেতরে ঢুকে ঘুরে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বিদ্যালয়ে নেই পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ। একটি জরাজীর্ণ টিনসেড এখনও পাঠদান চলছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভবনটি যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। নেই আধুনিক ওয়াশ ব্লক। খেলাধুলার জন্যও নেই কোনো মাঠ। বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে প্রায় ৯৪ ফুট দৈর্ঘ্য, ৪৫ ফুট প্রস্থ ও প্রায় ১০ ফুট গভীর একটি বড় গর্ত পড়ে আছে। স্থানীয়দের মতে, এটি ভরাট করা গেলে শিশুদের জন্য একটি সুন্দর খেলার মাঠ গড়ে তোলা সম্ভব।
ভূমি নিয়েও রয়েছে জটিলতা। বিদ্যালয়ের নামে খতিয়ানে ৩১ শতাংশ জমি থাকলেও দলিল অনুযায়ী জমির পরিমাণ ৪৩ শতাংশ। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেছিলেন প্রয়াত নোয়াব আলী পাটওয়ারী ও জয়নাল আবেদীন পাটওয়ারী। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। তবে জমি ও রাস্তা-সংক্রান্ত জটিলতা দীর্ঘদিনেও নিরসন হয়নি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা একাধিকবার বৈঠক করেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারেননি। প্রয়াত চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, সাবেক চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান পাটওয়ারী, সূচিপাড়া ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হুমায়ূন কবির লিটন ভূঁইয়া, সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজিয়া হোসেনসহ অনেকেই উদ্যোগ নিলেও ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতায় বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের দাবি, বিদ্যালয়ের উত্তর পাশে বিকল্প রাস্তা নির্মাণের জন্য আনুমানিক ১০ ফুট ছেড়ে রাখা জায়গাদিয়ে বিকল্প রাস্তা নির্মাণ করা হলে বিদ্যালয়ের মাঝ দিয়ে মানুষের চলাচল বন্ধ হবে এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের নিচু জায়গা ভরাট করে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ, আধুনিক ওয়াশ ব্লক স্থাপন, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ এবং পশ্চিম পাশের গর্ত ভরাট করে খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
একটি বিদ্যালয় শুধু পাঠদানের স্থান নয়; এটি একটি গ্রামের ভবিষ্যৎ গড়ার কারখানা। অথচ অর্ধশতাব্দীর ঐতিহ্য বহন করা এই বিদ্যালয়ের শিশুরা আজও নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, একটি খেলার মাঠ আর নির্বিঘ্নে পাঠ গ্রহণের মৌলিক পরিবেশের অপেক্ষায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সময়োপযোগী উদ্যোগই পারে শতাধিক কোমলমতি শিশুর জন্য একটি নিরাপদ, আধুনিক ও স্বপ্নময় শিক্ষাঙ্গন উপহার দিতে।






