প্রতিষ্ঠার ১৩ বছর পর শুরু হলো শাহরাস্তির নাওড়া পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায়, মুসল্লীদের ঢল!
প্রতিষ্ঠার ১৩ বছর পর শুরু হলো শাহরাস্তির নাওড়া পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায়, মুসল্লীদের ঢল!
নিজস্ব প্রতিনিধি, শাহরাস্তি (চাঁদপুর) থেকে : দীর্ঘ ১৩টি বছরের সুপ্ত আকুতি, অক্লান্ত শ্রম আর হৃদয়ের গভীর থেকে বয়ে চলা এক বুক প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো অবশেষে। চাঁদপুরের শাহরাস্তি পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নাওড়া পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদে আজ শুক্রবার (২৬ জুন) প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো পবিত্র জুমার নামাজ। এই ঐতিহাসিক ও মাহেন্দ্রক্ষণকে ঘিরে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয়েছিল এক স্বর্গীয়, আবেগঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশ। শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মুসল্লী স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছুটে এসে ইতিহাসের সাক্ষী হন এই পুণ্যময় দিনে।
ইটের দেয়াল ছাপিয়ে এক অনন্য ভ্রাতৃত্বের বন্ধন :
২০১৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে মসজিদটিতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় শুরু হলেও, দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সেখানে জুমার নামাজ চালু হয়নি। আজ যখন মসজিদ থেকে জুমার আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তখন উপস্থিত অনেকের চোখেই দেখা গেছে আনন্দের অশ্রু।
প্রথম জুমার নামাজ শেষে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. মনজুরুল আলম স্বপনের সঞ্চালনায় এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু হৃদয়গ্রাহী আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, শাহরাস্তি উপজেলা ও পৌর বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা তাদের বক্তব্যে বলেন:
”একটি মসজিদ কেবল ইট-পাথরের কোনো জড় স্থাপনা নয়; এটি আমাদের ঈমান, তাকওয়া, ভ্রাতৃত্ব, নৈতিকতা এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক পবিত্র বাতিঘর।”
তারা মসজিদের অসমাপ্ত কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে নিজেদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন এবং সমাজের বিত্তবান ও দানশীল মানুষদের এই পুণ্যকর্মে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান।
ত্যাগ আর ভালোবাসার এক অনন্য উপাখ্যান : এই পবিত্র ঘরের পেছনে মিশে আছে স্থানীয় মানুষের ত্যাগ ও ভালোবাসার গল্প। জানা যায়, মোট ৮ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত এই মসজিদের জন্য ১ শতাংশ জমি দান করেছেন স্থানীয় মুসল্লী ফারুক মুফতি। এছাড়া মো. মনজুরুল আলম স্বপন, আবদুর রশিদ মোল্লা এবং মাওলানা জসিম উদ্দিন মুফতি প্রত্যেকে ০.৫ শতাংশ করে জমি দান করে এই মহৎ কাজের অংশীদার হয়েছেন। অবশিষ্ট ৫.৫ শতাংশ জমি স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের আর্থিক সহযোগিতায় ক্রয় করা হয়েছে।
ইতোমধ্যেই স্থানীয় দানশীল ব্যক্তিদের অনুদানে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫৪ ফুট × ৪২ ফুট আয়তনের মসজিদের একতলা ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে একসঙ্গে প্রায় ২১০ জন মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারেন। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনতলার ফাউন্ডেশন দিয়ে তৈরি এই একতলা ভবনটি এখন পূর্ণতার অপেক্ষায়।
পূর্ণতার জন্য প্রয়োজন আরও কিছু হাত : মসজিদ কমিটির সভাপতি, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. মনজুরুল আলম স্বপন জানান, একতলা সম্পন্ন হলেও এখনও ভেতরের ও বাইরের টাইলস, আধুনিক অজুখানা, ওয়াশরুম, হুজরাখানা, বাউন্ডারি ওয়াল, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং রঙের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়ে গেছে। এই অসমাপ্ত কাজগুলো সুন্দরভাবে শেষ করতে আরও প্রায় ৩০ লাখ টাকার প্রয়োজন।
বর্তমানে এই দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের খতিব ও ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা জাকির হোসেন হাওলাদার এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ইমাম হিসেবে আছেন হাফেজ মো. নাঈমুর রহমান। ১১ সদস্যবিশিষ্ট একটি দক্ষ ও নিষ্ঠাবান পরিচালনা কমিটি নিরলসভাবে এই আল্লাহর ঘরের দেখভাল করে যাচ্ছেন।
আখিরাতের পাথেয় ও অশ্রুসিক্ত মোনাজাত : প্রথম জুমার এই ঐতিহাসিক ক্ষণটি শেষ হয় এক স্বর্গীয় আবহে। নামাজ শেষে মসজিদ প্রতিষ্ঠায় যাঁরা জমি, অর্থ, শ্রম ও সময় দিয়ে অবদান রেখেছেন—তাদের এবং তাদের প্রয়াত মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
কান্নাভেজা কণ্ঠে মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করা হয়, এই মসজিদকে যেন কিয়ামত পর্যন্ত ইসলাম, সঠিক ইবাদত ও মানবকল্যাণের এক উজ্জ্বল কেন্দ্র হিসেবে টিকিয়ে রাখা হয়।
নাওড়া পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদে প্রথম জুমার নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে কেবল একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনাই হয়নি, বরং এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন আজ ডানা মেলেছে। স্থানীয় মুসল্লীদের প্রত্যাশা—আল্লাহর এই পবিত্র ঘরকে কেন্দ্র করে আগামী প্রজন্মের মাঝে ইসলামের সুমহান আদর্শ, নৈতিকতা ও ভ্রাতৃত্বের আলো আরও ছড়িয়ে পড়বে।






