স্বপ্ন আছে, স্থায়ী ভবন নেই: হাড়াইরপাড়ার ছোট্ট মাদ্রাসা টিকে আছে একজন মানুষের উদ্যোগে
স্বপ্ন আছে, স্থায়ী ভবন নেই: হাড়াইরপাড়ার ছোট্ট মাদ্রাসা টিকে আছে একজন মানুষের উদ্যোগে
শাহরাস্তি (চাঁদপুর) প্রতিনিধিঃ সকাল গড়াতেই ছোট ছোট শিশুরা হাতে কোরআন শরিফ, খাতা আর কলম নিয়ে জড়ো হয় হাড়াইরপাড়া ইসলামিয়া ফোরকানিয়া ও হাফেজিয়া মাদ্রাসায়। কারও কণ্ঠে নূরানীর পাঠ, কেউ আবার হিফজের সবক আওড়াচ্ছে। টিনের ছাউনি আর সীমিত অবকাঠামোর এই ছোট্ট শিক্ষাঙ্গনেই ভবিষ্যতের হাফেজ ও সুনাগরিক গড়ে তোলার স্বপ্ন বুনছেন শিক্ষকরা। কিন্তু স্বপ্নের এই প্রতিষ্ঠানটি আজও অপেক্ষায় একটি স্থায়ী ভবনের।
চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার হাড়াইরপাড়া গ্রামে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয় হাড়াইরপাড়া ইসলামিয়া ফোরকানিয়া ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা। গ্রামের শিশুদের দ্বীনি শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসায় বর্তমানে নূরানী বিভাগে ২২ জন এবং হিফজ বিভাগে ৮ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। নূরানীর পাশাপাশি বাংলা, গণিত ও ইংরেজিও শেখানো হয়, যাতে শিশুরা ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক—দুই ধরনের শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
এই মাদ্রাসার সবচেয়ে বড় শক্তি এর প্রতিষ্ঠাতা ও মোতাওয়াল্লি সমাজসেবক মোহাম্মদ মহি উদ্দিন রিপন পাটোয়ারী। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষকদের সম্মানী, শিক্ষা উপকরণ, পোশাকসহ প্রায় সব পরিচালন ব্যয় তিনি নিজেই বহন করে আসছেন। প্রতি মাসে এ খাতে তাঁর ব্যয় হয় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।
শুধু তাই নয়, মাদ্রাসার জন্য নিজের ৫ শতাংশ জমিও ওয়াকফ করে দিয়েছেন তিনি। গত ১ জুন শিক্ষার্থীদের হাতে বই, খাতা, কলম ও পোশাক তুলে দেন। তাঁর বিশ্বাস, শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের আলোই একটি সমাজকে বদলে দিতে পারে।
মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক হাফেজ মাওলানা কামাল হোসাইন ও সহকারী শিক্ষক হাফেজ মোহাম্মদ মোহন পাটোয়ারী নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে যাচ্ছেন। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নূরানী শিক্ষা এবং সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত হিফজ বিভাগের ক্লাস পরিচালিত হয়।
তবে এই আলোর পথচলায় বড় বাধা অবকাঠামোগত সংকট। ছয় বছর পার হলেও মাদ্রাসাটির কোনো স্থায়ী ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে মাদ্রাসা, পাশের বিদ্যালয় ও মসজিদে যাতায়াতের একমাত্র সড়কটিও দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। রাস্তার এক পাশে পুকুর থাকায় দ্রুত গার্ডওয়াল নির্মাণ ও সড়ক উন্নয়ন জরুরি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি স্থায়ী ভবন নির্মাণ হলে আরও অনেক শিশু নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশে দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক নির্মাণ হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও মুসল্লিদের যাতায়াতের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগও দূর হবে।
প্রতিষ্ঠাতা মহি উদ্দিন রিপন পাটোয়ারী বলেন, “এই মাদ্রাসা কোনো ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়, এটি গ্রামের সন্তানদের জন্য একটি আমানত। সমাজের বিত্তবান, দানশীল ব্যক্তি ও প্রবাসী শুভানুধ্যায়ীরা পাশে দাঁড়ালে একটি স্থায়ী ভবন নির্মাণ এবং নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। শিশুদের জন্য একটি সুন্দর শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।”
হাড়াইরপাড়ার এই ছোট্ট মাদ্রাসার স্বপ্ন খুব বড় নয়—শুধু একটি নিরাপদ ভবন, শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে কোরআনের আলো পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এখন প্রয়োজন সমাজের সম্মিলিত সহযোগিতা।






