শাহরাস্তির ভূমি অফিসে সেবা নিয়ে প্রশ্ন: অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দালালচক্র ও হয়রানির অভিযোগে ক্ষুব্ধ সেবাগ্রহীতারা
শাহরাস্তির ভূমি অফিসে সেবা নিয়ে প্রশ্ন: অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দালালচক্র ও হয়রানির অভিযোগে ক্ষুব্ধ সেবাগ্রহীতারা
নিজস্ব প্রতিনিধি, শাহরাস্তি (চাঁদপুর) থেকে : রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ভূমি অফিস। জমির নামজারি, খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন করসহ নানা প্রয়োজনে প্রতিদিন শত শত মানুষকে এই অফিসের দ্বারস্থ হতে হয়। কিন্তু সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সেবা পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে আসা অনেক সেবাগ্রহীতার অভিযোগ, চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার বিভিন্ন ভূমি অফিসে সেই প্রত্যাশা বারবার ভেঙে যাচ্ছে।
বিশেষ করে সাহাপুর ভূমি অফিসকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে অসংখ্য অভিযোগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের ভাষ্য, সরকারি নিয়মে সেবা পাওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত অর্থ দাবি, দীর্ঘসূত্রতা, দালালচক্রের প্রভাব এবং অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমির নামজারির (মিউটেশন) জন্য সরকার নির্ধারিত ফি ১ হাজার ১৭০ টাকা হলেও বাস্তবে বিভিন্ন অজুহাতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও কখনো ফাইলের অজুহাত, কখনো প্রক্রিয়াগত জটিলতার কথা বলে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকেই। এতে সময়ের পাশাপাশি আর্থিক ও মানসিক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত মন্তব্যগুলোতেও একই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। অনেকেই দাবি করেছেন, টাকা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন। কেউ অভিযোগ করেছেন, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে হয়রানি করা হয়; আবার কেউ বলেছেন, অর্থ প্রদান করলে অনেক আনুষ্ঠানিকতা সহজ হয়ে যায়।
একজন সেবাগ্রহীতা মন্তব্যে লিখেছেন, “সরকারি ফি ১ হাজার ১৭০ টাকা হলেও বাস্তবে কয়েক গুণ বেশি অর্থ নেওয়া হচ্ছে। অফিসে সরকারি ফি বড় অক্ষরে নোটিশ বোর্ডে টানিয়ে রাখা হলে মানুষ প্রকৃত ফি সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ কমবে।”
আরেকজনের ভাষ্য, ভূমি অফিসে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষ কখনোই স্বস্তির সঙ্গে সরকারি সেবা পাবেন না। অনেকেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করার পরামর্শ দিলেও কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অভিযোগ করলে উল্টো হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সমস্যা শুধু একটি অফিসে সীমাবদ্ধ নয়; উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিসেও দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। ফলে সরকারি সেবার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও মনে করছেন অনেকে।
সচেতন নাগরিকদের দাবি, ভূমি অফিসের প্রতিটি সেবার সরকারি ফি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং আবেদন প্রক্রিয়া দৃশ্যমানভাবে নোটিশ বোর্ডে প্রদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ, সেবা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং অভিযোগ তদন্তে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরা খাতুন এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিল্লোল চাকমা-এর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সাধারণ মানুষ যাতে কোনো ধরনের হয়রানি বা অতিরিক্ত অর্থ প্রদান ছাড়াই সরকারি সেবা পেতে পারেন, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমি অফিস মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত একটি সেবাপ্রতিষ্ঠান। সেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে জনগণের আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি সরকারের জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডও আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হবে।
শাহরাস্তিবাসীর প্রত্যাশা একটাই—ভূমি অফিস হোক দালালমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক এবং প্রকৃত অর্থেই জনবান্ধব; যেখানে একজন সাধারণ মানুষ তার ন্যায্য অধিকার পেতে অতিরিক্ত অর্থ, অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানি কিংবা দীর্ঘ ভোগান্তির শিকার হবেন না।






